দেশে ধান, গম, ভুট্টা ও আলুর কী পরিমাণ উৎপাদন হয়, তার কিছু হিসাব দেয় সরকারি সংস্থাগুলো। কিন্তু গৃহপালিত পশু-পাখিদের পেছনে এসব উৎপাদিত ফসলের কী পরিমাণ ব্যয় হয়, তারা কী পরিমাণ ভোগ করে, তার কোনো হিসাব নেই। তাই প্রাণী ও মাছের খাবারে কী পরিমাণের শস্য ব্যয় হয়, তা নিয়ে জরিপ করবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের মধ্যে নন-হিউম্যান কনজাম্পশন বা প্রাণী ও মৎস্য খাবার হিসেবে ব্যবহৃত তথ্য সংগ্রহের জন্য এ জরিপ করা হবে। জরিপে ফসলের ক্ষতি ও খাদ্যের অপচয়ের তথ্যও উঠে আসবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার উৎপাদন বেড়ে ৫৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার হয়েছে, হাঁস ও মুরগির উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৩৯৬ কোটিতে। এসব প্রাণিসম্পদ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির যে অংশ তার ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রাণিসম্পদের মোট বাজারমূল্য ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
খামারিরা জানিয়েছেন, পশু পালনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যের উচ্চমূল্য। গোখাদ্য উপকরণের একটি বড় অংশই আমদানিনির্ভর। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গম ও সয়াবিনÑ দুটিই আমদানি করতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম গত বছর বাড়তি থাকলেও এখন তা অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও আমদানিকারকদের উচ্চ মুনাফা প্রবৃত্তির কারণে দেশে গোখাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে।
এই জরিপ হওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. আনোয়ার পারভেজ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এরকম জরিপে যদি আমাদের ফসলের অপচয় চিহ্নিত করা যায়, রোধ করা যায় সেগুলো হলে ভালো হবে। যদিও বাংলাদেশে অপচয় তেমন না, তারপরও প্রায়োরিটি হিসাব করা যেতে পারে। আমাদের আমদানি করলে বেশি লাভজনক নাকি আমরা দেশীয় উৎপাদনকে পশুখাদ্য হিসেবে দিয়ে দিই, সে ক্ষেত্রে মানুষের খাদ্য আমরা বিকল্প উৎস থেকে আনতে পারি। তাহলে আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করে ভাত কম খেয়ে সেটি প্রাণীকে খাওয়ালাম। ওইরকম সোর্সে আমরা বেশি যেতে পারি।’
কৃষিতে উৎপাদিত শস্যের অপচয় এড়িয়ে দেশের প্রাণী খাদ্যের জোগান পুরোটা দেওয়া সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘আমাদের দেশে ওই অর্থে কৃষি খাতে অপচয় হয় না। ভুট্টার ক্ষেত্রে সেই অর্থে ওই রকম অপচয় নেই। ধানের খড় পশুখাদ্য হয় নতুবা জ¦ালানি হিসেবেও ব্যবহার হয়। অনেক কৃষক মাঠেও তা রেখে আসে মাটিতে সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ধানের তুষ বা কুড়াও গোখাদ্য কিংবা ফিশ মিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো এখন খুবই দামি জিনিস। খড়ও এখন ৮ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে গোখাদ্য হিসেবে শুধু ঘাসই খাওয়ানো হতো। ফলে গরুর গ্রোথ কম হতো, উৎপাদনও কম হতো। এখন খামারিরা গরু-হাঁস-মুরগিকে প্রসেস ফুড খাওয়ায়।’
কৃষি উৎপাদন পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন পর্যাপ্ত নয়। বাইরে থেকে আনা গরুর খাবারের সয়াবিন, ভুট্টা, ধান, গমÑ এগুলো সব যদি আমাদের উৎস থেকে দিই, তাহলে মানুষের খাবারে ঘাটতি হবে। আমাদের উৎপাদন ওই পর্যায়ে যায়নি।’
বিবিএস বলছে, বর্তমানের ক্ষুধা ও পুষ্টি নিবারণ ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের ব্যবহার বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণী খাদ্য হিসেবে ধান, চাল, গম ও ভুট্টা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো খাদ্যশস্যের নন-হিউম্যান কনজাম্পশন বা মানুষ ছাড়া অন্য ভোক্তার ব্যবহার নিয়ে কোনো জরিপ হয়নি। এ ছাড়া খাদ্য অপচয়, বর্জ্য, পরিবহন ও বিপণন ক্ষতি ও প্রক্রিয়াকরণসংক্রান্ত অপচয়ের তথ্য নেই। জাতীয় হিসেবে এগুলোর তথ্য থাকা আবশ্যক।
প্রকল্প প্রস্তাবে বিবিএস জানিয়েছে, এ প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নন-হিউম্যান কনজাম্পশনবিষয়ক ডেটাবেজ, ফুড লসের ডেটাবেজ, ফিড উৎপাদনকারীর ডেটাবেজ, খানা বা প্রতিষ্ঠানে বীজ হিসেবে ধান, গম, ভুট্টা ও আলু ফসলের সংরক্ষণ জরিপসহ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ।
গোখাদ্যের প্রধান উপকরণ গম, ভুট্টা, সয়াবিন, সরিষা, ভুসি। ভুসি ছাড়া অন্য সব উপকরণই আমদানিনির্ভর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গোখাদ্যের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করে দেশের প্রায় ৩০০ কোম্পানি। তবে এর মধ্যে ১০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সিংহভাগ আমদানিতে জড়িত। এদের মধ্যে ফ্রেশ, তীর, আবুল খায়ের, আকিজ, ইফাদ, যমুনা, স্কয়ারসহ ১০ কোম্পানির হাতে গোখাদ্য উপকরণের বাজার ৫০ শতাংশের বেশি। মূল্য নির্ধারণে এসব কোম্পানিই মুখ্য ভূমিকা রাখে। গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করছেন খামারিরা।
কোম্পানিগুলো যে বেপরোয়াভাবে খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে, তার এক বড় উদাহরণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) পরিসংখ্যান থেকে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ফিডে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের দাম গড়ে ৭৫ থেকে ১৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
খামারিরা জানিয়েছেন, করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা গোখাদ্য চলতি অর্থবছর ২৫-৩৫ শতাংশ বেশি দামে কিনতে হয়েছে। ফলে পশু পালন ব্যয় বেড়েছে।
খামারি ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৪ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশে গবাদি পশু পাচারের বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু করার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুগ্ধ ও গবাদি পশু মোটাতাজাকরণে বিনিয়োগ বেড়েছে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারত থেকে গবাদি পশুর সরবরাহ কমে যায়, যা আগে বাংলাদেশের জন্য বছরে ২০ লাখ গবাদি পশুর উৎস ছিল।
