রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচন কমিশন, দ্রব্যমূল্যসহ নানা বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার এবারের সংলাপে উঠে এসেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের নেতাকর্মীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দল নিষিদ্ধ করারও প্রস্তাব দিয়েছেন নেতারা।
গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দিনব্যাপী এই সংলাপে ১০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতারা অংশ নেন। তবে এবারের সংলাপে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ডাকা হয়নি। সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের পক্ষ থেকে দলটির ব্যাপারে আপত্তির কারণে তাদের আজকের সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এবারের সংলাপে আমন্ত্রণ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতারা। শেষ পর্যন্ত আশাহত হতে হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের।
রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এর আগে গত ৫ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণতন্ত্র মঞ্চ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টির সঙ্গে সংলাপে বসেন প্রধান উপদেষ্টা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর গত ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংলাপ হয়। সেই সংলাপে জাতীয় পার্টিকে ডাকা হয়। তবে এ দফায় এখনো দলটিকে আলোচনায় ডাকা হয়নি।
এলডিপির সঙ্গে সংলাপ : গণফোরামকে দিয়ে গতকাল বেলা ৩টায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়। সংলাপ শেষে দলটির সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু সাংবাদিকদের বলেন, সংলাপে সংবিধান, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন কথা বলেছেন। আমরা সংলাপে বাজারে পরিস্থিতি নিয়ে জোর দিয়েছি। সিন্ডিকেটকে অবশ্যই ভাঙতে হবে।
মোস্তফা মহসীন বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার ও তাদের বিদেশি এজেন্টরা বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, তাদের থেকে উদ্ধারের জন্য আমাদের সবাইকে জাতীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
গণফোরাম অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চায় জানিয়ে মোস্তফা মহসীন বলেন, ‘সবাইকে একমত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এ সরকার জনগণের সরকার। এ সরকারকে রক্ষার স্বার্থে; অর্থাৎ আমাদের নিজেদের রক্ষার স্বার্থে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে।’
গণফোরামের এই নেতা বলেন, ‘আমরা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করব। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) যেকোনো বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা চাইবেন। আমরা যেটা উপলব্ধি করব, সেটাই পরামর্শ দেব। জনগণের জন্য দরজা খোলা আছে বলে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন।’
নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা মহসীন বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন করতে হবে। এটার জন্য সার্চ কমিটি বা কিছু করার প্রয়োজন আছে, ভালো লোক নিয়োগ দেওয়ার দরকার আছে। যাতে অতীতের মতো কোনো সমস্যা না হয়।
রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে মোস্তফা মহসীন বলেন, ‘আমরা কোনো তারিখ উল্লেখ করিনি। বলেছি, সংস্কার শেষ দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য।’
সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে আলোচনা করে লিখিত আকারে দেব। বলেছি, সংস্কার শেষে অতিদ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য। তবে সংস্কার শেষ না হলে সবই এক হবে। নির্বাচনের আগে থাকি রাম, নির্বাচনের পরে হই রাবণ। ওই ধরনের নির্বাচন কমিশন চাই না। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন চাই।’
আটটি দিবস বাতিল করা হয়েছে, এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে মোস্তফা মহসীন বলেন, জাতীয় দিবস ছাড়া কোনো দিবসই রাখা উচিত নয়।
এই সংলাপে গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন গণফোরামের সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু, কো-চেয়ারম্যান এসএম আলতাফ হোসেন, সুব্রত চৌধুরী, সদস্য সচিব মিজানুর রহমান, সদস্য এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, মহিউদ্দিন আবদুল কাদের, মোশতাক আহমেদ ও সুরাইয়া বেগম।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধসহ ২৩ দফা প্রস্তাব এলডিপির : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের পাশাপাশি লিখিতভাবে ২৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)।
সংলাপ শেষে দলটির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সাংবাদিকদের এই তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘যারা আমাদের ছেলেমেয়েদের হত্যা করেছে, তারা কি আমাদের দুলাভাই। তাদের আমরা নরম বিছানায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেব।’
এলডিপি প্রেসিডেন্ট বলেন, নির্বাচন করে করবেন কি? সব চোর-ডাকাত যদি থেকে যায়। যারাই দুর্নীতি করেছে তাদের বিচার করতে হবে। যারা আমার ছেলেমেয়েদের হত্যা করেছে, তাদের বিচার করতে হবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। যারা জনগণের টাকা লুণ্ঠন করেছে, তাদের থেকে সেই টাকাগুলো নিয়ে আসতে হবে। তারপর নির্বাচন করেন।
আওয়ামী লীগ আমলে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওদের তো ফাঁসি দিয়েছেন, এখন আওয়ামী লীগকে ফাঁসি দিতে হবে। জামায়াতকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, এখন আওয়ামী লীগকে ফাঁসি দেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা আমরা সবাই, পুরো জাতি একটা যুদ্ধের মধ্যে গেলাম জুলাই-আগস্ট মাসে। এ যুদ্ধটা কার বিরুদ্ধে হলো, এ যুদ্ধটা হলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা কেন হলো, তারা পুলিশকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে, প্রশাসনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে, জনগণের মুখোমুখি করে দিয়েছে। দেশকে ধ্বংসের দিকে ঢেলে দিয়েছে। আমাদের বহু ছেলেমেয়ে হতাহত হয়েছে। প্রায় দেড় হাজারের বেশি ছেলেমেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। অনেকে বলে আরও বেশি হবে, যেগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৫-২০ হাজারের বেশি বিভিন্নভাবে আহত হয়েছে।
কর্নেল (অব.) অলি বলেন, আজকে কী কারণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে না? আজকে আমরা আবার বলেছি, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ ১৮ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তারা সবাইকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। শেষপর্যন্ত তারা জনতার চাপে টিকে থাকতে পারেনি, ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূসকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘আমরা বলেছি সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যান। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। কারণ এটা একটা ওয়ারটাইম সরকারের মতো। এটা পিস টাইম সরকার না। ওয়ার টাইম সরকারকে যা করতে হয়, কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। এখানে সহজ-সরলভাবে কিছু করার অবকাশ নেই। যারা অন্যায় করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।’
তিনি বলেন, হাসিনার যারা কট্টর সমর্থক ছিল, তাদের চাকরিচ্যুত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে জেলে নিক্ষেপ করতে হবে। আওয়ামী লীগের যারা সমর্থক ছিল, তারা এখনো শেখ হাসিনাকে সাহায্য করছে। তারা চিহ্নিত, তাদের চিহ্নিত করার কোনো প্রয়োজন নেই।
২৩ দফা প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়ে অলি আহমদ বলেন, ‘এসব প্রস্তাব বাংলাদেশের জনগণের জন্য যা প্রয়োজন, সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন, সুন্দর প্রশাসন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য, গরিব মেহনতি মানুষ যারা দ্রব্যমূল্যের কারণে কষ্ট পাচ্ছে, তাদের সুবিধার জন্য এ পয়েন্টগুলো আমরা দিয়েছি।’
গণহত্যায় জড়িত দলগুলোকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখা উচিত : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপ শেষে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগসহ যেসব দল গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের রাজনীতির সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তবে দলগুলো নিষিদ্ধ হবে কি না এটি বিচারের বিষয়। কিন্তু সে পর্যন্ত এই দলগুলোকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা উচিত।
তিনি বলেন, সংস্কার নির্বাচনমুখী হতে হবে। যেসব সংস্কার নির্বাচিত সরকারের করা উচিত সে ধরনের সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের হাত দেওয়া ঠিক হবে না। নির্বাচন কমিশন সংস্কারে পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করতে হবে। যাতে সংস্কার কমিশনগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পরামর্শ দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। দেশ থেকে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা এ সরকারের দায়িত্ব। এ সময় আওয়ামী লীগের আমলে করা তিনটি নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা যায় কি না সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এবারের সংলাপে আরও যেসব রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নিয়েছিল, তারা হলো জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, বিজেপি, ১২-দলীয় জোট, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ (শরীফ, নুরুল, আম্বিয়া), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট ও গণতান্ত্রিক বাম এক্য।
