উত্তীর্ণ শহীদ শিক্ষার্থীদের পরিবারে কান্না

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:০১ এএম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে নিহত হওয়ার আগে মাত্র পাঁচটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছিলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন। আন্দোলন ঘিরে দেশ জুড়ে অস্থির পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত হলে ঢাকায় মায়ের কাছে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

সেখান থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৮ জুলাই বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শাহরিয়ার। গুলি তার ডান চোখের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই মৃত্যু হয় শাহরিয়ারের।

রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সরকার স্থগিত হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তা বাতিল হয়ে যায়। এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে গতকাল মঙ্গলবার বাতিল হওয়া সেই এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এতে শাহরিয়ার জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার এমন ফলের খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওমরাহ করতে বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করা মা-বাবা ও বোন।

একইভাবে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকারের পতনের পর বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া মো. রায়হান। তিনি জিপিএ ২.৯২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

রায়হান নোয়াখালী সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব দুর্গানগর গ্রামের আমজাদ হাজী বাড়ির মো. মোজাম্মেল হোসেন ও আমেনা দম্পতির একমাত্র ছেলে। তিনি রাজধানীর গুলশান কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রায়হানের পরীক্ষার ফল জানতে পারে তার পরিবার। তার পাস করার খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের ফলের বিষয়ে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরের কথা হয় তার বাবা মোহাম্মদ আবদুল মতিনের সঙ্গে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ওমরাহ করতে এখন মদিনায় আছি। শাহরিয়ারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণের খবর পেয়ে আমরা আবেগে আপ্লুত হয়েছি। তার মা মমতাজ বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েছে। আমাদের সঙ্গে রয়েছে একমাত্র মেয়ে শেখ মুমতাহিনা বিনতে মতিন। সেও ভাইয়া ভাইয়া বলে চিৎকার করে কাঁদছে।’ আট বছর বয়সী মুমতাহিনা পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে।’

আবদুল মতিন আরও বলেন, ‘আমার ছেলের জন্য সবাইকে দোয়া করতে বলবেন। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই। আমার মতো বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করার যন্ত্রণা যেন আর কারও পেতে না হয়।’

গত ৫ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডায় বিজয় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মো. রায়হান। পরদিন দুপুরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন বাড্ডায় একটা বাড়িতে কেয়ারটেকারের চাকরি করতেন। রায়হান পাশেই একটা মেসে থাকতেন।

রায়হানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণের খবরের প্রতিক্রিয়ায় মা আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে নেই, তার এই ফল দিয়ে কী হবে? সে পাস করছে তা দিয়ে এখন কী করব। তার আরও ভালো রেজাল্ট করার কথা। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। নিজেরা না খেয়ে সন্তানকে খাইয়েছি। তাকে ঢাকায় পড়ালেখা করাইছি। ওর অনেক স্বপ্ন ছিল। সব স্বপ্ন বুলেটে শেষ হয়ে গেছে।’

গুলশান কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ এমএ কালাম বলেন, ‘আমাদের কলেজ থেকে এ বছর শহীদ রায়হানসহ ৩৯৪ জন বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। তার মধ্যে ৩৮১ জন পাস করেছে। রায়হান জিপিএ ২.৯২ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার ফল আরও ভালো হওয়ার কথা। কীভাবে এত খারাপ হলো তা আমাদের জানা নেই। তবে তার মৃত্যু আমাদের এখনো কাঁদায়। সরকার যেন তার পরিবারের পাশে থাকে সে আশা করছি।’

নাফিসার ফল শুনে কাঁদছেন বাবা-মা : এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে রয়েছেন আন্দোলনে শহীদ হওয়া নাফিসা হোসেন মারওয়া। তিনি জিপিএ ৪.২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করে শিক্ষার্থীরা যখন উল্লাস করছেন, তখন চিরনিদ্রায় শায়িত নাফিসা। নাফিসার এমন সাফল্যে কাঁদছেন তার মা-বাবা ও স্বজনরা। জানা যায়, বাসায় না জানিয়ে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিতেন কলেজ শিক্ষার্থী নাফিসা। ১৭ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী আন্দোলনে সবসময় ছিলেন সম্মুখসারিতে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন গত ৫ আগস্ট দুপুরে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন থানা রোডে পুলিশের গুলিতে মারা যান তিনি।

নাফিসার বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘মেয়ের যাতে লেখাপড়া নষ্ট না হয়, সেজন্য রান্না করতে দিতাম না। চায়ের দোকান দিয়ে যা উপার্জন করেছি, মারওয়ার লেখাপড়ায় দিয়েছি। মেয়ে আমাকে না জানিয়ে গত ১৮ জুলাই থেকে উত্তরায় যেত আন্দোলনে। সারা দিন দোকানে থাকায় খোঁজ পেতাম না। প্রতিবেশীর কাছে জেনে মেয়েকে ঘরে আটকাই। আন্দোলনে যাওয়া নিয়ে খুব রাগ করেছিলাম। তবে মেয়ে আমাকে ফাঁকি দিয়েছে। ৩ আগস্ট বলল, লেখাপড়া নেই, ঘরে থেকে দম বন্ধ লাগছে। সাভারে মামার বাসায় বেড়াতে যাবে। ভেবেছিলাম, সাভারে গেলে আন্দোলনে যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাভারের বক্তারপুরে মামার বাসায় গিয়ে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবার আন্দোলনে যায়। ৪ আগস্ট দুপুরে মেয়েকে ফোন করলে গোলাগুলির শব্দ শুনি। মেয়ে তখন বলে, আন্দোলনে আছি। আর পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট থানা রোডে যায় নাফিসা। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে। দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ফোনে বলল, শেখ হাসিনা পলাইছে। আব্বু, আমি গণভবন যামু। আজ আমারে বাধা দিও না। আমি বললাম, শেখ হাসিনা পলাইছে, তাতে তর বাপের কী! তর বাপে করে চায়ের দোকানদারি।’

আবুল হোসেন বলেন, ‘রাগ করে ফোন রেখে দিই। দুপুর ২টার দিকে মেয়ের ফোন থেকে এক ছেলে জানায়, আমার মেয়ের বুকে গুলি লাগছে। মেয়েটা সোয়া ২টার দিকে আমারে ফোন করে বলে, ‘আব্বু আমি মরে যামু। লাশটা নিও। এটাই মেয়ের শেষ কথা ছিল।’

প্রতিবেদনটি ফেনী, সাভার (ঢাকা) ও ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধির তথ্যে

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত