বাংলাদেশের জনগণ, মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রা প্রকৃতির মিশ্র স্বভাবসিদ্ধ। এ দেশের অর্থনীতিরও প্রকৃতির এই মিশ্র স্বভাবে প্রভাবিত। কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর বাংলাদেশের অবস্থান হয়েও মাথার ওপর হিমালয় পর্বত এবং পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর থাকায় বাংলাদেশ মরুভূমি নয়। বরং মৌসুমি বায়ুম-ল ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বলয়ের কারণে সুজলা সুফলা। আবার গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বিচিত্র খেয়ালের শিকার। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, গোর্কির কারণে এর জীবনায়ন অর্জনে ঘটে নানা দুর্বিপাক। জলবায়ুর পরিবর্তন আর পরিবেশ দূষণের কবলে পড়ে হিমালয় এখন এ দেশটির জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে ক্রমে হয়ে উঠছে অকাল বন্যা আর খরার কারণ। এ দেশের জনগণ সরলমনা, ভাবুক, কিছুটা পরিশ্রমী এবং অল্পে তুষ্ট। শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাসের কারণে কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী পরিশ্রমে অপারগ এ দেশের জনগণ প্রকৃতির খেয়াল-খুশির ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। সঞ্চয়ের অভ্যাস তাই কম।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বহির্মুখিনতার অন্যতম নিয়ন্তা এর রাজনৈতিক-ভৌগোলিক অবস্থানের দ্বারাও বিশেষভাবে প্রভাবিত। বাংলাদেশের শতকরা ৭৫ ভাগ সীমান্ত ভারতীয় উন্মুক্ত ভূমি, নদী ও পাহাড়ে পরিবেষ্টিত, ৫ ভাগ সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে পাহাড়ি পথ এবং বাকি ২০ ভাগ সীমান্ত বিশে^র সেরা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনসহ সমুদ্র উপকূল-বঙ্গোপসাগর বিধৌত। বৃহতের পাশে ক্ষুদ্র একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির নির্দেশনা ও প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণে যেসব প্রতিকূলতা সচরাচর ঘটে থাকে বাংলাদেশ তার থেকে ব্যতিক্রম নয় কোনো দিক দিয়েই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে; সবসময় প্রত্যাশা থেকেই যায় যে, দেশীয় শিল্প সম্ভাবনাকে উপযুক্ত প্রযতœ প্রদানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর শিল্প ভিত্তি গড়ে তোলা দরকার যা দেশজ কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফিনিশড প্রডাক্ট তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং এর ফলে বিদেশি পণ্যের ওপর আমদানি নির্ভরতা তথ্য মহার্ঘ্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। দেখা গেছে, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ, কৃষিজাত পণ্যের উন্নয়ন ফান্ড জাতীয় মাল্টি সেক্টরাল প্রকল্পগুলোর টাকা অব্যয়িত রয়ে গেছে কিংবা কোথাও কোথাও অপব্যয়িত হয়েছে অপ্রয়োজনীয় খাতে ও ক্ষেত্রে। দেশীয় লাগসই প্রযুক্তি অনুসন্ধান ও গবেষণায় বিদেশি কনসালট্যান্টের পেছনে বিশেষজ্ঞ ব্যয়ে টাকা খরচ হয়েছে অথচ সমন্বয়ের অভাবে কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ সেক্টরের অধিকাংশ প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগে অর্জিত অগ্রগতি বা প্রভাব (impact) অনেক সময় দৃশ্য গোচর হয় না।
শিল্প-ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগে আর বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহারে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত অগ্রগতির হিসাবসংক্রান্ত তুলনামূলক সারণিগুলোর সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্পর্কের শুমার ও বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অর্থনীতির অগ্রগতি ও গতিধারা শনাক্তকরণে অসুবিধা হয় না। দেখা যায়, আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির অংশ হিসেবে ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানির মিশ্র প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অস্থিতিশীল ও ভিন্ন মাত্রিক ট্যারিফ স্ট্রাকচারের প্রভাব পড়েছে বহির্বাণিজ্যে ভিন্ন অনুপাতে। এতে বোঝা যায়, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য সাধারণ সূত্র অনুসরণ করতে দ্বিধান্বিত হয়েছে। উৎপাদন না বাড়লেও সরবরাহ বাড়ার প্রবণতায় মূল্যস্থিতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। আবার ইনফরমাল বর্ডার ট্রেডের ফলে দেশজ উৎপাদনের বিপত্তি ঘটেছে। ইনফরমাল ট্রেড বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক ব্লাক হোল হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের আমদানিকৃত সামগ্রী অন্য দেশে পাচার হয়েছে আবার কোনো কোনো বিদেশি পণ্যের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে আরোপিত ট্যারিফে দেশি সামগ্রী উৎপাদন ব্যবস্থার স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে। নিকট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাধারণ অর্থনীতির নিয়ম-কানুন ও স্বীকৃত প্রবণতা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ঘাত-প্রতিঘাত ও ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তা সামাল দিতে গিয়ে বাজার অর্থনীতির নানামুখী পদ্ধতি প্রয়োগ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় দিতে হয়েছে। বাংলাদেশে রপ্তানি পণ্যের (প্রাথমিক ও ম্যানুফ্যাকচারিং) অবদান এবং গত পাঁচ দশকেই তার তারতম্য লক্ষণীয় দেখা যায়। সেখানে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রাথমিক পণ্যের অবদান প্রচ-ভাবে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা (যেমন নগদ সহায়তা, অবকাঠামোগত সুবিধাদি যেমন যোগাযোগ পরিবহন তথা পোর্টের সমস্যা নিরসন, বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার ইত্যাদি) বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রাথমিক পণ্যের হিস্যা বাড়তে পারে। কৃষিপ্রধান অর্থনীতির জন্য প্রাথমিক পণ্যের টেকসই রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বহুমুখীকরণের কার্যক্রমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি এবং হিমায়িত খাদ্য হিসেবে মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রসেসিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসা আবশ্যক। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিচয় এ রকম ‘আমার যা আছে তা এই, আপনি নিলে নিতে পারেন’। অথচ এটা হওয়া উচিত ছিল ‘আপনি যেভাবে চাচ্ছেন, আমি সেভাবে তা সরবরাহ করতে সক্ষম’। এ জন্য প্রয়োজন বাজার অনুসন্ধান, বিভিন্ন বাজারের চাহিদার প্রকৃতি অনুধাবন এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে সক্ষমতা অর্জনের নিমিত্তে উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে গবেষণা জোরদার করা। এর জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। ভাবনা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অগ্রগতির নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনবোধে কাক্সিক্ষত পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া পরিবর্তনে দ্রুত সমন্বয় সাধনে তৎপর হওয়া আবশ্যক।
রপ্তানি বাণিজ্যে ম্যানুফ্যাকচার সামগ্রীর হিস্যা বেড়েছে। কিন্তু পাট ও চামড়াজাত সামগ্রীর পরিমাণ হ্রাস এবং তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ম্যানুফ্যাকচার পণ্যের রপ্তানি আয়ের ভ্যালু অ্যাডিশনের প্রশ্নে অবস্থা সন্তোষজনক নয়। পাটজাত সামগ্রীর বিশ্ববাজার পড়তি পর্যায়ে। কিন্তু চামড়াজাত সামগ্রীর বাজারজাতকরণের বাংলাদেশের সাফল্য সুদূর পরাহত হবে না, যদি এ খাতটির প্রতি ন্যায্য দৃষ্টি দেওয়া যায়। যদি জাপানের চামড়া শিল্পের সানসেট ইন্ডাস্ট্রি এবং ইতালীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আরও যৌথ বিনিয়োগে যাওয়া যায় এবং বাজার সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক কূটনীতিকে আরও সক্রিয় করা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশ এই খাতে টেকসই অগ্রগতি অর্জন প্রত্যাশা করতে পারে। গার্মেন্টস শিল্পে দেশীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার যৌক্তিকতা অস্বীকার করার জো নেই। শিল্পনীতিতে সমান আচরণের বিধান রেখে এ খাতে অতিথি পাখির মতো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য। এ ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন সংরক্ষণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণে দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এ বিষয়টির সঙ্গে বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং সামাজিক শান্তি-অশান্তির ব্যাপার জড়িত। আমদানি বাণিজ্যে প্রাথমিক পণ্যের ব্যয় ক্রমে হ্রাস প্রাপ্তি বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রম অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। তবে পরিমাণগত দিক দিয়ে ম্যানুফ্যাকচার পণ্যের আমদানি বাড়তেই প্রাথমিক পণ্যের হিস্যা কমেছে এটাও লক্ষণীয়। দেখা যায়, ম্যানুফ্যাকচার পণ্যের গ্রুপে ‘অন্যান্য সামগ্রীর’ আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে যেটা ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে দেশজ চাহিদা বৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে অপারগতা নির্দেশ করে।
ওয়েজ আর্নারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, কিন্তু রেমিট্যান্সের পরিমাণ সে হারে বাড়েনি। এর দুটি কারণ হতে পারে। ওয়েজ আর্নারদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিকদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম এবং বহির্বিশে^ শ্রমবাজারে রয়েছে কর্মসংস্থানে তীব্র প্রতিযোগিতা। তবে এটা অবশ্যই লক্ষণীয়, জিডিপিতে পণ্য রপ্তানি খাতের অবদান যেখানে ১৩.৮%, সেখানে ওয়েজ আর্নিংয়ের অবদান ৪.০১%। রপ্তানি আয় থেকে ভ্যালু অ্যাডিশন বের করার ব্যাপার আছে কিন্তু ওয়েজ আর্নিংয়ের পুরোটাই খাঁটি সোনা। এ কারণে ওয়েজ আর্নিং আমদানি ব্যয় মেটানোর একটা অন্যতম অবলম্বন এবং বৈদেশিক মুদ্রাভা-ারের যোগ্য জোগানদাতা। বহির্বিশে^র শ্রমবাজারের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে দেশের জনশক্তি রপ্তানিতে অধিকতর মনোনিবেশের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। দক্ষ শ্রমিক প্রেরণে সক্ষম অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি শ্রম কূটনীতিতে তৎপর হওয়ার সময় ফুরিয়ে যায়নি বরং বেড়েছে। দূতাবাসে অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম দুই অবলম্বন বাণিজ্য ও শ্রম কূটনীতি। তার প্রতি ন্যায্য মনোনিবেশ দেওয়া উচিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর এবং নীতিনির্ধারক কর্তৃপক্ষের।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান
