সাগরে পুড়ল এস আলমের মেয়ে জামাইয়ের এলপিজি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৩৩ এএম

এবার সাগরে পুড়ল দেশের আলোচিত শিল্প গ্রুপ এস আলমের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের (এস আলম) মেয়ে জামাইয়ের কোম্পানির আমদানি করা তরলীকৃত পেট্রলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায় মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) ‘ক্যাপ্টেইন নিকোলাস’ থেকে লাইটার জাহাজ ‘এলপিজি সোফিয়া’য় স্থানান্তরের সময় সৃষ্ট আগুন গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ১৮ ঘণ্টায়ও নেভানো যায়নি।

এতে লাইটার জাহাজে থাকা প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন এলপি গ্যাস পুড়ছে। আগুনের তীব্রতা কমে এলেও গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা জ্বলতে পারে বলে জানা যায়।

গত শনিবার রাত ১টায় ক্যাপ্টেইন নিকোলাসে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর এ মাদার ভেসেল থেকে আগুন ছড়িয়ে যায় লাইটার জাহাজে। মাদার ভেসেলের আগুন কিছুক্ষণ পর নিভিয়ে ফেলতে পারলেও এলপিজি সোফিয়ার আগুন তীব্র আকার ধারণ করে।

এ ঘটনায় ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌ-মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে এ কমিটি করা হয়েছে বলে গতকাল রবিবার উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়।

এর আগে গত মাসে দুটি লাইটার জাহাজে আগুন লাগে। এর মধ্যে ঘাটে নোঙর অবস্থায় আগুন লাগে জ¦ালানি তেলবাহী ‘বাংলার জ্যোতি’ নামের জাহাজে। এরপর বহির্নোঙরে থাকা অবস্থায় আগুন লাগে তেলবাহী আরেকটি জাহাজ ‘বাংলার সৌরভে’।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শিপিং এজেন্ট সূত্রে জানা যায়, ‘ক্যাপ্টেইন নিকোলাস’ জাহাজে করে ওমান থেকে ৪২ হাজার ৯২৫ টন এলপি গ্যাস আমদানি করা হয়। গত ৬ অক্টোবর জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপকূলে নোঙর করে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে আমদানিকারকরা গ্যাস নিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে শিপ টু শিপ (জাহাজ থেকে জাহাজ) ট্রান্সফার পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথম চালানে ক্যাপ্টেইন নিকোলাস জাহাজ থেকে একটি লাইটার জাহাজে করে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন গ্যাস নিয়ে গেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্যাস। দ্বিতীয় চালানে শনিবার রাতে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছিল ইউনিট্যাক্স এলপিজি লিমিটেডের গ্যাস। ইউনিট্যাক্সের মালিক হলেন আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের (এস আলম) মেয়ে জামাই বেলাল আহমেদ। জাহাজে ইউনিট্যাক্সের আরও প্রায় সাত হাজার এলপিজি রয়েছে। মাদার ভেসেলে থাকা গ্যাস থেকে কি ইউনিট্যাক্স আবারও গ্যাস নিতে পারবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেইন নিকোলাস জাহাজের এজেন্ট এবং সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ ছামিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউনিট্যাক্সের তিন লাইটার জাহাজে ১০ হাজার টন এলপিজি ছিল। এক লাইটার জাহাজের এলপিজি আগুনে পুড়ে গেলে আরও দুই লাইটার বাকি থাকবে। মাদার ভেসেল থেকে খালাস শুরু হলে আগের ধারাবাহিকতায় যার যার গ্যাস পেয়ে যাবে।’

আমদানিকারক সূত্রে জানা যায়, মাদার ভেসেলে থাকা ৪২ হাজার ৯২৫ টন এলপিজির মধ্যে যমুনা এলপিজির ২০ হাজার টন, ইউনিট্যাক্সের ১০ হাজার, বগুড়ার টিএমএসএসের ৬ হাজার, এনার্জিপ্যাকের ৩ হাজার ৩০০ ও বিএম এনার্জির ৩ হাজার ৬২৫ টন এলপিজি রয়েছে।

আগুন কীভাবে লাগল : আগুন লাগার কারণ জানতে চাইলে ‘ক্যাপ্টেইন নিকোলাস’ জাহাজের এজেন্ট এবং সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী শেখ মোহাম্মদ ছামিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে গ্যাস স্থানান্তর শেষ হওয়ার পর হোস পাইপ খোলার সময় স্পার্ক করে। সেই স্পার্ক থেকে মাদার ভেসেলে আগুনের সূত্রপাত হয়। মাদার ভেসেল থেকে রশির মাধ্যমে তা লাইটার জাহাজে চলে আসে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর মাদার ভেসেলের নাবিকরা রশি কেটে দিলে লাইটার জাহাজ দূরে সরে আসে এবং মাদার ভেসেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।’

কিন্তু লাইটার জাহাজ সোফিয়ায় আগুন নেভানোর বিষয়ে ছামিদুল হক বলেন, ‘লাইটার জাহাজের নাবিকরা ভয়ে আগুন নেভানোর পরিবর্তে সাগরে ঝাঁপ দেয়। ফলে এই জাহাজে আগুন জ¦লতেই থাকে। পরবর্তী সময়ে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী দল আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।’

সাগরে লাফ দেওয়া নাবিকদের ভাগ্যে কী ঘটেছে : সোফিয়া জাহাজের এক কিলোমিটারের মধ্যেই এলপিজি নেওয়ার জন্য অপেক্ষারত ছিল চাতকি নামের আরেকটি লাইটার জাহাজ। আগুন লাগার বিষয়টি সরাসরি দেখেছেন এই জাহাজের ক্যাপ্টেন ফরমান উল্লাহ আনসারী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সোফিয়ার ৩১ জন নাবিকের সবাই সাগরে ঝাঁপ দেন। তখন আমরা তাদের উদ্ধার করতে আসি। যেহেতু সরাসরি পানি থেকে নাবিকদের তুলে আনতে বড় জাহাজ দিয়ে সম্ভব নয়, তাই ছোট টাগবোট আসার পর তাদের উদ্ধার করা হয়েছে।’

আগুন লেগেছে রাত ১টার দিকে। তাদের উদ্ধার করতে রাত আড়াইটা পর্যন্ত সময় লেগেছে বলে জানান ক্যাপ্টেন ফরমান উল্লাহ আনসারী। তিনি আরও বলেন, ‘তখন আকাশে পূর্ণিমা থাকায় সাগরে দৃশ্যমানতা ছিল এবং ভাটার টান কম থাকায় নাবিকরা গভীর সাগরের দিকে ভেসে যাননি। তারপরও আমরা সাগরের দিকে নেট ছড়িয়ে দিয়েছিলাম।’

আগুন নিভেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্দর ও নৌবাহিনীর বিশেষ টিম কাজ করার পরপরই ভোরের দিকে আগুনের তীব্রতা কমে গিয়েছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও আগুন নেভেনি। এখনো (সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট) আগুন জ¦লছে। গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়তো আগুন জ্বলতে থাকবে।

৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন বন্দরের : ক্যাপ্টেইন নিকোলাস ও এলপিজি সোফিয়ায় অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধানে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশ প্রণয়নে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর এম ফজলার রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিতে বন্দরের উপ-সংরক্ষক ফরিদুল আলম, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ডিজিএফআই, এনএসআই, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি ও কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এডুকেশনের ক্যাপ্টেন সাঈদ আহমেদ রয়েছেন।

এদিকে ‘ক্যাপ্টেইন নিকোলাস’ ও আরও একটি জাহাজ ‘গ্যাস জিএমএস’ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আজম জে চৌধুরী। অভিযোগে বলা হয়েছিল, জাহাজ দুটি ইরান থেকে পণ্য লোডিং করে চট্টগ্রামে এনেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল। সেই কমিটির সদস্যরা জাহাজ পরিদর্শন করে রিপোর্ট দিয়েছেন এ জাহাজ দুটি ইরান থেকে আসেনি।

উল্লেখ্য, সাগরে এলপিজি গ্যাস স্থানান্তর খুব ঝুঁকিপূর্ণ। পানির ঢেউ কেমন, বাতাসের গতিবেগ, তাপমাত্রা সবকিছু বিবেচনা করে শিপ টু শিপ পদ্ধতিতে গ্যাস ট্রান্সফার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া রাতের বেলা গ্যাস স্থানান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাহলে ওই রাতে কীভাবে স্থানান্তর করা হচ্ছিল এ বিষয়ে অন্য এক লাইটার জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, দিনের আলোতে দুই জাহাজের হোসপাইপ (যা দিয়ে গ্যাস স্থানান্তর হবে) সংযুক্তকরণের পর রাত পর্যন্ত গ্যাস স্থানান্তর করা যাবে। তবে রাতে নতুন করে হোসপাইপ লাগানো যাবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত