ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে

ঢাবির ফজলুল হক হলে চোর সন্দেহে ‘মানসিক ভারসাম্য’হীন যুবককে পিটিয়ে হত্যা  জাবিতে পিটিয়ে হত্যা ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকে  গ্রেপ্তার ৪ বহিষ্কার ৮

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৪ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও সিনিয়র শিক্ষার্থীরা নানাভাবে বুঝিয়ে তাদের থামাতে পারেননি। পিটিয়ে হত্যা করা হয় যুবকটিকে। তার আগে তাকে খেতে দেওয়া হয়। হলে ঢুকলে ওই যুুবককে মোবাইল ফোন চোর সন্দেহে আটক করে একদল শিক্ষার্থী। নিষ্ঠুর এ গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে কয়েক দিন আগেই আরেকটি ইতিহাসের জন্ম দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে।

গত বুধবার রাতে তোফাজ্জল নামের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ওই যুবককে হত্যা করা হয়েছে। একই রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল শিক্ষার্থী পিটিয়ে হত্যা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে।

দেশের সেরা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিষ্ঠুরতা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা। যথাযথ বিচার চান সবাই। সমস্বরে সবাই বলছেন ‘মব জাস্টিস নো মোর’। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন ও মামলা করেছে। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ফজলুল হক হল সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে হলের মাঠে শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট খেলা চলাকালে ছয়টি মোবাইল ফোন চুরি হয়ে যায়। খেলা চলাকালেই সন্ধ্যার পর তোফাজ্জল হলে ঢুকলে মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহে তাকে আটক করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। রাত ৮টার দিকে তাকে গেস্টরুমে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং মারধর করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে তাকে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে আবারও গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাকে আরেক দফা পেটানো হয়। রাত ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তোফাজ্জলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী এলাকার বাসিন্দা তোফাজ্জল ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ জানার পরও তাকে ছাড়েননি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। এর জন্য হল প্রভোস্টের দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ তুলেছে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, মারধরের ঘটনায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সেশনের শিক্ষার্থীরা জড়িয়েছেন। তাদের মধ্যে কারও ভূমিকা ছিল আক্রমণাত্মক আবার কারও ছিল রক্ষণশীল।

ওই শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তোফাজ্জলকে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ, যিনি কিছুদিন আগেও হল ছাত্রলীগের উপবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ছিলেন। কোটা আন্দোলনের একপর্যায়ে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। এ ছাড়া গণপিটুনির ঘটনায় জড়িত ছিলেন মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আবদুস সামাদ, ফার্মেসি বিভাগের মোহাম্মদ ইয়ামুজ জামান এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মোত্তাকিন সাকিন। নির্যাতন করা শিক্ষার্থীদের সবাই ফজলুল হক হলের শিক্ষার্থী।

আরেকটি সূত্র জানায়, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতান প্রথমে চোর সন্দেহে তাকে ধরে গেস্টরুমে নিয়ে আসেন। সূত্রটির তথ্যমতে, মারধরে জড়িত ছিলেন মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের রাশেদ কামাল অনিক, গণিত বিভাগের রাব্বি এবং সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ওয়াজিবুল। এ ছাড়া অভিযুক্তদের তালিকায় আছেন, হল শাখা ছাত্রলীগের গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন উপসম্পাদক আহসান উল্লাহ। আরেকজন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আল হোসাইন সাজ্জাদ। তিনি ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলে জানা যায়। তোফাজ্জলের আঙুলের মধ্যে স্ট্যাম্প রেখে তার ওপর শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যান সাজ্জাদ। এসব অভিযোগের সপক্ষে দেশ রূপান্তরের হাতে বেশ কয়েকটি ভিডিও আছে। এ ছাড়া একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও অভিযোগ করেছেন।

ফজলুল হক মুসলিম হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, রাত ১০টার দিকে হলের হাউজ টিউটররা ঘটনাস্থলে গেলে রাত ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান কয়েকজন শিক্ষার্থী। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলে ওই শিক্ষার্থীরা সেখানে রেখেই সরে যান। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফারুক বলেন, হাসপাতালে নিয়ে এলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। লাশটি মর্গে রাখা হয়েছে। নিহত তোফাজ্জলের সারা শরীরে ক্ষত ও আঘাতের চিহ্ন ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি হল গ্রুপে রাত ৮টার সময় দেখি হলে চোর ধরা পড়েছে। হলের গেস্টরুমে গিয়ে দেখি সন্দেহভাজন সেই চোর বসা। রুমে তখন ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ারের অনেক ছেলে ছিল। গেস্টরুমে তাকে বেশি মারা হয়নি। ওখানে হালকা মারার পর ক্যান্টিনে নিয়ে আসেন খাওয়ানোর জন্য। তারপর শুনি তাকে এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তখন ওখানে গিয়ে দেখি ২০-২১, ২১-২২ ও ২২-২৩ সেশনের ব্যাচ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন। ফার্স্ট ইয়ার যে ব্যাচটা ছিল, ওরা মারে নাই। ২০-২১ আর ২১-২২ সেশনের ওরা খুব বেশি মেরেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই-তিনজন মিলেই ওরে ওখানে মেরে ফেলছেন। তারা হলেন মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০-২১ সেশনের মোহাম্মদ সুমন, ওয়াজিবুল, ফিরোজ ও জালাল। তাদের মধ্যে সুমন, ফিরোজ ও জালাল সবচেয়ে বেশি মেরেছেন। গেস্টরুমে সন্দেহভাজন চোরের হাত বেঁধেছেন জালাল। সুমন চোখ বন্ধ করে মেরেছেন তাকে, মারতে মারতে ও (তোফাজ্জল) পড়ে গেছেন। এরপর পানি এনে তাকে খাওয়ানো হলে তিনি উঠে বসেন। এ সময় সবাই হাততালি দেন।’

ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘সবাই খুশি হন কারণ তাকে আবার মারতে পারবেন। এরপর আবার শুরু হয় পেটানো। এই দফায়ও সবচেয়ে বেশি মেরেছেন ফিরোজ। পরে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের জালাল আসেন। জালাল এসে আরও মারতে উৎসাহ দেন; বলেন, “মার, ইচ্ছামতো মার; মাইরা ফেলিস না একবারে”। এ সময় গ্যাসলাইট দিয়ে ওই যুবকের পায়ে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সুমন এসে তোফাজ্জলের ভ্রু ও চুল কেটে দেন।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘তোফাজ্জল মানসিক বিকারগ্রস্ত জানার পরও ওরা (শিক্ষার্থীরা) বিশ্বাস করতে চাননি। সেখানে আসা শিক্ষকদের সামনেও তোফাজ্জলকে পেটানো হয়। শিক্ষকরা বাধা দিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তোফাজ্জলকে হলের মেইন বিল্ডিংয়ের গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর জালাল প্রচুর মারেন তাকে। বুট জুতা পরে এসে তোফাজ্জলের আঙুল মাড়িয়ে ছেঁচে ফেলেন। তার মাংসগুলো খসে পড়ে গেছে। তার গোপনাঙ্গে প্রচুর আঘাত করা হয়েছে। আঙুলগুলো পুরো ছেঁচে ফেলা হয়েছে। ওই জালাল ছেলেটা করেছেন। সবার সামনেই এগুলো করেছেন।’

ওই শিক্ষার্থী জানান, পরে অবস্থা খারাপ দেখে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঁচ-ছয়জনের একটি দল তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তোফাজ্জলকে হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফজলুল হক হল থেকে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানে প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টররা হল পরিদর্শন করেন এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ৪৮ ঘণ্টার তদন্ত প্রতিবেদন এবং জড়িতদের আটকের কথা জানান তারা। পরে তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাহবাগ থানায় করা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়। সে অনুযায়ী, প্রথমে চার শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে শাহবাগ থানা-পুলিশ। তারা হলেন জালাল মিয়া, মোহাম্মদ সুমন, মোত্তাকিন সাকিন ও আল হোসাইন সাজ্জাদ। পরে ওয়াজিবুল আলম ও আহসান উল্লাহকে আটক করা হয়।

আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমদ জানান, বাকিদের খোঁজা হচ্ছে। ইতিমধ্যে হল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামীকাল (আজ শুক্রবার) সকালে কমিটি চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

জাবিতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকে হত্যা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) একদল শিক্ষার্থী পিটিয়ে হত্যা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে। বুধবার রাতে আহত অবস্থায় তাকে সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমের মৃত্যু হয়।

নিহত শামীম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৩৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ দেখে জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক ফটক এলাকায় শামীম মোল্লাকে দেখতে পেয়ে কয়েক দফা মারধর করেন বিক্ষুব্ধ কয়েকজন শিক্ষার্থী। খবর পেয়ে সেখানে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে তাকে আবার মারধর করা হয়। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি সেখানে উপস্থিত হয়ে শামীমকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রক্টর অফিস থেকে শামীমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যান। নিরাপত্তাকর্মীরা শামীমকে কক্ষে রেখে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। তখন শিক্ষার্থীরা কক্ষের তালা ভেঙে কয়েক দফা মারধর করেন শামীমকে। প্রক্টরিয়াল বডি পুলিশকে খবর দিলে প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। রাত সোয়া ৯টার দিকে আহত অবস্থায় শামীমকে পুলিশের হেফাজতে সাভার গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, কোটা আন্দোলন চলাকালে গত ১৫ জুলাই রাতে উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রলীগের হামলার মূল হোতা ছিলেন শামীম।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের চারজনকে শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ভূঁইয়া, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৫ ব্যাচের রাজু আহমেদ এবং একই বিভাগের ৪৬ ব্যাচের রাজু রাজন হাসান, ইংরেজি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের হামিদুল্লাহ সালমান। আবু সাইদ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বাকি সবাই শাখা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার সমন্বয়ক আহসান লাবিব এবং ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ৪৯ ব্যাচের আকিতুজ্জামানকেও শনাক্ত করা গেছে।

৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া শামীম মোল্লাকে লাথি মারছেন ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ৪৯ ব্যাচের আকিতুজ্জামান। একই সময়ে তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক আহসান লাবিব। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কার্যালয়ের ভেতরে চেক শার্ট পরা শামীমকে গাছের ডাল দিয়ে পেটাচ্ছেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৫ ব্যাচের রাজু আহমেদ। এ ছাড়া হামিদুল্লাহ সালমান ও আবু সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া তাকে সেখানে মারধর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন।

তবে শনাক্ত হওয়া সবাই মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। আবু সাঈদ বলেন, ‘কেউই হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে মারধর করেনি। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দেখতে গিয়েছিলাম।’ রাজু আহমেদ বলেন, ‘আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে শোনার পর সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি শামীমকে ধমক দিই, তাকে মারধর করিনি।’ রাজন হাসান বলেন, ‘আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম কিন্তু মারার জন্য সেখানে যাইনি। যারা তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল তাদের আমি নিষেধ করেছিলাম।’ হামিদুল্লাহ বলেন, ‘আমি সন্ধ্যায় হলে ছিলাম। পরে খবর পেয়ে প্রক্টর অফিসে যাই। কিন্তু শামীম মোল্লাকে মারধর করিনি।’

মারধরের ঘটনায় শনাক্ত হওয়া সমন্বয়ক আহসান লাবিবকে অব্যাহতি দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

শামীম হত্যার ঘটনায় থানায় গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আট শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে। তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চারজন রয়েছেন।

শামীম হত্যাকা-কে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- উল্লেখ করে প্রতিবাদ ও অভিযুক্তদের বিচার দাবি করে বুধবার রাতে এবং গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকরা। চার দফা দাবি জানান তারা।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকা-ের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার। তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। আমরা অনতিবিলম্বে দোষীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে নিহত তোফাজ্জলের কথা উল্লেখ করে আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘মানুষটার শরীর দেখে বুয়েটের আবরারের কথা বারবার মনে পড়েছে। সব অন্যায়কারীর বিচার হোক। নির্দোষ কেউ শাস্তি না পাক।’

দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারবহির্ভূত এই দুই হত্যাকা-ের বিচারের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানান সংগঠনের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘অবিলম্বে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করছি। অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার আগেই গ্রেপ্তারের আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রশাসনকে ‘মব জাস্টিস’কে প্রশ্রয় না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কয়েক ঘণ্টা ধরে মারধর করে একজনকে হত্যা করার ঘটনাকে আমরা হল প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা বলে মনে করছি। ছাত্রলীগের পদধারী কিছু সন্ত্রাসী বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থী নামে হলগুলোয় অবস্থান নিয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় মব তৈরি করে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী নামে সক্রিয় এই মবকে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে অনুরোধ করছি।’

এদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, কেউ অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত