তোফাজ্জল দেখতে তরতাজা যুবক। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের তালুকের চরদুয়ানী গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ছিলেন কাঁঠালতলী ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি। বেশ সজ্জন, পরোপকারী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন এই ছাত্রনেতা ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর একে একে হারিয়ে ফেলেন বাবা-মাকে। অসুস্থতা আরও বাড়তে থাকে। একমাত্র বড় ভাই তার চিকিৎসা খরচ চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু জীবনের একমাত্র অবলম্বন বড় ভাইও মারা যান। পরিবার ও অভিভাবকহারা তোফাজ্জল চিকিৎসার অভাবে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
তিন-চার বছর আগের কথা এগুলো। তোফাজ্জলকে প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেতে লাগল দু-তিন বছর আগে থেকে।
যারা তাকে দেখেছেন বা সাহায্য করেছেন, তারা বলছেন খাবার বা খাবারের জন্য টাকা ছাড়া তোফাজ্জলের কোনো চাহিদা ছিল না। এভাবেই ছিন্নমূল মানুষ হিসেবে কোনো মতে জীবন চলে যাচ্ছিল। কখনো খেয়ে, কখনো-বা না খেয়ে। কেউ খোঁজ রাখেননি তার।
তবে গতকাল রাতে তোফাজ্জলের খোঁজ নেওয়ার মানুষের বোধহয় অভাব পড়েনি। কেউ তাকে খুঁজেছেন চোর হিসেবে, কেউ হয়তো খুঁজেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশ হিসেবে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে কেউ তাকে খুঁজে পেয়েছেন ব্যথিত হৃদয়ে, কেউবা স্বাধীনতার তিরস্কার। কেউ হয়তো তাকে খুঁজে পেয়েছেন ছাত্রলীগের নির্যাতনে নিহত বুয়েট ছাত্র আবরারের মধ্যে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে সন্ধ্যার পর। শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলা চলাকালে তোফাজ্জল হলে প্রবেশ করলে কিছু শিক্ষার্থী তাকে চোর সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হলের ভেতরে ধরে নিয়ে যান। দুপুরে খেলাধুলা চলাকালে তাদের ছয়টি মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যাওয়াই শিক্ষার্থীরা বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। এই ক্ষোভ থেকেই তারা তাকে শারীরিক নির্যাতন করে মোবাইল চুরির বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেন। শিক্ষার্থীদের পিটুনিতে একসময় তোফাজ্জল নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এ অবস্থা থেকে আর জীবনে ফিরতে পারেননি।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান ইমরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘তোফাজ্জল পরিবার ও অভিভাবকশূন্য হয়ে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তিন-চার বছর ধরে। বিগত দু-তিন বছর তোফাজ্জল প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতেন। খাবার ও খাবারের টাকার বাইরে ওর তেমন কোনো চাহিদা ছিল না। হয়তো আজকেও খাবারের জন্য ও এফএইচ (ফজলুল হক) হলে গিয়েছিলেন। বিষয়টি আমি জানতে পেরে সাংবাদিক ছোট ভাইকে জানালে সে কথা বলে নিশ্চিত হয় তাকে মারা হবে না। পরে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ফেসবুকে দেখি তোফাজ্জল এফএইচ হলের শিক্ষার্থীদের নির্মম নির্যাতনে মারা গেছেন।’
তোফাজ্জল তালুকের চরদুয়ানী গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে। তার এমন মৃত্যুর খবর শুনে উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তোফাজ্জল বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করে বঙ্গবন্ধু ল কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন। এ অবস্থাতেই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।
তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যার আগে দুই দফায় টাকা দাবি করেছিল হত্যাকারীরা বলে অভিযোগ করেছেন তার মামাতো বোন। তিনি বলেন, প্রথমে রাত ১০টার পরে তোফাজ্জলের বড় ভাইয়ের স্ত্রী শরীফা আক্তারের কাছে দুই লাখ টাকা এবং পরে তোফাজ্জলের মামার কাছে ৩৫ হাজার টাকা চেয়েছিল হত্যাকারীরা।
তোফাজ্জলের চাচা ফজলুর রহমান জানান, তোফাজ্জলের বাবা আবদুর রহমান প্রায় ১০ বছর আগে মারা যান। এর তিন বছর পর মারা যান তার মা। এরপর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। বড় ভাই নাসিরের আশ্রয়ে থাকতে শুরু করেন। ভাইও দুই বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
ফজলুর রহমান জানান, বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করেই কেটে যেত তোফাজ্জলের দিন। ভাই মারা যাওয়ার কিছুদিন পর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে মারধর করেন বাজারের লোকজন। তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও কাউকে মারধর বা কিছুই করত না। সে শুধু পরিচিত লোকজনের সঙ্গে দেখা হলেই ২০ টাকা, ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা চেয়ে নিত। কোনো কিছুতেই এর বেশি তার চাহিদা ছিল না। পাথরঘাটার এক লোক তাকে আশ্রয় দিয়ে চিকিৎসাও করেছিলেন। সেখানে থেকে কিছুটা সুস্থ হয়েছিল সে। এরপরে শুনেছি ঢাকায় চলে গেছে। কখনোই তাকে চুরি করতে শুনেননি তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে তা মানার মতো না। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তিনি।
তোফাজ্জলের চাচাতো ভাই ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে শুনেছি তোফাজ্জলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন ঢাকা মেডিকেলে ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে আছেন চাচাতো ভাই শাহাদাত হোসেন। থানার আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবেন। মরদেহ আনার পর জানাজা শেষে বাবা-মায়ের পাশে দাফন করা হবে।
এ বিষয়ে পাথরঘাটা থানার ওসি মো. আল মামুন বলেন, ‘আমাকে ঢাকা থেকে ফোন দিয়ে জানিয়েছেন একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এরপর আমি নাম-ঠিকানা যাচাই করে জানতে পেরেছি, তার বাড়ি কাঁঠালতলী এলাকার তালুকের চরদুয়ানী গ্রামে। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।’
