বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিজয় মিছিলে গিয়েছিলেন বাবা-ছেলে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালেন ছেলে, বেঁচে রইলেন বাবা। বিজয়ের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিল বিষাদে। হতদরিদ্র বর্গাচাষী রাজু আহমেদকে গ্রামে ফিরতে হলো একমাত্র ছেলের লাশ নিয়ে।
গত ৫ আগস্ট ছিল স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিজয়ের দিন। সারাদেশের মতো ঢাকার সাভারেও চলে দিনভর আনন্দ মিছিল। বিজয়ের আনন্দ মিছিলে যোগ দিতে যান রাজু আহমেদ ও তার ছেলে হৃদয় আহমেদ। মিছিল থেকে বাবা ফিরলেও ছেলের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে পিচঢালা রাজপথ রাঙিয়ে শহীদের নামের তালিকায় স্থান করে নেন নাটোরের হৃদয় আহমেদ (২২)।
নাটোরের চলনবিলের প্রত্যন্ত এলাকা ছাতারদীঘি গ্রামের রাজু আহমেদ আর ছপুরা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে হৃদয় আহমেদ। চার ভাই-বোনের মধ্যে হৃদয় তৃতীয়। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।
বর্গাচাষী রাজু আহমেদের একার আয়ে সংসার চলত না। তাই ছফুরা বেগম ও ছেলে হৃদয় আহমেদ জীবিকার তাগিদে সাত বছর আগে পাড়ি জমান ঢাকার সাভারে। মা কাজ করেন পাকিজা গার্মেন্টসে। নাটোরের কালিগঞ্জ বনমালি ইনস্টিটিউশন থেকে অষ্টম শ্রেণি পাশ করা হৃদয় সাভারের মারহাবা গার্মেন্টসে অপারেটর পদে কাজ নেন। সাভার থানা রোডের পাকিজা গার্মেন্টস সংলগ্ন বড় হুজুরের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন মা-ছেলে।
দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে মা ছফুরা বেগম আর ছেলে হৃদয় আহমেদের যৌথ উপার্জনে সবে সংসারটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই শুরু হয় আন্দোলন। সাভার এলাকার মিছিল-সমাবেশে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হয়ে ওঠেন হৃদয় আহমেদ।
আগস্টের এক তারিখে যোগদান করার কথা ছিল পাকিজা গার্মেন্টসে। এই কর্মস্থলে আগে থেকেই তার মা কর্মরত ছিলেন। কিন্তু আন্দোলন জোরালো হওয়ায় গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যায়। রাগী জেদি হৃদয় আহমেদ আরও সক্রিয় হন আন্দোলনে।
ছাতারদীঘি ইউনিয়ন যুবদলের প্রচার সম্পাদক রাজু আহমেদ থাকেন গ্রামে। কিন্তু দেশের জন্য আন্দোলন করার সুযোগ পেয়ে ঢাকা চলে আসেন। ৫ আগস্টের হাজারও জনতার আনন্দ মিছিল যেন পিতা-পুত্রেরও যৌথ আনন্দের ফল্গুধারা।
হৃদয়ের বাবা রাজু আহমেদ জানান, গত ৫ আগস্ট নবীনগর থেকে বিশাল আনন্দ মিছিল নিয়ে ছাত্র-জনতা সাভার থানা রোডের মুক্তির মোড় গোল চত্বরে সমবেত হয়। পুলিশ তখনো বেপরোয়া। নির্বিচারে গুলি চালায় মিছিলে। মিছিলের সামনে থাকা হৃদয়ের পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায় একটি গুলি। বুক আর ঘাড়ে লাগে আরো তিনটি গুলি। লুটিয়ে পড়েন রাজপথে। চারিদিকে রক্তের বন্যা। সহযোদ্ধারা নিয়ে যান এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিন দিন মেডিকেলের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৮ আগস্ট হৃদয় ইন্তেকাল করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৮ আগস্ট হৃদয়ের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান মরদেহ। হাজারো মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে জানাজার পরে দাফন করা হয় হৃদয়কে। হৃদয়কে আর পরিবারের আয় বৃদ্ধির জন্য চাকরিতে যাওয়ার কথা ভাবতে হবে না। দেশের মুক্তির কথা ভাবতে হবে না। দুরন্ত হৃদয় নিজের হৃদয়কে উপহার দিয়ে গেছেন দেশের জন্যে। বাংলাদেশের হৃদয়ে আজীবন লেখা থাকবে শহীদ হৃদয়ের নাম।
কালিগঞ্জ বনমালি ইনস্টিটিউশনের সহকারী শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, সহজ-সরল প্রকৃতির প্রাণখোলা ভালো মনের মানুষ ছিল হৃদয়। শিক্ষকসহ সবাইকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করত। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে হৃদয় গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
ছাতারদীঘি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ সরদার জানান, এলাকার টগবগে যুবক হৃদয়ের সাথে সকলের সুসম্পর্ক ছিল। তার কথা দেশবাসী মনে রাখবেন।
নাটোর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ বলেন, শহীদ হৃদয় আমাদের হৃদয়ে থাকবেন আজীবন। ভবিষ্যতে এলাকায় হৃদয়ের নামে কোনো স্থাপনার নামকরণ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এদিকে শোকে পাথর হয়ে গেছেন হৃদয়ের মা ছপুরা বেগম। কান্না ছাড়া তার কোনো ভাষা নেই এখন। ছেলের কথা উঠলেই ডুকরে কেঁদে উঠছেন তিনি।
হৃদয়ের বাবা রাজু আহমেদ নিজেকে সামলে নিয়েছেন অনেকটাই। সাভার থানায় পতিত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। শুরু হয়েছে মামলার তদন্ত। ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে রাজু আহমেদ বলেন, ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এদেশে রোধ হবে দুঃশাসন। আর কোন স্বৈরাচার সৃষ্টি হবে না।’
২০২৫ সালের মধ্যে আরও ৩৫ কূপ খননের পরিকল্পনা
আমিরাতে ৬৬ কোটি টাকার লটারি জিতলেন বাংলাদেশি কর্মী
ইসরায়েলি হামলার শঙ্কায় ইরানের যেসব পরমাণু স্থাপনা