দেশের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৪ শতাংশে

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৪, ০৫:১২ এএম

বাংলাদেশের টানা অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও প্রকট হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশের অর্থনীতিও সংস্কারের মুখে পড়ে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক বলছে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের গড় দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৪ শতাংশে। যেটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। একই সময়ে বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধির ওপর থাকবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ এশিয়ার আপডেট প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এতে দুই-একটি দেশ ছাড়া পুরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা চেয়েও বেশি হয়েছে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি। তবে অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে নারীদের কর্মসংস্থান আরও বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করছে তারা।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধীরগতির কারণ উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি সদ্য শেষ হওয়া ২০২৩-২৪-এ ৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণের জন্য বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু কারণ দায়ী। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা পরিসংখ্যানের অভাব এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কারণে অনিশ্চয়তা এসেছে। স্বল্পমেয়াদে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ এবং শিল্প প্রবৃদ্ধিকে স্তব্ধ রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক বন্যা

কৃষি উৎপাদনকে আরও পিছিয়ে দেবে। মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে, আর্থিক খাতে সমালোচনামূলক সংস্কার, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়বে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে দুই-একটি ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক দিক দেখা গেলেও পুরো অর্থনীতিই এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর আগে বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে একটি সংখ্যাই দিত। কিন্তু এবার দুটি দিয়েছে। যে দুটি সংখ্যা দিয়েছে এর মধ্যে তফাত বিরাট। ৪ খুবই দুর্বল আর ৫ মোটামুটি শক্তিশালী। অর্থাৎ অনিশ্চয়তা অনেক বড় সেটাই এখানে উঠে এসেছে, মূল বার্তা। এ বছর প্রবৃদ্ধি কত হতে পারে সেটা বলা খুব কঠিন। একেবারে কমও হতে পারে, আবার খুব ভালোও হতে পারে। তিনি বলেন, বছরের মাত্র সাড়ে তিন মাস পার হয়েছে। আরও সাড়ে আট মাস রয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এরকম একটি অনিশ্চয়তা আছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে আগস্টের পরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে ওঠানামা করছে, গার্মেন্টসে অস্থিরতা সব মিলিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছানো অনেক কঠিন।

কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, প্রবাসীয় আয়ের প্রবাহ বাড়া ও রপ্তানি আয়ের কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে এটাকে একেবারে স্বাভাবিক অবস্থা বলা যাবে না। এ অস্বাভাবিক অবস্থা কতদিন থাকবে সেটাও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। সেটা মাথায় রেখেই বিশ্বব্যাংক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৭ শতাংশের বিরাট প্রাক্কলন করেছে।

বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে গত আওয়ামী লীগ সরকার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। সেই হিসেবে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস সরকারি লক্ষ্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী কমে গেলে তা হবে কভিড মহামারীর পর সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের পূর্বাভাস কমানোর পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনও কমিয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়েছে। গত অর্থবছরের জন্য সরকারের সাময়িক প্রাক্কলন ছিল ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

এই বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে করা বিশ্বব্যাংকের আগের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ অঞ্চলটি বিশে^র সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ার পথে রাখা হয়েছে।

শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত পরিবেশে অপ্রয়োজনীয় সম্ভাবনা উন্মোচন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকা- আরও দ্রুত বৃদ্ধি করতে এবং এর উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে।

গতকাল প্রকাশিত সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়ন আপডেট, নারী, চাকরি এবং প্রবৃদ্ধি এ অঞ্চলে একটি অর্থনৈতিক উত্থানের পূর্বাভাস দিয়েছে। এটি ভারতে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে দ্রুত পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেও হতে পারে। আগামী দুই বছরের জন্য প্রবৃদ্ধি বছরে ৬ দশমিক ২ শতাংশে শক্তিশালী থাকবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

এই পূর্বাভাসে চরম আবহাওয়া, ঋণ সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতাসহ নিম্নমুখী ঝুঁকির বিষয়ও উঠে এসেছে। পরিকল্পিত সংস্কারে বিলম্বের মতো নীতিগত ভুলগুলোও এ অঞ্চলকে পিছিয়ে দিতে পারে। ভঙ্গুর আর্থিক এবং বাহ্যিক অবস্থান এ ঝুঁকিগুলোর অন্যতম কারণ।

দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রাইসার বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে প্রতিশ্রুতিশীল, তবে এ অঞ্চলটি তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচিত করতে আরও অনেক কিছু করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আরও বেশি নারীকে কর্মশক্তিতে একীভূত করতে এবং বৈশি^ক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মূলনীতি সংস্কার প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আমাদের গবেষণা বলছে, এ অঞ্চলে পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার আঞ্চলিক জিডিপি ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।’

দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বিশে^র মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২৩ সালে মাত্র ৩২ শতাংশ কর্মজীবী মহিলা শ্রমশক্তিতে ছিলেন, যেখানে এই অঞ্চলের ৭৭ শতাংশ কর্মজীবী পুরুষের তুলনায়। ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মধ্যে ২০২৩ সালে মহিলা শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার একই স্তরের উন্নয়নের দেশগুলোর তুলনায় ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পয়েন্ট কম ছিল। নারী শ্রমশক্তিতে এ ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিয়ের পর। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ে একবার বিবাহিত মহিলারা শ্রমশক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ ১২ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কমায় তাদের সন্তান হওয়ার আগেই।

পরিষেবা কার্যক্রমের দিকে পরিবর্তন, সাধারণত মহিলা শ্রমের বৃহত্তর চাহিদার সঙ্গে যুক্ত, এখনো এ অঞ্চলে মহিলা কর্মসংস্থানের উচ্চস্তরের দিকে পরিচালিত করেনি। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই পুরুষকর্মীদের পছন্দ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসর্গ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ৩২ শতাংশ। উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে গড়ে ৫৪ শতাংশের কম। মহিলাদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সব অংশীজনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমাদের প্রতিবেদন একটি বহুমুখী প্রচেষ্টার সুপারিশ করে। এখানে সরকার, বেসরকারি খাত, সম্প্রদায় এবং পরিবারের সবার ভূমিকা রয়েছে।’

প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ সমতা উন্নত করার জন্য আইনি সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিবহনের অভাব এবং ঘরের বাইরে কাজ করা নারীদের প্রতিবন্ধকতা দূর করা। এ ধরনের ব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে যদি সামাজিক নিয়মগুলো নারীর কর্মসংস্থান আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত