রাজবাড়ীতে পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক বিঘা কৃষিজমি ও বসতভিটা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাজার, মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, কৃষিজমিসহ কয়েকশ বসতবাড়ি। ভাঙনরোধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি প্রদান করা হয়েছে। এদিকে মধুমতী নদীর তীব্র ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ফরিদপুরের গোপালপুর, টগরবন্দ, পাচুড়িয়া ও বুড়াইচ ইউনিয়নের নদীপাড়ের হাজারো মানুষ। গত এক মাসে বিলীন হয়েছে দেড়শতাধিক বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং কয়েকশ একর ফসলি জমি। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি।
পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পদ্মায় ভাঙন : রাজবাড়ীর ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে পদ্মার স্রোত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্রোত বৃদ্ধির কারণে নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সীবাজার কাউলজানি এলাকা থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত এই ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই ভাঙছে ফসলি জমি। ভাঙনের কবলে পড়ে কয়েকটি পরিবার তাদের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। কবরস্থান, ঈদগাহের মাঠসহ বসতবাড়িগুলো ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
ভাঙনকবলিত ইয়াজুদ্দিন বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় ত্রিশ বছর ধরে নদীতে ভাঙন দেখছি। চারবার আমি বাড়ি ভেঙেছি। সবশেষে এখানে এসে বাড়ি করেছিলাম। এখন এটাও যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। গত ত্রিশ বছরে কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে। নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিরা এসে গায়ে হাত রেখে বলেন এবার আমাদের ভোট দেন। আমরা পাস করি। আমরা নদীশাসন করব। কিন্তু কোনো জনপ্রতিনিধিই তাদের কথা রাখেননি। নির্বাচন যাওয়ার পর আর কেউই আমাদের খবর নেন না। কাজী কেরামত আমাদের কতবার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ করেননি। আমরা তো তাদের কাছে কোনো কিছু চাই না। আমরা শুধু চাই নদীশাসন করুক, যাতে নদী না ভাঙে। হাজার হাজার বিঘা জমি আর মানুষের বাড়িঘর এই নদীতে ভেঙে গেছে। এই এলাকায় ভাঙনরোধে এক বস্তা বাল্ওু কেউ ফেলেনি। সব জমি নদীতে ভেঙে যাচ্ছে।’
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘জেলায় মোট ৫৭ কিলোমিটার নদীর তীর রয়েছে। গোয়ালন্দ উপজেলায় দেবগ্রাম ইউনিয়নে নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনরোধে জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ভাঙনরোধে কাজ করা হবে।’
মধুমতী নদীর তীব্র ভাঙনে দিশেহারা হাজারো মানুষ : ফরিদপুরের মধুমতী নদীর তীব্র ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ। নদীর দুই পাড়ে ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুলসহ বসতঘর ও ফসলি জমি। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীর পশ্চিম-পূর্বপাড়ের অনেকেই। নদী ভাঙনের কারণে সবকিছু হারিয়ে অনেকেই এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। মধুমতীর নদী ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, নদী ভাঙনরোধে কাজ শুরু হয়েছে।
ভাঙনকবলিত কাতলাসুর গ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেন বলেন, গত কয়েকদিনে এ গ্রামে ঘরবাড়িসহ প্রায় ২০ একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে হারিয়ে যেতে পারে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন।
নদীভাঙনের বিষয়ে স্থানীয় টগরবন্ধ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। ভাঙনকবলিত স্থানে অল্প কিছু বালুর বস্তা ফেলা হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। দায়সারাভাবে ফেলা হচ্ছে বালুর বস্তা। এ নিয়ে ভাঙনকবলিত মানুষের মধ্যে প্রচ- ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া ভাঙনকবলিত হয়ে যারা বসতবাড়ি হারিয়েছেন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
মধুমতী নদীর তীব্র ভাঙনের বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, মধুমতী নদীর ভাঙনকবলিত কিছুটা এলাকায় স্থায়ী বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী এলাকায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে মধুমতী নদীর অপর প্রান্তে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে বিষয়টি জানতে পেরেছি। দ্রুত ওই এলাকাগুলোতে ভাঙনরোধে জরুরিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
