আশুলিয়ায় গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা দাবি উপদেষ্টার

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০১ এএম

আশুলিয়ায় শ্রমিক-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে গুলিতে এক শ্রমিক নিহতের প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ শুরু করেন তারা। এদিকে গুজব ছড়িয়ে আশুলিয়ায় সহিংসতা ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন। এদিকে আশুলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, মারপিট, কারখানায় অনুপ্রবেশ করে লুটপাট এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছে শিল্পপুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী। গতকাল সন্ধ্যায় আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক মামলা দায়ের এবং গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে শিল্পপুলিশ-১ এর উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদ মিয়া বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১২০০ জনকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলাটি করেন।

শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে একটি গুজবকে কেন্দ্র করে। পরে শ্রমিকদের মধ্য থেকে অনুপ্রবেশকারীরা গুলি ছোড়ে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৩ জন আহত হন। এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।

উপদেষ্টা বলেন, পুরো ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের উসকে দিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছে। এরপরই পরিস্থিতির অবনতি হয়। উসকানিদাতা এবং অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

আশুলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন জানিয়ে শ্রম উপদেষ্টা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে। একই সঙ্গে শ্রমিক এবং মালিকদের মধ্যে মডারেটর হিসেবে কাজ করার জন্য বলা হয়েছে। নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, আহত শ্রমিকদেরও সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ : গতকাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ চলাকালে জাবি শিক্ষার্থীরা শ্রমিক হত্যা কেন, ড. ইউনুস জবাব চাই, রাস্তায় শ্রমিক মরে, ইউনূস কী করে, পোশাক শ্রমিক রাস্তায় মরে, ইউনূস কী করে, ছাত্র-শ্রমিক জনতা, গড়ে তোলো একতা, জ্বালো রে জ্বালো, হত্যাকারীর গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে ইত্যাদি সেøাগান দিতে দেখা যায়।

গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রদের যতখানি ঠিক ততখানি অংশগ্রহণ শ্রমিকদের ছিল উল্লেখ করে ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলী বলেন, ‘আমরা যে অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছি সেটা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে ছাত্রদের যতখানি ঠিক ততখানি অংশগ্রহণ ছিল শ্রমিকদের। কখনো কখনো শ্রমিকরা অগ্রভাগে ছিলেন এবং জীবন দিয়েছেন। গত ৫ আগস্ট লং মার্চে অসংখ্য পোশাক শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছিল। কাজেই সেই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন সরকারের হাতে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকরা খুন হচ্ছে সেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষোভের। আমরা কড়া হুঁশিয়ারি দিতে চাই, সরকার যদি ভাবে শ্রমিকদের দমিয়ে রাখবে তাহলে দরকার হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের কাফেলা গিয়ে শ্রমিকদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে পাশে থাকবে।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) জাবি শাখার সংগঠক সজিব আহমেদ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আশুলিয়ার শ্রমিকরা বুক পেতে লড়াই করেছে। আজ কেন তাদের বুকে গুলি হলো? ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্রে তো আমরা এটা চাই না। আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি সেই বিশ্ববিদ্যালয় শ্রমিকের টাকায় চলে, আমার শিক্ষকের বেতন হয় শ্রমিকের টাকায়, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ক্রয় হয় শ্রমিকের টাকায়। যার কারণে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি শ্রমিকের কাছে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা শ্রমিকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। এই হত্যাকা-ের বিচার করতে হবে। এই দায় এই অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা সরকারকে নিতে হবে।’

আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তায় কারখানা চালু : শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানা। সকালে এসব কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করে কাজে যোগ দিয়েছে শ্রমিকরা। তবে অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে বেশ কয়েকটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোমবার সকাল থেকে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে বার্ডস গ্রুপের শ্রমিকরা। 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের কোথাও কোনো ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া বন্ধ থাকা ম-ল নিটওয়্যার কারখানাটিও খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ওই কারখানার শ্রমিকরাও শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানার সামনে যৌথ বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রাখা হয়।

এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাইপাইল এলাকায় এবং ডিওএইচএস-এর সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে বার্ডস গ্রুপের শ্রমিকরা। পরে ডিওএইচএস-এর সামনে থেকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সরে গেলেও বাইপাইল এলাকায় অবস্থান নিয়ে গতকালও পাওনা আদায়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।

মহাসড়কের বাইপাইল পয়েন্টেই উভয় লেনে সোমবার সকাল ৯টা থেকে সড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। গতকাল গভীর রাতে বৃষ্টিতে ভিজেও সড়ক অবরোধ করে রেখেছিল তারা। গতকাল ভিন্ন পথে গাড়ি চললেও মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে করে এই পথে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে জনসাধারণকে। এতে নবীনগর ত্রিমোড়কে কেন্দ্র করে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রায় ২০ কিলোমিটার জটের সৃষ্টি হয়েছে।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে শ্রমিকরা সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। আমরা তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু শ্রমিকরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সড়ক ছাড়বে না বলে জানিয়েছে। আমরা কারখানাটির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। এছাড়া বিজিএমইএসহ যৌথ বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

আশুলিয়া শিল্প-পুলিশ ১ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। শ্রমিকরা সকালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগদান করায় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

গাজীপুরে বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ : বকেয়া বেতনের দাবিতে গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকার টিঅ্যান্ডজেড গ্রুপের অ্যাপারেলস প্লাস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া বর্ষা সিনেমা হলের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ওই পথে চলাচলকারীরা।

শিল্পপুলিশ, থানা পুলিশ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর টিঅ্যান্ডজেড গ্রুপের অ্যাপারেলস প্লাস লিমিটেড কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন না পরিশোধ করেই কারখানা বন্ধ করে দেয়। গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করে। কিন্তু মালিকপক্ষ বেতন দিতে অপারগতা প্রকাশ করে ৩০ সেপ্টেম্বর বেতন পরিশোধ করার কথা জানায়। এরপর শ্রমিকরা আর কোনো আন্দোলন বা বিক্ষোভ করেনি। পূর্বনির্ধারিত আশ্বাস অনুযায়ী সোমবার বিকেলে বেতন চাইলে কর্তৃপক্ষ বেতন দেয়নি। পরে রাতেই শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে এবং মহাসড়ক অবরোধ করে। রাত ১টার দিকে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে যায় এবং গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকরা ফের বেতনের দাবিতে জেলার ভোগড়া মোড় ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মহাসড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উভয় দিকে ৯ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া গাজীপুরের ভোগড়া থেকে টাঙ্গাইলের দিকে অন্তত ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ওই সড়কে চলাচলকারীরা।

অপরদিকে মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকার এম এম নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা টিফিন বিল, নাইট বিল এবং হাজিরা বোনাস বৃদ্ধির দাবিতে সোমবার দুপুরে বিক্ষোভ শুরু করে। কোনো সমাধান না হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকে তারা ফের কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেছে।

গাজীপুর শিল্পপুলিশের এসপি সারোয়ার আলম বলেন, মহাসড়ক অবরোধ সৃষ্টিকারী পোশাক কারখানার শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। তারা বেতন পরিশোধের আশ্বাস প্রদান করেছেন। এদিকে শ্রমিক অবরোধের খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত