প্রায় আড়াই মাস হতে চলল বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা একটি সামরিক বিমানে চেপে দিল্লিতে গিয়েছেন। তারপর থেকে তাকে আর এক মুহূর্তের জন্যও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার কোনো ছবি ‘লিক’ হয়নি, নানা কথিত ফোনালাপের অডিও ফাঁস হলেও সেগুলো যে তারই কণ্ঠস্বর, তারও কোনো প্রমাণ মেলেনি।
গতকাল শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা (বা তার সঙ্গে আসা ছোট বোন শেখ রেহানা) দিল্লিতে নামার পর থেকে সেখানে কীভাবে আছেন, কোথায় আছেন তা নিয়ে ভারত সরকারের মুখপাত্র, মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকরা এত দিন কিছু বলেননি। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ও পরোক্ষে এটুকু শুধু জানিয়েছে, তিনি এখনো ভারতেই অবস্থান করছেন এবং থাকবেন। অর্থাৎ শেখ হাসিনার আমিরাত বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাওয়ার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
দিল্লির সাউথ ব্লকের একজন শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার ধারণা, বেশ লম্বা সময়ের জন্যই শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকতে দিতে হবে এ বাস্তবতার জন্যই সরকার এখন ক্রমেই প্রস্তুত হচ্ছে।
তাহলে কি অতীতে যেভাবে তিব্বতি ধর্মগুরু দালাইলামা বা আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর স্ত্রী-সন্তানদের ভারত ‘পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম’ বা রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে দিল্লিতে বিবিসি বাংলা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তার ভিত্তিতে যে উত্তরটা পাওয়া যাচ্ছে, তা মোটামুটি এ রকম :
প্রথমত, ভারতের চোখে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা হলেন একজন ‘গেস্ট, বাট আন্ডার কমপালশন!’ অর্থাৎ তিনি রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত অতিথি, যাকে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছে। নিজ দেশে তার নিরাপত্তা বা সুরক্ষা বিপন্ন হয়ে উঠেছিল বলেই তিনি ভারতে এসেছেন, এটাও ভারত খুব ভালো করেই জানে। এখন এই ‘অতিথি’র স্ট্যাটাসেই তাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এ দেশে রেখে দেওয়া যেতে পারে ভারতের তাতে কোনো অসুবিধা নেই। দেশের পুরনো বন্ধু ও অতিথি হিসেবে তিনি সব প্রাপ্য সম্মানই পাবেন।
দ্বিতীয়ত, পরে পরিস্থিতি অন্যরকম হলে অন্যকিছু ভাবা যাবে; কিন্তু এই মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ভারতের নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নিজেও অ্যাসাইলামের জন্য কোনো আবেদন করেননি। কিন্তু যদি সত্যিই পরে সে রকম কোনো প্রস্তাব আসে, ভারত সরকার জানে এ ব্যাপারে দেশের সব দলই একমত হবে এবং শেখ হাসিনাকে অ্যাসাইলাম দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু এখনই আগ বাড়িয়ে এ রকম কোনো পদক্ষেপ দিল্লি নিতে চাইছে না। ফলে এক কথায় বলতে গেলে, আপাতত ভারত শেখ হাসিনাকে ‘আতিথেয়তা’ দিতে চাইছে, ‘আশ্রয়’ নয়।
ভারতে হাসিনা : কী জানি, কী জানি না?
গত আড়াই মাসে শেখ হাসিনার গতিবিধি নিয়ে ঠিক কতটুকু নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, আর কোনোগুলো নেহাতই জল্পনা বা গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে? বিবিসি বাংলার নিজস্ব অনুসন্ধান বলছে
৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর দু-তিন দিনের মধ্যেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এটাও নিশ্চিত। কারণ হিন্ডন মূলত ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি, সেখানে একজন ভিভিআইপি অতিথির লম্বা সময়ের জন্য থাকার কোনো সুব্যবস্থা নেই। শেখ হাসিনা যাতে প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো দেশে সফর করতে পারেন, এজন্য ভারত সরকার তাকে ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ (টিডি) দিয়েছে এই মর্মেও সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ভারত সরকার কিন্তু ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছে বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করেনি।
শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই আছেন, সরকার এটা কনফার্ম করলেও তিনি রাজধানী দিল্লিতেই আছেন কি না সেটা কিন্তু নিশ্চিত নয়। তিনি ঠিক কোথায় থাকতে পারেন, তা নিয়ে দু-রকম জল্পনা শোনা যাচ্ছে ক. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বাসভবনে তার সঙ্গেই শেখ হাসিনাকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে আর খ. দিল্লির কাছে উত্তরপ্রদেশের মিরাট বা হরিয়ানার মানেসরে একটি আধাসামরিক বাহিনীর অতিথিনিবাস বা ‘সেফ হাউজে’ তিনি থাকছেন।
বিবিসি বাংলা আভাস পেয়েছে, এর মধ্যে প্রথমটির কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু দ্বিতীয় জল্পনাটি সত্যি হলেও হতে পারে।
শেখ হাসিনাকে গত আড়াই মাসের মধ্যে দিল্লির বিখ্যাত লোদি গার্ডেনে মর্নিংওয়াক করতেও দেখা যায়নি, তিনি রাজধানীর কোনো সুপার স্টোরে কেনাকাটাও করতে যাননি। এসব দাবির সপক্ষে কেউ কোনো ছবিও দেখাতে পারেনি, কেউ তাকে ওসব জায়গায় নিজের চোখে দেখেছে এমন দাবি নিয়েও এগিয়ে আসেনি।
শেখ হাসিনার কাছ থেকে ভারত কী ধরনের ‘ডুজ অ্যান্ড ডোন্টস’ প্রত্যাশা করছে, তার কোনটা বলা উচিত বা কোনটা বলা উচিত নয় বলে মনে করছে এসব সেশনে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে তিনি জানিয়েছেন এবং তার কাছ থেকেও ‘নোটস’ নিয়েছেন বিবিসি এটাও নিশ্চিতভাবেই জানতে পেরেছে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অতিথি হিসেবে রেখে দেওয়াটাই কূটনৈতিক সমস্যার আপাতত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান বলেই দিল্লি মনে করছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির লেখক-গবেষক অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ‘যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অভ্যুত্থান হলো, তিনিই যদি ভারতে আশ্রয় পান, তাহলে সেটা দুই দেশের সম্পর্কে অবশ্যই অস্বস্তি বয়ে আনবে এবং সেই লক্ষণ আমরা এর মধ্যে দেখতেও পাচ্ছি।’
দিল্লি মনে করছে, তার চেয়ে বরং ভালো হবে শেখ হাসিনা এখন ‘যেভাবে আছেন, সেভাবেই থাকুন’ মানে সেটা ভারতের অতিথির মর্যাদায় এবং অবশ্যই যত দিন দরকার।
