বাংলাদেশে টুপির রকমফের

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:৩৭ এএম

টুপি ইসলাম ধর্মের বিশেষ লেবাস। টুপি পরিধান করা হজরত রাসুল (সা.)-এর অন্যতম সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িনের যুগ থেকে আজও পর্যন্ত মুসলামানদের মধ্যে এ সুন্নত পালন তথা টুপি ব্যবহারের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশে ঘরানাভেদে টুপি ব্যবহারের বৈচিত্র্য রয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানরা পরিধান করে থাকেন এমন কয়েক ধরনের টুপির বৃত্তান্ত তুলে ধরা হলো।

পাঁচকলি : বাংলাদেশের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী পাঁচকলি টুপি পরেন। অনেক মাদ্রাসায় এই টুপি পরিধান করা বাধ্যতামূলক। কিছু মাদ্রাসায় আগে বাধ্যতামূলক থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই বাধ্যবাধকতায় শিথিলতা এসেছে। পাঁচকলি টুপিতেও আবার কয়েকটি প্রকার আছে। কেউ কেউ গম্বুজের মতো উঁচু, সুতার কারুকাজ করা সাদা রঙের টুপি পরেন, আবার কেউ কেউ মাথার তালুর সঙ্গে লেগে থাকা টুপি পরেন। পাঁচকলি টুপির মধ্যে আরেক প্রকারের টুপি আছে, যেগুলোতে এমব্রয়ডারি বা সাদা সুতার নকশা থাকে না। এই টুপিগুলো ব্যাপকভাবে পরিধান করেন চরমোনাই পীরের অনুসারীরা। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) পাঁচকলি টুপি পরিধান করতেন বিধায় অনেকে এ জাতীয় টুপি পরিধান করে থাকেন। পাঁচকলি টুপির তাৎপর্য হলো, এটি মাথার সঙ্গে লেগে থাকে। পরিধানে সহজ ও আরামদায়ক। আবার ইসলামের মূল স্তম্ভ পাঁচটি। তাই এসব দিকে চিন্তা করে অনেকে পাঁচকলি টুপি ব্যবহার করেন।

কিশতি টুপি : নৌকার মতো লম্বা এক ধরনের টুপিকে বলা হয় কিশতি টুপি। এই টুপি পরিধান করতেন দেওবন্দ মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)। তার চিন্তাধারা যারা লালন করেন এবং যারা তার খলিফা ছিলেন তারাও কিশতি টুপি পরতেন। তাদের পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতেও এক সময় এই টুপি পরিধান করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে এখন সেই বাধ্যবাধকতায় শিথিলতা এসেছে।

কুশিকাটার টুপি : কুশিকাটা বা ক্রুশকাঠির মাধ্যমে হাতে বোনা টুপি। প্রায় ৬ ইঞ্চি লম্বা স্টিলের একটি চিকন কাঠির মুখে সুতা পেঁচিয়ে ধরার জন্য সামান্য বাঁকানো, এরই নাম হলো কুশিকাটা। বাম হাতের আঙুলের সঙ্গে সেলাই মেশিনের ববিনের মতো সুতা এঁটে নিয়ে হাতের কায়দায় কুশিকাটার চিকন বাঁকানো মুখের শৈলীতে তৈরি হয় টুপিসহ হস্তশিল্পের নানা সামগ্রী। আমাদের মধ্যে অনেক ধরনের টুপি থাকলেও কুশিকাটা দিয়ে বোনা টুপির কদর বেশি। রমজান মাস এলে আমরা দেখতে পাই, সব শ্রেণি-পেশার মুসলমানদের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করার বিশেষ তাগিদ থাকে। এমন বেশির ভাগ মুসল্লির মাথায় নামাজের সময় কুশিকাটা দিয়ে তৈরি টুপি দেখা যায়। কারণ হলো, টুপিটি শুধু সুতা দ্বারা তৈরি এবং হালকা-পাতলা হওয়ায় নামাজ শেষে আবার সুন্দরভাবে পকেটে রেখে দেওয়া যায়। বগুড়ার ধুনট এবং শেরপুরের একাধিক এলাকায় কয়েক বছর ধরে এই টুপি তৈরি হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তো যাচ্ছেই, বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছে এই টুপি।

জালি টুপি : জালের মতো বুনন করা জালি টুপির প্রচলন ব্যাপকভাবে দেখা যায় চট্টগ্রামের মাদ্রাসাগুলোতে। জালি টুপির বিশেষ একটি প্রকার এটি। চিটাগাঙ্গি টুপি নামেই এর পরিচিতি। সিলেটেও মোটামুটি এই টুপির প্রচলন রয়েছে। ধর্মীয় অঙ্গনে আধুনিক ও তরুণদের অনেকের কাছেই বর্তমানে জালি টুপিটাই বেশি পছন্দের। চিটাগাঙ্গি টুপি ছাড়াও জালি টুপির আরও নানা আদল আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে তুর্কি জালি। তুর্কি জালি বর্তমানে অনেকেই পরেন।

জিন্নাহ টুপি : মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ যে টুপি পরতেন সেটাকে জিন্নাহ টুপি বলা হয়। টুপিটির মূল নাম ছিল ‘কারাকুল’ টুপি। কারাকুল অর্থ কালো পশম। এই টুপিটি কারাকুল জাতের (কালো পশমি) ভেড়ার পশম দ্বারা তৈরি করা হয়। টুপিটি পরিধানকারীর মাথায় উঁচু হয়ে থাকে এবং পরিধানকারীর মাথা থেকে খুলে ফেলা হলে এটি সমতল হয়ে যায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক নেতা এই টুপি পরতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চীন সফরের সময় জিন্নাহ টুপি পরেছিলেন। এসব ছিল সেই জামানার বিশেষ কালচার। তবে এখনো বাংলাদেশের অনেককে দেখা যায় এই টুপি পরতে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীও জিন্নাহ টুপি পরতেন। নকশার ক্ষেত্রে টুপিটি উঁচু হয়ে থাকে এবং এর বেশ কয়েকটি ভাগ রয়েছে। মাথা থেকে উঠলে এটি ভাঁজ হয়ে যায়। টুপিটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে এখনো বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

তালের আঁশের টুপি : তালের আঁশের টুপিকে ভাসানী টুপিও বলা হয়। মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই টুপি পরিধান করতেন। তালের আঁশ ও তালপাতা সরু সরু করে নির্দিষ্ট মাপে কেটে হাতে বানানো হয় এই টুপি। এক সময় এই টুপির খুব চাহিদা ছিল। গ্রাম ও মফস্বলের লোকেরা এই টুপি পরতেন। গ্রামের অনেক মসজিদে এখনো এই টুপির দেখা মিলে। বগুড়ার কাহালু উপজেলার পাঁচখুর গ্রামসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এখনো তৈরি করা হয় এই টুপি। পরে সেগুলো বিক্রির জন্য ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। বরিশালের বেশ কয়েকটি এলাকাতেও তালপাতার টুপি তৈরির প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া ভারতের বর্ধমানের রানিগঞ্জেও তৈরি করা হয় তালপাতার টুপি।

আল আজহারের টুপি : লাল রঙের টুপির ওপর সাদা কাপড় প্যাঁচানো বিশেষ এক ধরনের টুপি। মিসরে ঘোরাফেরা করলেই দেখা যাবে এমন বিশেষ ডিজাইনের টুপি পরিহিত আলেমদের। তারা আল আজহারের গ্র্যাজুয়েট। মিসরের মসজিদে বা বাজারে গেলেই এমন আলেমদের দেখা পাওয়া যায়। মিসরীয় সমাজে এদের রয়েছে বিশেষ কদর। বাংলাদেশের যেসব শিক্ষার্থী মিসরের আল আজহার থেকে পড়াশোনা করে আসেন তারাও এই লাল-সাদা রঙের টুপি পরিধান করেন। বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। তবে এই টুপি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হলেও সেখানে পড়াশোনা না করেও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ এখন এই টুপি পরেন।

কারুকাজ করা টুপি : এটি রঙিন সুতার কারুকাজ করা এক ধরনের উঁচু টুপি। জামায়াত ঘরানার অনেক আলেম এই ধরনের টুপি পরিধান করে থাকেন। আলিয়া মাদ্রাসার অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও এই ধরনের টুপি পরিধান করতে দেখা যায়। সাধারণ মুসল্লিদের এমন উঁচু টুপি পরিধান করতে কম দেখা যায়। তবে রঙিন সুতার কারুকাজ করা আরেক ধরনের টুপি আছে, যা খুব বেশি উঁচু নয়; বরং ওপরের দিকে পরিমাপে নিচু। গ্রাম, মফস্বল থেকে শুরু করে শহুরে শৌখিন লোকদের এই ধরনের টুপি পরিধান করতে দেখা যায়।

বুগিস টুপি : বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার রুচিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গ্রাম, মফস্বল ও শহুরে শৌখিন লোকদের বুগিস টুপি পরিধান করতে দেখা যায় অহরহ। এটি এক ধরনের দামি কাপড় দ্বারা তৈরি, যা সাদা রঙের হয়ে থাকে। তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরবসহ একাধিক মুসলিম দেশ থেকে এই টুপি বাংলাদেশে আসে। দেশভেদে এই টুপির দাম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। 

প্লাস্টিকের টুপি : প্লাস্টিকের পাতলা আবরণ দিয়ে তৈরি টুপি। আগে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে এই টুপির ব্যবহার ছিল। এখন খুব একটা দেখা যায় না। এক সময় অনেক মসজিদেও রাখা হতো এই টুপি। যেসব মুসল্লির টুপি থাকত না, তারা এই টুপি পরিধান করে নামাজ পড়তেন। এসব টুপির মধ্যে ঘাম ও ময়লার স্তর জমে দুর্গন্ধ বের হয় বিধায় এটার ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে।

টুপির ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো টুপি রেশম, স্বর্ণ ও রুপার তৈরি হতে পারবে না, কাফের ও নারীদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারবে না এবং অহংকার ও দাম্ভিকতাপূর্ণ হতে পারবে না। তবে সবচেয়ে উত্তম টুপি হলো, যা পরিধান করার মাধ্যমে বিনয় প্রকাশ পায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত