ইতিহাসে থাকুক সেই রিকশাও

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:০২ এএম

কখনো কখনো স্রেফ একটা ছবি হয়ে যায় ইতিহাসকে বর্ণনা করার মতো মহাশক্তিশালী নিদর্শন। তেমনি একটা ছবি নিয়েই আজকের আলাপ। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা ছিল খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষদের। এই যেমন ধরুন, ঢাকার রিকশাওয়ালাদের যে অদম্য সাহস এই আন্দোলনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে, সেটাও কিন্তু ইতিহাসের একটা অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে, যদি আমরা সেই সত্যি ঘটনাগুলো আমাদের বয়ানে ফুটিয়ে তুলতে পারি। তাদের অবদান ডিফাইন করতে গেলে, আলোকচিত্রী জীবন আহমেদের তোলা এই ছবিগুলো হবে সেলফ-এক্সপ্লেনেটরি। চব্বিশের ইতিহাসকে যদি সংরক্ষণ করতে হয়, তাহলে এই বিপ্লবের নানা স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে করে চলতে-ফিরতে এ স্মৃতিগুলো চিরভাস্বর হয়ে ধরা দিতে থাকে মানুষের চিন্তা ও মননে।

৪ আগস্টের ঘটনা। রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ তার রিকশায় একটা আহত নিস্তেজ ছেলের দেহ (পরবর্তীকালে সে মারা যায়) বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল হাসপাতালে। সে সময়েরই তোলা ছবি এটা। ১৭ বছর বয়সী নাফিস সবে বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছিল। ৪ আগস্ট সকালে সে রাজধানীর ফার্মগেটের দিকে আন্দোলনে যোগ দেয়। দুপুরের দিকে ফোনকলে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হলে জানায় সে নিরাপদ আছে। এরপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার পরিবারের লোকজন তাকে খুঁজতে বের হয়, কিন্তু কোনো খোঁজ মেলে না। ততক্ষণে আলোকচিত্রী জীবন আহমেদের তোলা ছবিটা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেলে তার পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারে এটা তাদেরই নাফিস। এরপর বিভিন্ন মর্গে খোঁজখবর নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে পাওয়া যায় তার লাশ।

ওইদিন ফার্মগেটের রোডে রিকশা চালাচ্ছিলেন নূর মোহাম্মদ। পুলিশ তাকে ডেকে ওই বডি তুলে নিতে বলে, তাদের নির্দেশ ছিল ঢাকা মেডিকেল কিংবা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নিয়ে কোথাও ফেলে দিতে। রিকশার ওপর ওভাবেই ফেলে রেখে নিয়ে যেতে বলেছিল পুলিশ। তবে নূর মোহাম্মদ সেটা না করে চেষ্টা করছিলেন ফার্মগেটে অবস্থিত হাসপাতালগুলোর কোনো একটাতে নিয়ে যেতে, তার ধারণা ছিল ছেলেটা হয়তো এতে প্রাণে বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু তখন ওই রোডে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ এবং যুবলীগ-ছাত্রলীগের প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছিল। কোনো হাসপাতালে নিতে দিচ্ছিল না তারা। কিছুক্ষণ পর একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ডেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন নূর মোহাম্মদ। কিন্তু ততক্ষণে বুঝতে পারেন নিশ্চিতভাবেই মারা গেছে নাফিস।

একটা ছেলের জীবন বাঁচাতে পুলিশ এবং লীগের কর্মীদের সম্মিলিত গোলাগুলির ময়দানের ভেতরও নিজের চেষ্টার সর্বোচ্চটুকু করে গেছেন রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ। তার নিজের জীবনেরও কিন্তু প্রচণ্ড ঝুঁকি ছিল, তবুও তিনি ওই মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ অন্যের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে গেছেন। শুধু এ ঘটনাই নয়, আপনাদের মনে থাকার কথা আন্দোলন চলাকালে বেশ কয়েক জায়গায় রিকশাচালকরা সম্মিলিতভাবে ছাত্রদের পক্ষ নিয়ে রাস্তায় সরকারবিরোধী সেøাগান দিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে। তাই এ মানুষগুলোর ত্যাগের গল্পও আমাদের এ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের অন্যতম স্মারক।

আমার একটা প্রস্তাব আছে। যেই রিকশায় করে এভাবে ঘাতকদের সামনে থেকে আন্দোলনকারীর লাশ এভাবে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ওই রিকশাটাকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত এবং সেটা দৃশ্যমান কোনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। এরকম নজির কিন্তু আছে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের সামনে মিশুক মুনীরের স্মৃতি সংরক্ষণে অ্যাকসিডেন্ট হওয়া মাইক্রোবাসটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

ঠিক একইভাবে এ রিকশাটা সংরক্ষণ করে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা যেই ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ নাফিসকে রিকশায় তোলা হয়েছিল, ওই জায়গায় দৃশ্যমানভাবে ঐতিহাসিক একটা স্মৃতি হিসেবে প্রদর্শন করে রাখা যেতে পারে।

আজ থেকে বহু দশক পরও একটা বাচ্চা ছেলে যখন বাবার হাত ধরে ওই রাস্তা দিয়ে যাবে, সে যেন পরম বিস্ময়ে তার বাবার কাছে জানতে চায় বাবা, এই রিকশাটা কেন এভাবে রাখা হয়েছে? তার বাবা যাতে তখন গর্বভরে তার ওই ছোট্ট বাচ্চাকে চব্বিশের ইতিহাস শোনাতে পারে।

বিপ্লবের মাহাত্ম্য এভাবে ছড়িয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ফ্যাসিবাদ কী এবং কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠলে কী পরিণতি হয়, সেই ধারণাও সমাজে জাগরূক থাকবে। আর চব্বিশের এ গণঅভ্যুত্থানে একেবারে রুট লেভেলের খেটেখাওয়া মানুষও কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই ইতিহাসও সবার চোখের সামনে থাকবে জীবন্ত একটা নিদর্শন হিসেবে।

এই ব্যাপারে কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়? একটু ভেবে দেখতে পারেন কিন্তু সবাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত