লাকীর ‘দুর্নীতির শিল্পকলা’

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৪৪ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর শিল্পকল্পা একাডেমি ছাড়েন মহাপরিচালক (ডিজি) লিয়াকত আলী লাকী। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তার ইচ্ছায় হয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও কেনাকাটাসহ একাডেমির সব কাজ। এখন অবসান হয়েছে লাকীর দাপটের। চলছে তার সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত। অভিযোগ উঠেছে, তার দায়িত্ব পালনকালে আড়াইশ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়ার নেতৃত্বাধীন একটি টিম এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন।

লিয়াকত আলী লাকী ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান। ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ সপ্তমবারের মতো তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে টানা ১৩ বছরের বেশি সময় শিল্পকলার ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সম্প্রতি লাকীর স্থলাভিষিক হয়েছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালে লাকী ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে। একই সঙ্গে তার সিন্ডিকেটের আটজন কর্মকর্তাকে ৬০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক বানিয়েছেন।

যদিও দুদক ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি লাকীর দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে। সংস্থাটির উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়ার সমন্বয়ে গঠিত টিম অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে। কিন্তু দুদকের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ না দেওয়ায় আটকে থাকে তদন্ত। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ অনুসন্ধানে গতি আসে।

দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়, ২০২১ সালের ৩০ জুন ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন তিনি। ২০২০-২১ অর্থবছরের ৩০ জুন বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তাকে এ কাজে সহায়তা করেন তার সিন্ডিকেটের সদস্য কালচারাল অফিসার সহকারী পরিচালক (হিসাব) আল হেলাল ও উপপরিচালক (অর্থ) শফিকুল ইসলাম। ২০২১ সালে ৩০ জুন আটজন কালচার অফিসারকে জেলায় বদলি করেছিল মন্ত্রণালয়। শিল্পকল্পার ডিজি প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে তাদের বদলির আদেশ বাতিল করান। এরপর এসব কর্মকর্তাকে নিয়ে মিটিং করে অনুষ্ঠান দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার কালচার অফিসারদের ঢাকায় এনে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে টাকা আত্মসাতের পথ সুগম করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী হয়নি। কিন্তু ১২-১৫ কোটি বাজেট আত্মসাতের জন্য ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান করে কাগজপত্র বানানো হয়। যারা চারুকলার কাজ বোঝেন, তাদের এ কাজের সঙ্গে রাখা হয়নি। তিনি নিজের পছন্দের লোক দিয়ে চারুকলা প্রদর্শনীর জোট করেন। ২০২০-২১ অর্থবছরের শিল্পকলা একাডেমির ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাতের ব্যবস্থা করেন। তিনি একাডেমির সচিবকে ২০২১ সালের জুন মাসে সরিয়ে দিয়ে অন্য একজনকে সচিবের দায়িত্ব দেন। পরে প্রতি বছর জুন মাসে ২৫-৩০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এসব টাকার ভাগ তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা পেয়ে থাকতেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২১ সালের ৩০ জুন শিল্পকলা একাডেমির আগের সচিব নওশাদ হোসেন বদলি হলে ওইদিনই নতুন আদেশ জারি করে একাডেমির চুক্তিভিত্তিক পরিচালক সৈয়দা মাহবুবা করিমকে সচিবের দায়িত্ব দেন লাকী। এরপর ৩০ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ২৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া লাকীর বিরুদ্ধে সংগীত বিভাগের কক্ষে ব্যবহারের জন্য পর্দা, ক্রোকারিজ ও আসবাবপত্র না কিনে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ, ডান্স অ্যাগেইনস্ট করোনা কর্মসূচির আওতায় নৃত্যদলের সম্মানী, হার্ডডিস্ক ক্রয়, ডকুমেন্টেশন, প্রপস-কস্টিউম, প্রচার ও বিবিধ খরচ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেন।

৪৭ জনবল নিয়োগে অনিয়ম : লাকীর বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন পদে ৪৭ জনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে তিনটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন পদে লিখিত পরীক্ষায় পাস না করা ২৫ জনকে পাস দেখিয়ে চাকরি দেওয়া হয়। শিগগিরই শিল্পকলার ঘটনায় একাধিক মামলা করা হবে বলে জানান দুদক সূত্র।

দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়, শিল্পকলায় নিয়োগের জন্য বিভিন্ন পদে পরীক্ষা হলেও সব শেষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আগে থেকে নির্ধারিত করে রাখা প্রার্থীদের। ওই সময় লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে। আর মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হয় শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে। লিখিত পরীক্ষায় যারা ফেল করেছেন তাদেরও মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়েছিল। আর যারা পাস করেছেন তাদের অনেককে ডাকা হয়নি। ফেল করা যে প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে লাকীর নিজস্ব লোকনাট্য দলের আটজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে নৃত্যশিল্পী ১২, সংগীতশিল্পী ৮, কালচারাল অফিসার ৬, শিল্পী ১০, ইন্সট্রাক্টর (নৃ) পদে ৩ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। যাদের অধিকাংশই লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেননি। যন্ত্রশিল্পী পদে ২০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছেন পাঁচজন, অথচ নিয়োগ পেয়েছে ১০ জন। নৃত্যশিল্পী পদে পাস করেছেন ৪ জন, নিয়োগ পেয়েছেন ১২ জন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এ অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র চেয়ে নোটিস পাঠায় দুদক। এতে ২০১৭ সালে তিনটি সার্কুলারের মাধ্যমে ৪৭ জনকে নিয়োগসংক্রান্ত পরীক্ষার গ্রহণ নীতিমালা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্রসহ নথিপত্র এবং ফল প্রকাশের টেবুলেশনশিটের সত্যায়িত কপি চাওয়া হয়।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাকরিপ্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় যে নম্বর দিয়েছে, শিল্পকলায় আসার পর সেই নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। যারা ফেল করেছে তাদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান টিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজাল্ট শিটের সঙ্গে শিল্পকলার রেজাল্ট শিট যাচাই করে এ অনিয়ম খুঁজে পায়। চাকরি পাওয়া ২৫ জনের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে। দুদকের অনুসন্ধান শেষপর্যায়ে। শিগগিরই মামলার সুপারিশসহ কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

লাকী সিন্ডিকেটের কোটিপতি ৮ কর্মকর্তা : লাকী সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করে শিল্পকলার আটজন জেলা কালচার অফিসার বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে অফিসার চাকলাদার মাসুদ সুমনের সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া এরশাদ হাসানকে ৫ কোটি টাকা, সুজন মাহবুবকে ৫ কোটি টাকা, মোস্তাক আহমেদকে ১০ কোটি ও ৫টি মাইক্রোবাস, রাকিবিল বারীকে ৫ কোটি টাকা, রিফাত জাহানকে ৫ কোটি ও ২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আল হেলালকে ১০ কোটি ও ৪টি ফ্ল্যাট এবং শহিদুল ইসলামকে ১০ কোটি ও ৪টি ফ্ল্যাটের মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন লাকী।

জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল দুদক : অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে লাকীর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য ২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি তলব করে নোটিস পাঠানো হয়। গত ১৬ জানুয়ারি লাকী দুদকে হাজির হয়ে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের অধিকাংশই মিথ্যা ও অপপ্রচার।

শিল্পকলার নথিপত্র না পাওয়ায় আটকে থাকে অনুসন্ধান : ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্পকলার ঢাকা কার্যালয়ে বরাদ্দকৃত বাজেট ও ব্যয়সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংবলিত নথিপত্রের ফটোকপি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে অব্যয়িত ৩৫ কোটি টাকা ২০২১ সালের ৩০ জুনে ব্যয়করণসংক্রান্ত রেকর্ডপত্র তলব করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজনসংক্রান্ত রেকর্ডপত্রের ফটোকপি, ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন ভাউচার-ক্যাশ বই এবং শিল্পকলা একাডেমি নামীয় সোনালী ব্যাংক (সেগুনবাগিচা শাখা) অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টের কপি চাওয়া হয়।। এর মধ্যে শিল্পকলা একাডেমি থেকে কিছু নথিপত্র দুদকে পাঠানো হলেও সব নথিপত্র পাঠানো হয়নি। এতে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয় ও ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন ভাউচার-ক্যাশ বই এবং শিল্পকলা একাডেমি নামীয় সোনালী ব্যাংক হিসাবের বিবরণের কপি পুনরায় চাওয়া হয়। একাধিকবার নথিপত্র তলব করে সব নথিপত্র পাওয়া যায়নি, ফলে আটকে আছে দুদকের অনুসন্ধান কাজ।

দুদকের (বিশেষ তদন্ত) শাখার একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, লাকী হলেন শেখ হাসিনার পছন্দের লোক। এ ছাড়া প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রী, এমপি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ কারণে দুদক চাইলেও অ্যাকশনে যেতে পারেনি। এখন পটপরিবর্তন হয়েছে। দ্রুত অনুসন্ধান কাজ শেষ করা হবে। শিল্পকলার ঘটনায় একাধিক মামলা হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত