রাম সিং গড়। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ১১৯ বছর। তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার মেকানিছড়া চা বাগানের বাসিন্দা। মেকানিছড়া চা বাগানের অবস্থান শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ত্রিপুরা সীমান্তে।
মেকানিছড়া চা বাগানে রাম সিং গড়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি টিনের চালের পাকা ঘর। ঘরের বারান্দায় বসে বাচ্চাদের নিয়ে গল্প করছেন তিনি। উনার বয়স জানতে চাইলে বলেন ১৩৫ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্ম তারিখ লেখা রয়েছে ৬ আগস্ট ১৯০৫। তার বাবার নাম বুগুরাম গড়। আর মায়ের নাম কুন্তী গড়। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ১১৯ বছর। রাম সিং গড় এখনো ঘরের কাজ নিজেই করে থাকেন। নিজ হাতে তৈরি করেন হাতপাখা।
যুদ্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ১৯৬৫ সালে শ্রীমঙ্গল বিদ্যাবিল চা বাগানে ইন্ডিয়া পাকিস্তান রায়ট হয়। গোলাগুলি হয়। তখন তিনি বিদ্যাবিল চা বাগানে ছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ হয় তখন হরিণছড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও স্টাফরা বাগান ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু তিনি যাননি। তিনি এবং নিরেণ হাদিমা মিলে শ্রমিক সংগ্রহ করে বাগানের পাতা তুলে খেজুরি চা বাগানে পাঠান। পুরো ৯ মাস বাগানে থেকে হরিণছড়া চা বাগান রক্ষা করেন।
যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয় ১৯১৪-১৫ সালে তখন তিনি বাগানের পাহারাদার। ইংরেজ সাহেবদের কাছে এই যুদ্ধের কথা শুনেছিলেন তিনি। ১৯৩৯-৪০ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয় সেই খবরে তখনও বাগানের মানুষ ভীত ও আতঙ্কিত হন।
তিনি জালেন, শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন বিদ্যাপিঠ ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখায় ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত তিনি লেখাপড়া করেছেন। তখন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এক পাশে পাকা ঘর লোহার পিলার ছিল আর এক পাশে ছিল ছনের ঘর। এই ছনের ঘরে তিনি ক্লাস করতেন। সেসময় শ্রীমঙ্গলে পাকা সড়ক হয়নি।
রাম সিং গড় জানান, তার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার অনেক বছর পর ২য় বিয়ে করেন। এই সংসারে তার ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে জন্ম নেয়। আগের সংসারে শুধু একটি মেয়ে ছিল। আগের সংসারের মেয়ে ও পরের সংসারের বড় ছেলে ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। ছেলে মেয়ের ঘরের একাধিক নাতনী বিয়ে দিয়েছেন তাদের সন্তানও ১৫-১৬ বছরের। তার ছেলেমেয়ে, নাতিপুতি মেয়ের জামাই, নাতিন জামাই, পুত্রবধূ মিলিয়ে জীবিত সদস্য সংখ্যা ৭০ এর ওপরে। তার চতুর্থ ছেলে জগদীশ গড়। এখন সবাই আলাদা আলাদা থাকেন। তিনি থাকেন তার ৪র্থ ছেলের সাথে।
মেকানিছড়া চা বাগানের বাসিন্দা সরস্বতী গড়। উনার বয়স প্রায় ৭০। তিনি বলেন, আমি বিয়ের পর যখন এইখানে এসেছি তখন রাম সিংয়ের ছেলেমেয়েরা অনেক বড়। এত বয়সেও তিনি চলাফেরা করেন, নিজে ঘরের কাজকর্ম করেন এইটাই অনেক কিছু।
৮০ বছর বয়সী নিরেণ হাদিমা। তিনি হরিণছড়া চা বাগানের বাসিন্দা। দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৯৭১ সালে হরিণছড়া চা বাগান রক্ষায় রাম সিংয়ের ভূমিকা ছিল প্রবল। তখন রাম সিং বাগানের সর্দার ছিলেন। তিনি অন্যান্য বাগান থেকে শ্রমিক এনে পাতা তুলে বাগান রক্ষা করেছেন। যাতে গাছসহ অনান্য মালামাল চুরি না হয় রাম সিং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা পাহারা দেন।
তিনি জানান, সুস্থতার সাথে দীর্ঘায়ূ ধরে রাখতে তার দরকার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ভালো খাবার।
রাম সিং গড়ের ছেলে জগদীশ গড় বলেন, বাবার অনেক বয়স হয়েছে, এখন কানে কিছুটা কম শুনেন, তবুও লোকজনের সাথে কথা বলতে বিভিন্ন বাড়িতে যান তিনি। এলাকার বাচ্চাদের নিয়ে গল্প করেন। বাড়িতে বসে বসে তিনি বাঁশ ও বেত দিয়ে হাতপাখাসহ নানা জিনিস বানান। এই বয়সে এসেও তিনি নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করেন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু তালেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাম সিং গড় এর বিষয়ে আমি জানার পর আমাদের সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি উনার বিষয়ে সকল তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। সকল তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে দিবো। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিবো।
