শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ। দেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের অবসান ঘটেছে। গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু, ১৫ বছরের দুঃশাসন ও গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে প্রশাসন, পুলিশ থেকে শুরু করে সর্বত্র এক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এসব সার্বিক বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : একই দিনে সেনাপ্রধান ও প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন বিষয়ে কথা বলার পর রাজনৈতিক মহলে একটা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের এই মন্তব্যকে কীভাবে দেখছেন এবং প্রতিক্রিয়া কী?
তোফায়েল আহমেদ : আমি এটা নেতিবাচকভাবে দেখছি না। সেনাপ্রধান কোনো বাইন্ডিংস দেননি, উনি একটা সাজেশন দিয়েছেন। আঠার মাস বা দেড় বছরের মধ্যে সংস্কারের কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়া ভালো। তারপরে নির্বাচনের প্রশ্ন আসবে। তিনি খুব একটা অযৌক্তিক কথা বলেননি এবং এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কথাতেও দ্বিমত পাইনি।
দেশ রূপান্তর : এখানে তো একটা ডেটলাইনের বিষয় চলে আসল
তোফায়েল আহমেদ: হ্যাঁ, এ রকম একটা ডেটলাইন মানতে পারুক বা না পারুক এটা থাকা ভালো। এটা মানা যদি না যায় তাহলে সবাই দেখবে, সময় বাড়বে তখন কোনো অসুবিধা নেই। তবে একটা টাইমলাইন থাকলে সুবিধা হচ্ছে তারা কাজটার একটা লক্ষ্য ঠিক রাখতে পারবেন যে কোন সময়ে কোন কাজ শেষ করবেন এবং এটার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ণয় করতে পারবেন। সেদিক থেকে আমার মনে এটার একটা মূল্য আছে। আলাপ-আলোচনা হতে পারে, উনার সঙ্গে (প্রধান উপদেষ্টা) রেগুলার তিনি বসছেন, তারা আলাপ করবেন বা উপদেষ্টা পরিষদেও আলাপ হবে।
বিএনপি বলেছে এটা একটা যৌক্তিক সময়, জামায়াত থেকে সময় বেঁধে দেয়নি, অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়া এবং বক্তব্যের মধ্যেও এই সিগন্যালই আছে। সুতরাং এখানে একটা কথা আসছে, আশা করি তারা ইতিবাচকভাবে নিয়ে আলোচনা করে ঠিক করবেন। আবার কেন এ রকম একটা সময়সীমা থাকা প্রয়োজন? সময়সীমা সবসময় মানা যায় না, এটা বাড়তে পারে, কমতেও পারে বাস্তব প্রয়োজনে। কিন্তু যেটা হবে, এটা সরকারকে সাহায্য করবে তার অগ্রাধিকার নির্ণয় করতে, কাজের একটা সময়সীমা নির্ধারণ করতে, রোডম্যাপটা তৈরি করতে সাহায্য করবে। তো আমার যেটা ধারণা সংস্কারটা তারা শুরু করেছেন।
দেশ রূপান্তর : সংবিধান সংস্কার তো জটিল, নির্বাচন করতে কি কেবল নির্বাচনী আইন সংস্কার করে কমিশন গঠন করলেই সম্ভব হবে না?
তোফায়েল আহমেদ : যদি নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার করতে হয়, অনেকগুলো বিষয় আছে সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংবিধানের ৬৫, ৬৬ তারপর ১৮ থেকে ১২২ এই ধারাগুলোর মধ্যে পরিবর্তন আসবে কিছুটা। এগুলো করলে তো পরিবর্তন আসবে, তারপর না নির্বাচন কমিশন কাজ করতে পারবে। ঠিক একইভাবে প্রশাসনের ক্ষেত্রেও। একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত। কারণ মাদার সংস্কার হচ্ছে সংবিধান, তারপর প্রশাসন, তারপর ইলেকশন কমিশন। পুলিশের জন্য আলাদা সংস্কারের কোনো প্রয়োজন ছিল না, এটা প্রশাসনের মধ্যে ডিল করা যেত।
দেশ রূপান্তর : পুলিশের বিষয়টা আরেকটু ক্লিয়ার করেন, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন তো বড় হয়ে উঠেছে।
তোফায়েল আহমেদ : পুলিশের সংস্কারের ধরন, আইনগত সংস্কারের প্রশ্নে বড় না। পুলিশের সংস্কার হচ্ছে ইমিডিয়েটলি পুলিশ গ্রো করা। আমার সাজেশন ১ থেকে দেড় হাজার এসআই রিক্রুট করেন। ভালো, স্বচ্ছভাবে পরীক্ষার ভিত্তিতে, প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নিয়ে তাদের আপনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ট্রেইনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। সারদায় তো এত মানুষের ট্রেনিং সম্ভব হবে না। কিছু বিএমএতে দেন, কিছু ঢাকায় রাখেন, সিলেটে দেন। ফিজিক্যাল ট্রেইনিংটা এই সময়ের মধ্যে করেন এবং হাতে দেড় মাস সময় রাখেন। দেড় মাসের মধ্যে পুরনো পুলিশদের যাদের পাবেন, তাদের দিয়ে নতুনদের আইনকানুন এবং পুলিশিং শেখাবেন। ৪ মাসের মধ্যে আপনি থানায় নতুন এসআই প্লেস করতে পারবেন, তারা আস্তে আস্তে সব ঠিক করবে। তাদের গাইডেন্স দেন অন জব, তারা শিখে যাবে। সুতরাং এগুলো ইম্পর্টেন্ট এবং কনস্টেবল রিক্রুট করেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার। যারা আসেনি তাদের বাদ দিয়ে দেন, তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার যারা আসছে তারা নানা রকম ঝামেলা করছে, তাদের বহু রকমের প্রবলেম আছে, এলেই তো হবে না। সুতরাং এগুলোর মধ্যে চেঞ্জের প্রয়োজন। এসব সংস্কারে কমিশন করতে হবে না, এটা তাদের কাজ না। কমিশন কয়েকটা ছোট কাজ করবে যে, সিআরপিসি কী হবে, পুলিশ রেজ্যুলেশনটা কী হবে বা থানাতে কী পরিমাণ পুলিশ রাখবে এগুলো। সুতরাং আমার মনে হয় না পুলিশের সংস্কার এভাবে করার দরকার ছিল, এটা প্রশাসনের মধ্যে রাখলেই হতো।
দেশ রূপান্তর : আপনি জানেন ডিসি নিয়োগ নিয়ে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ঘুষ লেনদেনেরও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : এগুলো হচ্ছে বিশৃঙ্খলা, এগুলোর সুযোগে বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে নিচ্ছে, তারা নানান সুযোগ-সুবিধা চাচ্ছে এবং তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা এসবকে উৎসাহ দেবে। এদের আইডেন্টিফাই করা উচিত, যে এগুলো কারা করছে। যারা এ কাজ করছে তাদের কোনোদিনই আর ডিসির অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার উপযুক্ততা নেই। তাদের ডেপুটি কমিশনার হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই আর ফিনিশ।
দেশ রূপান্তর : অনেক সচিব বলছেন তারা ১৫ বছর অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়েছেন...
তোফায়েল আহমেদ : বঞ্চিত হয়েছেন বলেই আপনি মারামারি করবেন? কেন এটা হচ্ছে সেটা তো তাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আপনাকে ডিসি করতে হবে বলেই কি আপনাকে আজই নিয়োগ দিতে হবে? তা তো না। আপনার চাকরি আছে, করবেন, আপনাকে সুবিধামতো প্রমোশন দেবে। আজই আপনাকে পদোন্নতি দিতে হবে? হোয়াট ইজ দিস? এটা প্রশাসনের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ। এটা অত্যন্ত কঠোরভাবে ডিল করতে হবে। প্রশাসনিক আইনে যেটা আছে সেটা অনুযায়ী ডিল করতে হবে, এখানে কোনো খাতির নেই।
দেশ রূপান্তর : কঠোর অবস্থান নিতে সরকারের কি কোনো সক্ষমতার ঘাটতি দেখতে পান?
তোফায়েল আহমেদ : কোনো ঘাটতি নেই। যিনি সংশ্লিষ্ট অ্যাডভাইজর এবং প্রধান অ্যাডভাইজর তাদের সাহসের প্রয়োজন। আমার দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো; আপনার যা আছে আপনি তাই দিয়ে করবেন। যারা সমস্যা করছে তাদের দরকার নেই, নতুন করে সাজান। কোথা থেকে নতুন লোক আসবে সেটা ঠিক করেন, আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না কেন? কারণ, যাদের খুঁজতে দিয়েছেন তারা তো খুঁজে না, তারা নিজেদের লোক খুঁজে। এত বড় দেশে লোক পাওয়া যাবে না, রিটায়ার্ডের মধ্যে লোক পাওয়া যাবে না, এটা তো আমি বিশ্বাস করি না।
দেশ রূপান্তর : জনপ্রশাসনের সংস্কারে কী কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করেন?
তোফায়েল আহমেদ : জনপ্রশাসনের মধ্যেই আরও অনেক ইস্যু আছে। জনপ্রশাসন সংস্কারে কমিশনকে কী কী কাজ করতে দিয়েছে সেটা আমি জানি না। জনপ্রশাসন সংস্কারের কাজ অতীতে আরও হয়েছে, কিন্তু তাদের কাজ কোনো কাজে লাগেনি বা লাগানো হয়নি। এখন এই সরকার যে কমিশন করেছে, আশা করি তাদের কাজ কাজে লাগবে। আমি মনে করি স্মল, স্মার্ট অ্যান্ড ইফেক্টিভ গভর্নমেন্ট কীভাবে করা যায় সেটাই তাদের কাজের মূল হবে। মানে যাকে যে দায়িত্ব দেব সেটা করতে তাদের ক্যাপাবল হতে হবে, দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে, তোমাকে এই ডেলিভারি দিতে হবে। ফাইলটা এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে সেখানে এভাবে ১০ জায়গায় ট্রাভেল করবে তারপর সিদ্ধান্ত হবে এটাই চলবে নাকি? আপনি একটা মেইল করেন কোনো একটা সচিব বা উপসচিবকে, আপনি সেটার রিপ্লাই পাবেন না। কেন? কীসের ডিজিটাল দেশ তাহলে? মেইল বাদ দেন, আপনাকে যখন কেউ চিঠি পাঠাল, কুয়েরি করল আপনি চিঠিটা পেয়েছেন অন্তত সে কথা তো বলবেন! নেভার, দে নেভার রিপ্লাই। তাহলে এটা কি সত্যি সত্যি ডিজিটাল বাংলাদেশ হলো? ওয়েবসাইটগুলো আপডেট নেই, টেলিফোন আছে কিন্তু জবাব নেই।
দেশ রূপান্তর : আমাদের আমলাতন্ত্রের সমস্যাগুলো আজকের না...
তোফায়েল আহমেদ : আমাদের সরকারব্যবস্থা, প্রশাসন; মানুষে বলে আমলা। কিন্তু আমলা শব্দটা সঠিক না, আমলা বা আমলাতন্ত্র শব্দটা একটা গালি। আমলা শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেছেন ম্যাক্সওয়েবার। ব্যুরোক্রেসি শব্দটা তিনি এক অর্থে ব্যবহার করেছেন আর আমরা করি অন্য অর্থে, যেটা ঠিক না। ব্যুরোক্রেসি যেভাবে ব্যবহার হয় আমলাতন্ত্র সেভাবে ব্যবহার হয় না। আমলাতন্ত্র মানে হচ্ছে আমলার শাসন, আমরা আমলার শাসনে থাকতে চাই না। আমলাতন্ত্র না আমলা হচ্ছে কাজের লোক। সরকারি কর্মচারীদের রিক্রুটমেন্ট আছে, তাদের কিছু রাইটস আছে। এখন আপনি তাদের রাইটসও ভঙ্গ করছেন আবার যে কাজ তাদের না তাদের দিয়ে সে কাজ করাচ্ছেন। আবার তারাও কিছু অন্যায় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন, এটাই নিয়ম হয়ে গেছে। সরকারের কর্মচারীরা হয়েছে এখন সেল্ফ সার্ভিসিং। তারা তাদের নিজেদের সার্ভিস দিচ্ছে এখন।
দেশ রূপান্তর : সেল্ফ সার্ভিস ব্যাপারটি কী রকম?
তোফায়েল আহমেদ : কমিশন করেন, কমিটি করেন তাদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। বেতনভাতা কত হবে সেটার কমিশন করেন। তারা মনে করেন এসব বিরাট কাজ। তাদের প্রমোশন দিতে হবে অযৌক্তিকভাবে, যত পদ নেই তার চেয়ে বেশি প্রমোশন দিয়ে দিচ্ছেন। ডেপুটি সেক্রেটারির পদ কত আর আপনি দিয়েছেন কত? জয়েন্ট সেক্রেটারির পদ আর কত প্রমোশন দিয়েছেন? ডেপুটি, এডিশনালের পদ কত আর প্রমোশন হয়েছে কত? সচিবের পদে সন্তুষ্ট না আবার, সিনিয়র সচিব করেছেন। এগুলো কোনো সংস্কার না। এগুলো হচ্ছে সেল্ফ সার্ভিসিং, তারা জনগণকে নয় নিজেকে সার্ভিস দিচ্ছেন। গাড়ি লাগবে তাদের, গাড়ির জন্য টাকা দিতে হবে, মেইনটেইনের জন্য টাকা দিতে হবে। টেলিফোন দিতে হবে আবার মোবাইল ফোনও দিতে হবে। গাড়ি দেওয়ার পরও তো সরকারি গাড়ির ব্যবহার কমেনি। এসি কোথায় লাগাবেন সেটার নিয়ম আছে কিন্তু আপনি যত্রতত্র এসি লাগিয়েছেন। বিদেশ যাত্রা আবার তাদের একটা আকর্ষণ। একজন সহকারী সচিব থেকে জয়েন্ট সেক্রেটারি হওয়া পর্যন্ত কয়বার গেছেন বিদেশ, কী জন্য গেছেন, কী কাজটা শিখেছেন, কী কাজ করেছেন, সেটার কি কোনো মূল্যায়ন হয়েছে?
দেশ রূপান্তর : বিগত সরকার যেভাবে প্রশাসন চালিয়েছে, সে সবই কি সমস্যার মূল, নাকি সমস্যা আরও গভীরে?
তোফায়েল আহমেদ : গত সরকার কি সচিবদের মেইলের উত্তর দিতে মানা করেছে? তাহলে আপনি মেইলের উত্তর দিলেন না কেন? কেউ মেইল করলে উত্তর দেন না কেন? এগুলো হচ্ছে সংস্কৃতির অঙ্গ, তারা দেবে না এগুলো, করবে না এগুলো। আমি বলতে চাচ্ছি যে, সংস্কার যেহেতু হচ্ছে সেখানে প্রথম মোটো হবে স্মল গভর্নমেন্ট। গভর্নমেন্টটা খুব বড় গেছে, এত বড় হয়ে গেছে যে এই গভর্নমেন্টটা আর চলাফেরা করতে পারে না। তার নিজের সমস্যা নিয়েই সে ব্যস্ত। তার গাড়ির সমস্যা, বাড়ির সমস্যা, তার বাচ্চাদের লেখাপড়ার সমস্যা, তার আসা-যাওয়ার সমস্যা এটাই হয়ে গিয়েছে প্রশাসনের সমস্যা। কিন্তু প্রশাসন করবেটা কী সেটার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সে জন্য মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়িয়েছেন, বিভাগের সংখ্যা বাড়িয়েছেন, তাদের অধীনে আবার অধস্তন অধিদপ্তরের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। এতগুলো বাড়িয়ে এখন আর ম্যানেজমেন্ট করা যাচ্ছে না। তাহলে আমাদের সরকারকে আকারে ছোট করতে হবে। প্রয়োজনের সঙ্গে আকারের সম্পর্ক থাকতে হবে। লোকজনকে চাকরি দেওয়ার জন্য আকার সৃষ্টি করেছে। বাজেটের বড় অংশ খরচ হচ্ছে রেভিনিউ সেক্টরে প্রশাসনের বেতন ভাতা, পরিচালন ব্যয়। আমার এত টাকা পরিচালন ব্যয় কেন যাচ্ছে? ধরেন জুডিশিয়ারি, এখানে সর্বসাকল্যে দুই হাজার জন। কিন্তু, ৪২ লাখ মামলা পেন্ডিং, সেগুলো কত বছরে সমাধান হবে? তো জুডিশিয়ারির আকার তো বিরাটভাবে বাড়াতে হবে, ৩ গুণ করতে হবে। তাদের নিজস্ব সচিবালয় দিতে হবে, নিজস্ব আলাদা বাজেট দিতে হবে। তারপরে উপজেলা পর্যায়ে নিম্ন আদালত যেতে হবে। তখন দেখবেন দেশের অর্ধেক মামলা সুরাহা হয়ে গেছে।
দেশ রূপান্তর : এটা কি এই সরকার করতে পারবে নাকি নির্বাচিত সরকার করবে?
তোফায়েল আহমেদ : তারা পারবে না কেন? সরকার ইচ্ছে করলে, প্রধান বিচারপতি এটা করতে পারেন। এটা তো একদিনে হবে না। সময় নেবেন, পর্যায়ক্রমে হবে। এই বছর ১০টা উপজেলায় করলেন। আইন মন্ত্রণালয়ের বিল্ডিং ছিল, যখন এরশাদ আমলে উপজেলায় কোর্ট গেল তখন তো বিল্ডিং করা হয়েছিল সেই বিল্ডিংগুলো কোথায়? সমস্ত প্রশাসন উপজেলায় গেছে। শুধু বিচার বিভাগ যায় না। কেন যায় না? আর বেশি না হোক অন্তত ৪টা এলাকাতে ৪টা সার্কিট কোর্ট, হাইকোর্টের বেঞ্চ যেতে হবে। সবাইকে ঢাকা আসতে হবে কেন? উপজেলায় এতগুলো মানুষকে বিচার বহির্ভূত রাখা যাবে না। সব বিচারককে ঢাকায় বসে থাকলে হবে না। সব উকিল ঢাকা এবং জেলা শহরে বসে থাকবে সেটা হবে না। তাদের মুভ করতে হবে, জনগণের কাছে যেতে হবে। এখানে কীভাবে নেবেন সেটা আপনারা ঠিক করেন। সরকারের মধ্যে দেখেন, প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সবার ওপরের মন্ত্রী, সবার দেখাশোনা উনার দায়িত্ব। কালেক্টিভ রেসপন্সিবিলিটিতে উনার ওপর সবার দায়িত্ব বর্তায়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে কয়টা মন্ত্রণালয়, কয়টা ডিভিশন? উনি কেন এগুলো রাখবেন? উনার কাছে কেবিনেট ডিভিশন আছে, থাকুক। আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন আছে সেটা প্রতিরক্ষায় যেতে পারে। তারপরে আছে প্রায় ১৫টা অফিস, ৩টা প্রজেক্ট। ১৫টা অফিসের মধ্যে অনেকগুলো অফিস আছে এগুলো ওভার ল্যাপিং, এগুলো একটা হলেই চলে। যেমন ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল সেটা থাকল আবার ন্যাশনাল ইকোনমিক জোন অথরিটি, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি, বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি এগুলো তো একটা হলেই হয়, এতগুলো অর্গানাইজেশন কেন থাকবে? এভাবে গভর্নমেন্টকে বৃহৎ একটা আকার দেওয়া হয়েছে এবং সেই গভর্নমেন্ট এখন এগুলোর ভারে চলতে পারে না। স্মল গভর্নমেন্ট, স্মার্ট গভর্নমেন্ট দরকার। এ বিষয়গুলো কমিশন দেখবে কি না জানি না, এগুলো না দেখলে এই কমিশনের কোনো কাজ হবে না। গভর্নমেন্টের সাইজটা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসতে হবে।
দেশ রূপান্তর : গভর্নমেন্টের সাইজ কমালে তো চাকরি যাবে অনেকের।
তোফায়েল আহমেদ : চাকরি যাবে না, কারণ লোক কম আছে কোথায় দেখতে হবে। লোক কম আছে শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, ট্যাক্সেশনে, পুলিশে এ রকম বহু জায়গায় লোক কম আছে। এগুলো রি-সাফল করতে হবে। বহু জায়গায় লোক কম আছে যেখানে জনসেবা সম্পৃক্ত, সে জায়গাগুলোয় লোক দিতে হবে। সেজন্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কমাতে হবে। বাজেট যা হয় দেশে তার টু-থার্ড খেয়ে ফেলে ঢাকাভিত্তিক প্রশাসন।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি মনে করেন এই সরকারের সংস্কারগুলো পরবর্তী সময়ে পার্টিগুলো মানবে? অভিজ্ঞতা কী বলে?
তোফায়েল আহমেদ : মানবে না কেন? আগের অভিজ্ঞতা এখন খাটবে না। আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো এ রকম সরকার না। তারা বলেছে যে সংস্কারের বিষয়গুলো আসবে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আলোচনা করে একটা ব্রিজ বিল্ডিং হবে, ব্রিজ বিল্ডিং হওয়ার পরে কিছু করবে এই সরকার, আবার কিছু পরের সরকার। এটার ধারাবাহিকতা থাকবে। না হলে জনগণ তো আছে।
দেশ রূপান্তর : বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সিপিডি বলছে আমাদের প্রবৃদ্ধি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে আগামীতে...
তোফায়েল আহমেদ : মূল্যস্ফীতি কি একদিনে কমে? মুদ্রাস্ফীতি তো একদিনের ব্যাপার না। মুদ্রাস্ফীতি কি দেড়মাসে কমে যাবে? এটা তো একটা সিস্টেমের ব্যাপার। এখন ফরেন রিজার্ভ বাড়বে, ফরেন কারেন্সি বাড়বে, ব্যাংক ব্যালেন্স ঠিকঠাক হবে। আর জিডিপি কমবে, কমা তো উচিত। এটা আগে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। অনেকগুলো স্ট্যাটিস্টিকসকে ম্যানিপুলেট করে বাড়ানো হয়েছে, কমানো হয়েছে; পপুলেশন কত সেটা কোনোদিন ঠিক হয়নি। গ্রোথ বাড়ানো-কমানো হয়েছে। সেটাকে সঠিকভাবে করলে এটা কমবে। তবে কিছু দ্রব্যমূল্য কমছে, স্ট্যাবল হয়েছে, হু হু করে বেড়ে যায়নি। আবার ডলারের দাম স্ট্যাবল আছে, কিছুটা কমেছেও এগুলো ইতিবাচক।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
তোফায়েল আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়
