আর্থিক আইনশৃঙ্খলা

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫৯ এএম

বিগত সরকারের উন্নয়ন নীতি, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীনতা দেশের অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। বিদেশি মুদ্রায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য রপ্তানি করে অর্থ দেশে না আনা, আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কমবেশি দেখিয়ে অর্থ পাচার ও ঋণ করে অলাভজনক উন্নয়নের খেসারত হিসেবে এক সময়ের রেকর্ড বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ঝুঁকিতে পড়েছে। খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উপরন্তু হাসিনা সরকারের বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটা বড় অংশই ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত। এগুলোর জন্য অবিবেচনাপ্রসূত সুদে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল বিগত সরকার। এগুলোর সুদসহ সরকারের ঋণ পরিশোধের অক্ষমতা বর্তমানে অর্থনীতির ওপর চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।  

তবে এই অবস্থার মধ্যেও আশার আলো হয়ে এসেছে বিদেশি ঋণ। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পর্ক ও সুনামের কারণে ইতিমধ্যেই ১২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বিদেশি সংস্থাগুলো থেকে। বিপুল এই ঋণ বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সংকট কাটাতে যেমন সহায়তা করবে, তেমনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারে কমিশন গঠন করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আর্থিক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন প্রকল্প বন্ধ রেখে সরকারের ব্যয় কমিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পথ গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এখনো বেশ নাজুক। একে ঠিকঠাক না করলে অর্থনীতিকে ঠিক করা যাবে না। অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঋণ সংকটের কারণে আগের সরকারই অনেক উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত রেখেছিল। নতুন সরকার তাতে আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

তবে এই ঋণ ঠিকঠাকমতো কাজে লাগাতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং এর চেয়েও বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সততা ও শৃঙ্খলা। আমরা বিগত আমলে দেখেছি যে, দুর্নীতি ও শৃঙ্খলার অভাব ছিল অর্থনীতির বিপর্যয়ের মূল কারণ। বাংলাদেশ গত দুবছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভার কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে। জ¦ালানি সংকটে কমে গেছে শিল্পোৎপাদন, লুটপাটে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, রপ্তানির চিত্রে উদ্বেগজনক বড় পরিবর্তন, বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ে স্থবিরতাসহ বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি যে টালমাটাল অবস্থায় ছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বাজেট সহায়তার জন্য আসা বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা খুব ভালো যে আমরা বিদেশি প্রতিশ্রুতি পাচ্ছি। এটি এলে আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট পজিশন ভালো হবে। রিজার্ভের ওপরও এটার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থনীতি অনেক দিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগও কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, সেটাও উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টর একটি বড় সংকটের মধ্যে আছে, এ রকম সংকট যদি ব্যাংক খাতে থাকে তাহলে প্রকৃত উদ্যোক্তা যারা, তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে সমস্যা হবে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটা কমিশন করা হয়েছে। আশা করব তারা যে পরামর্শগুলো দেবে অন্তর্বর্তী সরকার সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করবে।

ইউনূস সরকারের সামনে অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষা করছে। একদিকে দেশের মানুষের বড় চাওয়া মূল্যস্ফীতি কমানো, অন্যদিকে মুদ্রা সংকোচন নীতি প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দেবে। ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার হয়তো এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে, তবে শৃঙ্খলার অভাবে এই ঋণ আরও বড় গলার ফাঁস হয়ে যেতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত