চকচকে চেন্নাই থেকে কড়াকড়ির কানপুর

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:১৪ পিএম

আকাশ থেকে চেন্নাই শহরটা দেখতে যতটা আলো ঝলমলে, বাস্তবেও অনেকটা সেরকমই। রাস্তায় লেটেস্ট মডেলের চকচকে গাড়ি আর স্কুটার, আছে এসি মেট্রোরেল। তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের আতিথেয়তা আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চমৎকার প্রেসবক্স, সব মিলিয়ে চমৎকার অভিজ্ঞতা। আকাশ থেকে দেখে কানপুর শহরটাকে দেখে মনে হয় রুক্ষ, ধূসর। হবারই কথা, শিল্প শহর সেই সঙ্গে প্রকৃতিও রুক্ষ। তবে রাজনৈতিক রঙ গেরুয়া। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে হিন্দু মহাসভা কর্মসূচি পালন করেছে। তাই টেস্ট ম্যাচকে ঘিরে নিরাপত্তার কড়াকড়ি।

৪ বছর পর টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে কানপুরে। বিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজীব শুক্লা কানপুরের মানুষ। স্থানীয় সাংবাদিকদের কথায় যা জানা গেল, তার উৎসাহেই এখানে ফিরেছে টেস্ট ম্যাচ। সর্বশেষ ২০২১ সালের নভেম্বরে ভারত এখানে টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র হয়েছিল ম্যাচটি। সর্বশেষ ওয়ানডে  ও টি-টোয়েন্টি আরো আগে, ২০১৭ সালে। পাশের শহর লখনৌয়ের নিজস্ব আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে, সর্বশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বেশ কিছু ম্যাচও হয়েছে সেখানে।

উত্তর প্রদেশের বড় ক্রিকেট সেন্টার বলতে লখনৌই খেলোয়াড়, সাংবাদিক, সম্প্রচারক সবার কাছে পছন্দের তালিকায়। কেন- সেটা গ্রিন পার্কে পা রাখতেই টের পাওয়া গেল। এই স্টেডিয়ামে প্রথাগত কাঁচঘেরা কোনো প্রেসবক্স বলে কিছু নেই। গ্যালারির একটা অংশে পুরোনো দিনের সরকারী অফিসের মত চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা। টেবিলগুলোয় খুব সম্ভবত টাইপরাইটার ব্যবহার করা হতো। কারণ, বিদ্যুত সংযোগের কোনো বন্দোবস্ত নেই। কোনো বৈদ্যুতিক পাখাও নেই, টিভির স্ট্যান্ডের ওপর ধুলোর পরিমাণ দেখে আঁচ করে নেওয়া যায়, ২০২১ সালের পর এখানে কোনো টিভি রাখাই হয়নি! ওয়াইফাই নয়, এই স্টেডিয়াম খুব সম্ভবত টেলিগ্রামের আমলে পড়ে আছে।

হিন্দু মহাসভার হুমকির পর চাপা একটা উত্তেজনা বিরাজ করছে ম্যাচ আয়োজন ঘিরে। যদিও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন, ম্যাচকে ঘিরে কোনো শংকা নেই। শহরের উচ্চপদস্ত পুলিশ কর্মকর্তা ডিসিপি রাজেশ শ্রীবাস্তব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, 'এখানে তিন ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। ম্যাচকে ঘিরে ১ হাজার পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন দায়িত্বে মোতায়েন করা হয়েছে। কাজ করছে ১০০ ক্যামেরা'। অবশ্য বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকা দলকে যে নিরাপত্তা দেয়া হবে, তার যে মহড়া হয়ে গেল শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে তার তুলনায় এই সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নস্যি!

বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স, হেলিকপ্টার কত কিছুর ব্যবহার দেখানো হয়েছে, এখানে স্রেফ স্থানীয় পুলিশ বাহিনীই কাজ করছে। দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে দিল্লীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই কর্মকর্তা জানান, কানপুর এবং গোয়ালিওরে নির্বিঘ্নে ম্যাচ আয়োজনে দুই দেশের সর্বোচ্চ মহল থেকেই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আছে। 

সংবাদ সম্মেলনে আসা বাংলাদেশের প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে। হাথুরুসিংহে জানিয়েছেন, 'আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। বিসিসিআই দায়িত্ব নিয়েছে, আর আমি নিশ্চিত তারা সফলভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করবে'। হাথুরুসিংহের বাবা ছিলেন সেনা কর্মকর্তা, মা ছিলেন সেনা হাসপাতালের নার্স। তার বেড়ে ওঠা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময়। এলটিটিই'র ভয়ে শ্রীলঙ্কায় তখন কারফিউ লেগেই থাকত। সেই সময়ে বেড়ে ওঠা হাথুরুসিংহে নিশ্চয়ই একটা রাজনৈতিক দলের ময়দানী হুমকিতে ভয় পেয়ে যাবেন না!

তৃতীয় টেস্টের পর সংবাদ সম্মেলনে অশ্বিন বলেছিলেন, 'ভারতে ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো নির্দিষ্ট টেস্ট ভেন্যু নেই। বক্সিং ডে টেস্ট মানেই মেলবোর্নে এরকমটা নয়। এখানে রোটেশন পলিসিতে টেস্ট ম্যাচ বন্টন করা  হয় (রাজ্য অ্যাসোসিয়েশন গুলোর মধ্যে)'। এর পেছনে আছে ভোটের রাজনীতি। আর এত কম সুযোগ-সুবিধায় বাংলাদেশ বাদে অন্য কোনো দলকে কানপুরে টেস্ট খেলতে রাজি করানো বিসিসিআইয়েরর পক্ষে হয়তো সম্ভবও নয়। কারণ, এই সুযোগ সুবিধা এবং অবকাঠামোতে অন্য কোনো দেশ খেলতে রাজি হবে কিনা সন্দেহ। নিউজিল্যান্ড আসছে বাংলাদেশের পরপরই, তারা খেলবে বেঙ্গালুরু, পুনে আর মুম্বাইতে।

বিসিসিআইয়ের নিজস্ব নীতি এবং রাজীব শুক্লার ভোটের রাজনীতি ভারত-বাংলাদেশকে মুখোমুখি করেছে কানপুরে। এতে একটা সুবিধা হয়েছে, দুই দলের কেউই এই মাঠে খেলতে অভ্যস্ত নয়! চেনা মাঠের যে সুবিধাটা চেন্নাইতে পেয়েছে ভারতীয় দল, কানপুরে সেটা অনেকাংশেই থাকছে না। এখানে  সর্বশেষ দুটো ম্যাচ হয়েছে ২০২১ ও ২০১৬ সালে। সেই দুই টেস্টের দলে থাকা অনেকেই যে বর্তমান দলে নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত