রাজনৈতিক দলের সংস্কার না করে দেশের সংস্কার হবে না

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৩৬ এএম

জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত এই কমিটি নানা কারণে আলোচনায় এসেছে। কমিটির গঠন, লক্ষ্য, কর্মপরিধিসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী।

দেশ রূপান্তর : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক ও পার্থক্য কী? আপনাদের কমিটির গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল একটা প্ল্যাটফর্ম, যাদের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। আমরা সেই জনতার তরুণ ও নাগরিক অংশ। আমাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছিল না। এ জন্য বিচ্ছিন্ন কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কাছাকাছি অবস্থানে এসেছি, সেই নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করা জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম বানিয়েছি সেটা হলো জাতীয় নাগরিক কমিটি। এর মাধ্যমে আমরা রাজনৈতিকভাবে যেন একটা বোঝাপড়ায় আসতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। মূলত গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশকে পুনর্গঠন করার যে দায়িত্ব এসেছে, আমরা সেই জায়গায় কাজ করার জন্য এই প্ল্যাটফর্ম বানিয়েছি।

দেশ রূপান্তর : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন তো একভাবে এই সরকারের সঙ্গে আছে। তো আপনাদের অবস্থান কী? আপনারা কি সরকারের পক্ষে, নাকি ছায়া সরকারের মতো কাজ করছেন, নাকি বিরোধী দল?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দুটি ফোর্স ছিল ছাত্রদের একটা, আরেকটা নাগরিকদের। ছাত্রদের জায়গা থেকে গভর্নমেন্টে দুজন প্রতিনিধি গিয়েছে বা পাঠানো হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গভর্নমেন্টে গিয়েছে এমন না। ওই দুজন ছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বাকি যারা লিডার অথবা সমন্বয়ক ছিলেন তারা সরকারে নেই এবং তারা জনগণের দাবিগুলোর পক্ষে কাজ করছেন। সুতরাং আন্দোলনকারী ছাত্ররা কিন্তু মাঠে আছেন। আর আমরা আন্দোলনের যারা নাগরিক ফোর্স, আমরা জনগণের সঙ্গে মিশে তাদের সুসংগঠিত ভয়েজটা যেন সরকারকে দিতে পারি, সেখানে কাজ করছি। তো আমরা সরকারের অংশ না, আবার সরকারবিরোধীও না। কারণ সরকারটা গঠন করেছে জনগণ, ছাত্র এবং নাগরিকরা। আমরা জনগণের কাতারে আছি।

দেশ রূপান্তর : আপনারা রাজনৈতিক দল গঠন করবেন কি না, এ নিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আপনাদের পরিকল্পনাটা কী রকম?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : নাগরিক কমিটির প্রাথমিক কাজটা হলো একদফা দাবিটার বাস্তবায়ন করা। সেটা হলো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নিউ পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট। তো সেই জায়গা থেকে আমরা স্টেটের কথা বলি। স্টেটের একটা অর্গান হলো পলিটিক্যাল পার্টি। স্টেটের মধ্যে অনেকগুলো সেক্টর আছে, অনেকগুলো অর্গান আছে। আমরা চাই, তরুণদের প্রতিনিধিত্বকে রাষ্ট্রের সেই জায়গাগুলোতে নিয়ে যেতে। আমরা চাই আগামীর বাংলাদেশের সব সেক্টরে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব তৈরি করতে। এই প্ল্যাটফর্মে সব ধরনের লোকই আছে, কেউ যদি মনে করেন পরবর্তী সময়ে পলিটিক্যাল দল গঠন করবেন সেটা তাদের বিষয়। ফলে, আমাদের নাগরিক প্ল্যাটফর্ম একটা রাজনৈতিক উদ্যোগ কিন্তু পলিটিক্যাল পার্টি না। আমাদের ব্যানারে অনেক ধরনের ইয়াংদের কানেক্ট করছি, নানা শ্রেণি-পেশার লোককেও কানেক্ট করছি। সবাই তো আসলে রাজনীতি করেন না একটা সোসাইটিতে।

দেশ রূপান্তর : জনগণের দাবিগুলোকে সরকারের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটা কী? এই ধরেন, সংবিধান বা নির্বাচন কমিশন আইন সংস্কারের কথাই বলা হোক না।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আমরা মনে করি, জনগণের ভয়েসটা বাংলাদেশে আগের সরকারের কাছে পৌঁছানোর এক্সেস পায়নি। জনগণের ভয়েস কিন্তু ছিল। সেই জায়গাতে মিডিয়া একটা ওয়ে হতে পারে। আরেকটা হতে পারে, সরকারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা, আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে কথা বলার এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমরা মনে করছি যে এটা যেহেতু জনগণের সরকার তারা জনগণের দাবির কথা শুনবে।

দেশ রূপান্তর : জনগণের সরকার তো নির্বাচন দিয়ে আসে, আর এটা তো অভ্যুত্থানের সরকার।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : এখানে অভ্যুত্থানে যে সরকার গঠন হয়েছে সেখানে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা এই সরকার গঠনে অংশ নিয়েছে প্রতিনিধি রাখার মাধ্যমে আর সব রাজনৈতিক পার্টি সেটা মেনে নিয়েছে। সেই জায়গা থেকে এটা জনগণের সরকার। সরকারে কিছু লোক গিয়েছেন, তারা আসলে জনগণকে সরকারের সার্ভিসটা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। জনগণ যে সার্ভিসগুলো এতদিন পায়নি, এই সরকার সেগুলোর ফুলফিলমেন্ট করবে। যিনি সরকারে আছেন তার একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রেস্পন্সিবিলিটি রয়েছে এবং আরেকটা হচ্ছে নাগরিককে সার্ভিস দেওয়া স্টেট ফাংশনারি ইউজ করে। তো সেই জায়গায় যারা সরকারের বাইরে আছেন তারাও নাগরিক যারা সরকারে আছেন তারাও নাগরিক। যারা সরকারের বাইরে রয়েছেন তাদের জায়গাটা হলো তারা কী কাজ পাবেন সেটা সরকার থেকে বুঝে নেওয়া। সরকারের জায়গাটায় যে মানুষগুলো আছেন তাদের কাজ হলো জনগণের যে কাজগুলো আছে তা তাদের দেওয়া।

দেশ রূপান্তর : পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের কথা বললেন, এটা তো অনেক বড় বিষয়। এ জন্য আপনার কী করছেন?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট শুধু রিফর্মের জায়গা না, এটা একটা ব্যবস্থা, নতুন ব্যবস্থা।  আমরা ৪৭ সালে জীবন দিয়েছিলাম, আমরা ৫২ সালে দিয়েছিলাম, আমরা ৬৯-এ দিয়েছি, ৭১-এ দিয়েছি। যখন একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল তখন শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক সব ধরনের মানুষের অসংখ্য ভাষা একত্র হয়েছিল। প্রত্যেকটা ভাষার মধ্যে প্রত্যেকটা জীবনের মধ্যে একেকটা আকাক্সক্ষা ছিল। সেই সব ভাষা ও আকাক্সক্ষা একত্র করে আমরা একটা স্টেট চেয়েছিলাম। যেটাকে আমরা বলেছিলাম রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।  সেটা ৭২-এ এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটা একদলীয় হয়ে যায়। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মানুষের পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট হয়েছে। সবগুলো ভাষার আঙ্গিকের মানুষের পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট হয়নি। আমাদের সামনে আরেকটা সুযোগ এসেছিল ৯০-এ যখন স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্ররা তাদের বিদায় করেছিল। তখনো আমরা একটা অবস্থায় পৌঁছেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জামায়াত, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ সবাই আমাদের সঙ্গে বিট্রে করেছে। যার ফলে ১/১১ এসেছিল আর ২০০৮-এর পর থেকে পরবর্তী ১৫ বছর একটা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা চেপে বসেছিল। আমরা মনে করি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবে এসব ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা যাতে কায়েম না হতে পারে সেটার বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরির জায়গাটাকেই আমরা নিউ পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট বলছি।

দেশ রূপান্তর : ৯০-এ তো একটা ৩ দলীয় রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। সেটা ব্যর্থ হয়েছে। ওই রূপরেখা তো সংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলো মিলে করেছিল। কিন্তু আপনারা তো সেই অর্থে সাংগঠনিক জায়গায় নেই। 

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী :  আসলে ৯০ আর ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে পার্থক্য আছে। ৯০-এর অভ্যুত্থান সংঘবদ্ধ পার্টিগুলোর নেতৃত্বে এবং অংশগ্রহণে হয়েছিল। কিন্তু ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের মতো এত সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সেখানে ছিল না। এবারের অভ্যুত্থানে একদম প্রান্তিক লেভেলের রিকশাওয়ালা, শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিল। এটা একটা চ্যালেঞ্জের জায়াগাও। চ্যালেঞ্জটা কে মোকাবিলা করবে? সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি নাগরিক কমিটি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে এই সেটেলমেন্টের কাজ করবে যাতে এই দেশে কখনো আর ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কায়েম না হতে পারে এবং পলিটিক্যাল পার্টিগুলো এমন একটা জায়গায় আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আসে যেখানে তাদের সিস্টেম ফ্যাসিবাদী হতে পারবে না।

দেশ রূপান্তর : আপনারা নিজেরাই একটা বন্দোবস্ত তৈরি করে দেবেন, নাকি এক্সিসটিং পার্টিগুলোর সঙ্গে বসে সেটা করবেন? নাকি কোনো প্রস্তাবনা দেবেন? 

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে একটিই ব্যানার ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেখানে সবাই এক ব্যানারে অংশ নিয়েছেন। কেউ বিএনপি-জামায়াত হিসেবে অংশগ্রহণ করেননি। নাগরিকদের অংশটাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। কিন্তু ৯০-এর অভ্যুত্থানের ড্রাইভিং সিটে ছিল পলিটিক্যাল পার্টি। তো ৭২-এর প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত একদলীয় হয়ে গেছে, ৯০-এও সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা বা ভয়েসকে জায়গা দেওয়া হয়নি এবং ওই রূপরেখার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও বিট্রে করে। এখন আমরা চাচ্ছি ২৪-এর অভ্যুত্থানের পর যে বন্দোবস্ত হবে সেখানে যেন কৃষকেরও একটা ভয়েস থাকে, সবজিওয়ালাদেরও ভয়েস থাকে। তাদের পলিটিক্যাল পার্টির সক্ষমতা নিয়ে আসার দরকার নেই।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের কমিটিকে তো বলা হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও সেলিব্রেটি পেশাজীবীদের কমিটি। আপনাদের সঙ্গে কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক মানুষ কই?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আমরা শুধু উদ্যোগটা গ্রহণ করেছি মাত্র। আর এটা কিন্তু আংশিক কমিটি, এটা ফাইনাল কমিটি না। আমাদের এখানে শ্রমিক, কৃষক সবাই যুক্ত হবে। একাত্তর থেকে আমাদের দেশে কিন্তু লিডারশিপ তৈরি হয়নি, আমরা বাংলাদেশে ৫০০-৬০০ লিডারশিপ ক্রিয়েট করব। যারা বাংলাদেশ প্রশ্নে একই স্বার্থে কথা বলবে। আমরা ওই পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টে যাব। দেখেন বাংলাদেশ নিয়ে ইন্ডিয়ার বিজেপি থেকে শুরু করে কংগ্রেসসহ সবাই এক হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সেই ন্যাশনাল ইউনিটি নেই। আমাদের পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর একটা কমন গোল থাকবে যে বাংলাদেশ প্রশ্নে আমরা সবাই এক থাকব। পলিটিক্যাল পার্টির সংস্কার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ পলিটিক্যাল পার্টির সংস্কার না করে দেশের সংস্কার হবে না। আবার, সেটা কী দিয়ে সংস্কার করবেন? একটা সংবিধান লাগবে তো। এখানে প্রশ্ন আসে ৭২-এর সংবিধান দিয়ে সংস্কার করবেন কি না, যেটা একদলীয় এবং ফ্যাসিস্ট জিনিস? ঐটার দ্বারা করলে তো নতুন ফ্যাসিস্ট তৈরি হবে। আমরা সংবিধান সংস্কার না, নতুন করে সংবিধান লিখতে চাই। গণঅভ্যুত্থানের ভাষা, সব মানুষের ভাষা আমরা সংবিধানে নিয়ে আসতে চাই। সেটা কীভাবে হবে? আমরা মানুষের সঙ্গে আলোচনা করব সেটা যদি গণপরিষদের মধ্যে হয় বা পুরো বাংলাদেশে ভোটিং সিস্টেমে গণরায় দেবে, বিভিন্ন গ্রুপ বা পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে আলোচনা করে একটা কমন গোলে পৌঁছানোর কথা ভাবছি। গণ-অভ্যুত্থানটা হয়েছিল একদফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যে আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিলোপ চাই। এর মধ্যে ফ্যাসিস্ট যদি সংবিধান করে সেটাও বাতিল হয়ে যাবে। সুতরাং এই জায়গা থেকে জনগণ একটা রায় দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : এই অন্তর্বর্তী সরকারকে আপনারা সাপোর্ট করছেন। আপনারা আসলে কতদিন এই সরকারকে দেখতে চান আর তাদের দ্বারা কী কী সংস্কার দেখতে চান?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : সময়ের কথা যদি বলি আমরা সরকারকে কাজের ভিত্তিতে সময়  দেব। যেমন সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলো কতদিনে পারে, কমিশন করেছে সেই কমিশন কতদিনে অ্যাকটিভ করে, কী কী কাজ করে সেটার পর্যালোচনার জায়গায় রাখব।  এখন ধরেন যদি আমি তাদের এক বছর বা দুই বছরের সময় দিচ্ছি তাহলে সে যদি করতে না পারে তাহলে কীভাবে হবে? কিন্তু সে যদি মনে করে যে, সে উদ্যমী, ক্যাপাবল, কাজ করার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা দেখি বাংলাদেশের পরিবর্তন যা চেয়েছি তা হচ্ছে তাহলে তাকে আমাদের সময় দিতে সমস্যা নেই। কারণ জনগণই তাদের সে সময় দেবে। যদি না পারে তাহলে সেখানে তো সময়ের প্রশ্নই আসে না।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচন নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হয়েছে, লড়াই করেছে, আহত হয়েছে এবং আমরা... তরুণরা কিন্তু ভোট দিতে পারিনি। যারা শহীদ হয়েছে তাদের আকাক্সক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তারা খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ দেননি। সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে আমরা অতি দ্রুত দেখতে চাই। কিন্তু সেখানে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া সেটা যদি ফেয়ার অ্যান্ড নিউট্রাল জায়গায় না হয় তাহলে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেতে পারব না। সেই জায়গায় জনগণকে নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রটা একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গিয়েছে, ফেয়ার সুযোগ রয়েছে ইলেকশনের এবং এই ইলেকশনের মধ্যে কোনো ম্যাকানিজম হবে না, জনগণ তার একান্ত এবং ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ফেয়ার ভোটিং ব্যবস্থা দিতে পারবে সেই জায়গায় গেলে আমরা মনে করি শহীদদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি এবি পার্টি করতেন এটা অনেকেই বলেছেন। ভেরি ফিউ বলেছেন যে, আপনি ফেডারেশন করতেন। সার্বিকভাবে আপনার জার্নিটার সম্পর্কে যদি বলতেন।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আমি যখন ঢাকা ভার্সিটিতে এসেছি তখন আমাকে গেস্টরুম বা গণরুমের টর্চার সেলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাকে হল থেকে ছাত্রলীগের পোলাপান দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। ওই সময়গুলোতে আমি টিএসসিতে বিভিন্ন আলোচনা, পাঠচক্রগুলোতে যেতাম। সেখানে গিয়ে মনে হয়েছে যে, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কিছু মানুষ আছেন যারা দেশ নিয়ে ভাবেন, চিন্তা করেন। তখন আমি ছাত্র ফেডারেশনের কিছু পাঠচক্রে গিয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে তখন বোঝাপড়া হয়, কথা হয়। চিলেকোঠার সেপাই, ছফা, রাজ্জাকের বইটই পড়ি। তাদের সঙ্গে মেশা শুরু করি এবং আস্তে আস্তে ছাত্র ফেডারেশন করি। কিন্তু আমার লড়াই ছিল ভিন্ন। যেমন, আমি ক্যাম্পাসের মেজর ইভেন্টের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। যেমন হলো বর্ডার কিলিং নিয়ে, যেটা তাদের পলিটিক্যাল জায়গা না। আমি ৫৪ দিন রাজু ভাস্কর্যে ছিলাম সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবিতে। এটা কিন্তু কাউকে ফোকাস করছে না। তারপর কাশ্মীরে মানুষের ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল, সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্যের প্রবলেম হচ্ছে, পাটশিল্প যে ধ্বংস করা হচ্ছে এসব নিয়ে আমি সেখানেও দাঁড়িয়েছিলাম। সেগুলো কিন্তু ছাত্র ফেডারেশনের ব্যানারে না, আলাদাভাবে। আমি দেখলাম যে, ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠন যেগুলো  রয়েছে তারা সৃজনশীল বা ক্রিয়েটিভ জায়গা থেকে রাষ্ট্রের অনেক ইম্পর্ট্যান্ট ইস্যুতে ফোকাস করতে পারছে না। তখন আমার মনে হয়েছে ইয়ুথদের কানেক্ট করে স্টেটকে রক্ষা করা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার কাজ করা দরকার। সেখানে আমি কাউকে পাইনি, তাই একাই বসেছিলাম এসব ইস্যুতে। তারপর ডাকসু নির্বাচনের দাবি নিয়ে লিডিং পর্যায়েই ছিলাম এবং সেটা সফল করেছি। আমি ডাকসুর ইলেকশন করেছিলাম সমাজসেবা সম্পাদক পদে এবং এটা অ্যালায়েন্স হওয়ার কথা ছিল কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হয়নি। ছাত্র ফেডারেশন থেকে ইলেকশন করেছিলাম। নিরাপদ ক্যাম্পাস, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছিলাম, কোটা সংস্কারে ছিলাম। প্রত্যেকটা জায়গায় যেটা জনগণের পক্ষে সেখানে ছিলাম। আমার মনে হয়েছে আপনি যদি কেবল লড়াইয়ের জায়গায় থাকেন পলিটিক্সের জায়গা যদি ক্লিয়ার না থাকে তাহলে লড়াইটাকে স্টেট লেভেলে নিতে পারবেন না। যার কারণে স্টুডেন্ট ফেডারেশনে যুক্ত হওয়া। আবার ন্যাশনাল লেভেল থেকে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) যখন বলেছিল তারা একটা ওয়েলফেয়ার স্টেট করবে বা অধিকারের রাজনীতি তারা করবে, তখন আমি তাদের সঙ্গে রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনে যুক্ত হয়েছিলাম, কারণ এখানে যেহেতু রিসার্চ হচ্ছে না, পলিসি বেইসড কাজ হচ্ছে না। তাহলে স্টেট লেভেলে একটা পার্টি যারা পলিসি লেভেলে কাজ করবে ওই জায়গা থেকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু কনকারেন্টলি আমি এই যে ছাত্রশক্তি ছিল ওদের সঙ্গেও রিলেটিভলি আলোচনা বা বোঝাপড়া বা রাজনৈতিক শিক্ষাটা নিচ্ছিলাম যে কীভাবে নতুন বাংলাদেশ গঠন করা যায়। একসঙ্গে আমি আসলে রাজনৈতিক পরিবেশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমি কখনো প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি পদে বা পোস্টিং পদায়নে সেভাবে ছিলাম না। আমি শুধু লড়াইটাতে ছিলাম, কনকারেন্টলি পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে আমার এফিলিয়েশন ছিল। কারণ ওদের মধ্য দিয়ে বোঝাপড়াটা অনেক বেশি থাকে। একটা হলো আপনি একা-একা পড়াশোনা করেন আরেকটা হলো আপনি একটা ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন।

দেশ রূপান্তর : এখন আপনার রাজনৈতিক অবস্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? নাকি সেটা করবেন না?

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আমি সবসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক জায়গাটা, আগামীর বাংলাদেশ, রাজনীতিটা কেমন হবে সেটাকে সেন্টার পজিশনে রাখি। আমি সেন্টার রাইটে না, আমি সেন্টার লেফটে না। আমি জাতীয়তাবাদী না। আমি মনে করি এখানে সিভিলাইজেশন স্টেট হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সিভিলাইজেশন এখন একটা বাতুলতাও মনে হয় একটা জায়গা থেকে। কারণ আমাদের যেহেতু নেশন স্টেট রয়েছে। কিন্তু আমাদের একটি কমিউনিটি যদি বিল্ডআপ করতে না পারি, আপনি চিন্তা করেন, একটা স্টেট আকারে বিশ্বে আপনার অবস্থান কী; আরেকটা হচ্ছে অ্যাজ এ বাঙালি কমিউনিটি তারা বিশ্বের কোন জায়গায়। পার্সিয়ান সিভিলাইজেশন আছে, আমেরিকান, জাপানিজ সিভিলাইজেশন আছে তাহলে বাঙালি সিভিলাইজেশন আকারে বিশ্বের কোন জায়গায় আছে। একটা হচ্ছে স্টেট আকারে। আপনার সিভিলাইজেশন যদি টিকে থাকে তাহলে স্টেট টিকে থাকবে আর যদি সিভিলাইজেশন না থাকে স্টেট থাকবে না। আমার মনে হয়েছে যে সিভিলাইজেশন ওয়েতে সিভিলাইজেশনকে ট্রান্সফরমেশন নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিত। এটা হলো আমার পলিটিক্যাল থিংকিং এবং আমি সবসময় সেন্টারে থাকি। আমাদের সমাজে ডান থাকুক, বাম থাকুক সেটা বিষয় না, রাজনীতি কে করে সেটা বিষয় না। বিষয় হলো আমরা সবাই বাংলাদেশের কজে ঐক্যবদ্ধ কি না এবং এই যে মানুষগুলো রয়েছে আমাদের কমিউনিটিতে আমি তাদের জন্য লায়াবল কি না, আমি তাদের কাছে রেস্পন্সিবল। সেই জায়গায় আমি আমার হার্ট থেকে আমার সোল দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি।

দেশ রূপান্তর : আমাদের রাজনীতিতে তো উৎপাদন, অর্থনৈতিক রিলেশন ক্লিয়ার না। আপনাদের কমিটিতেও শ্রমিকরা নেই এখনো, আপনারা বলছেন যে যোগ করবেন।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আমরা অলরেডি কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা টু দ্য ফ্যাক্ট শ্রমিক লিডারদের খুঁজছি। আর এটা এখনো না হওয়ার পেছনে আমাদের ব্যর্থতা না এটা একটা জাতীয় ব্যর্থতা। আমাদের ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমিকদের ওই মেলবন্ধনটা এখনো হয়নি। 

দেশ রূপান্তর : অসংখ্য ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত