আইয়ুব বাচ্চু বলতেন ‘লাভ ইউ মাই বয়’

  • ব্যান্ডসংগীত আমজনতার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু
  • ১২টি ব্যান্ড, ১৫টি সলো ও একটি ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম করেছেন
  • তার গান গেয়েই নতুন ব্যান্ডগুলো মঞ্চের জন্য তৈরি হয়
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩২ পিএম

অনেক বছর হলো শোবিজে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি নেই। নেই নতুন গান, অ্যালবাম, কনসার্ট; এমনকি টিভিতেও তাকে দেখতে পান না কেউ। তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও হয় না। হয়তো তার স্টুডিও এবি কিচেনের নামও ভুলতে বসেছেন অনেকে। কিন্তু টিকে আছে তার গান; সাউন্ড। এখনো ‘দরজার ওপাশে’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘কেউ সুখী নয়’ শুনে আপ্লুত হন শ্রোতারা।

মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মারা যান আইয়ুব বাচ্চু। চার দশকের সংগীতজীবনে করেছেন অনেকগুলো স্মরণীয় কম্পোজিশন। আগলি বয়েজ, ফিলিংস, সোলস হয়ে এলআরবি এই ছিল তার পথচলা। অন্যদিকে সলো ক্যারিয়ার, বিজ্ঞাপন ও সিনেমায় দেখা গেছে ভিন্নরূপ।

অন্তত দুটি প্রজন্ম বড় হয়েছে তার সাউন্ডে। ফলে ইউটিউবে তার গাওয়া ‘প্রতিদান চাই না’র মতো আধুনিক বাংলা গানের নিচে কোনো শ্রোতা মন্তব্য করে রাখেন ‘যত দিন বাঙালি থাকবে, যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে এসব গান আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। ধন্যবাদ আমার শৈশব-কৈশোর রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য।’

আশ্চর্য হলেও সত্যি, মানুষ যখন চলে যায়, তখন তার কীর্তি ছাড়া সব মুছে যেতে থাকে। তাকে ধরে রাখে শুধু পরিবার। যদিও জীবদ্দশায় তারকাদের সব আয়োজন থাকে ভক্ত, আয়োজক, প্রযোজকদের লক্ষ করে। তবে আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু ব্যতিক্রমই ঘটছে। তার ভক্তরা চট্টগ্রামে যান কবর জিয়ারত করতে। থাকে অন্য আয়োজন। এর মধ্যে তৈরি হয়েছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনও।

এলআরবির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চু

জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডগুলো বা গায়করা আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে খুব কমই মন্তব্য করতেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর তাদের কণ্ঠে ‘মতামত’ ছাড়াও এলআরবি এবং আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। এমনিতে মফস্বলগুলোয় খুব কম কনসার্টই আছে, যেখানে তার গান গাওয়া হয় না। তার গান গেয়েই মঞ্চে তৈরি হতে হয় নতুন ব্যান্ডগুলোকে।

এলআরবির ১২টি অ্যালবামের পাশাপাশি ১৫টি সলো ও একটি ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম রেখে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। এ ছাড়া রয়েছে মিক্সড অ্যালবাম, সিনেমায় অজস্র গান। তার বিভিন্ন ধারার গানের শ্রোতা আলাদা, সাউন্ডও। কিন্তু গিটারকে সামনে নিয়ে আসায় যে ভূমিকা তিনি রেখে গেছেন, তা আরও অনেক দিন উত্তর প্রজন্মকে আলোড়িত করবে।

আইয়ুব বাচ্চুকে একদম প্রথম থেকে দেখেছেন গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। গায়কের প্রথম দিকের গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’ বা ‘কী জানি কী একদিন ছিল’ এবং এলআরবির ডেব্যু গান ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ তার লেখা।

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী বলেন, ‘আমি যখন “একদিন ঘুম ভাঙা শহরে” লিখি, ভাবতেই পারিনি এই গানটি দিয়ে এলআরবি পরিচিতি পাবে। বাচ্চু (আইয়ুব বাচ্চু) এটা প্রথমে সোলসের হয়ে টিভিতে গেয়েছিল। কিছুদিন পর সোলস ছেড়ে যাওয়ার সময় গানটি সে চেয়ে নেয়। পরে গানটি দিয়ে এলআরবির যাত্রা শুরু হয়। বাচ্চু এ দেশের ব্যান্ডসংগীতকে আমজনতার কাছে নিয়ে গিয়েছিল।’ এটা অসত্য নয়, দিনের শেষে এই আমজনতাই বাঁচিয়ে রাখবে আইয়ুব বাচ্চুকে।

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে লেখাটা শেষ করছি। জীবদ্দশায় তার কর্মকাণ্ড দেখে অনেক ক্রিটিসিজম করেছি। সেসব তার চোখে পড়ত না এমন নয়। কিন্তু তিনি কখনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করতেন, আবার যুক্ত করতেন এতটুকুই। মাঝে মাঝে মেজাজ ভালো থাকলে পঞ্চাশোর্ধ্ব কণ্ঠে বলতেন, লাভ ইউ মাই বয়!

আসলে বাংলাদেশে মিউজিক জার্নালিজমের বিষয় হিসেবে ওই সময় তার বিকল্প কেউ আমার সামনে ছিলেন না। এখনো নেই। কিন্তু আমরা যারা তার ক্রিটিসজম করি বা করেছি আমরা সব সময় তার অ্যাডমায়ারার ছিলাম। হয়তো এটা বুঝতেন বলেই তিনি কিছু বলতেন না। হয়তো জানতেন আমাদের ‘নিশিব্যস্ত মানুষ’ তিনিই বানিয়েছেন। দরজার চৌকাঠকে আমরাও পিঁড়ি বানাই। জেগে থাকি রুপালি রাতে। জানি না তাকে ছাড়া ঘুমন্ত শহর কেমন আছে।

লেখক: কবি, গণমাধ্যমকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত