পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিতে নতুন কমিশন নিয়োগের কিছুদিন পর গত ৩ সেপ্টেম্বর নাসিরউদ্দিন নামে ফেনীর একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী আমরণ অনশন শুরু করেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এসইসি ভবনের সামনে নিজের দুই ছোট বাচ্চাকে নিয়ে অনশনে এসেছিলেন তিনি। তার দাবি, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। নিজের সম্পদ বিক্রির পাশাপাশি ধার-দেনা করে তিনি পুঁজিবাজারের মৌলভিত্তি ও লিক্যুইড শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেসব শেয়ারে তিনি বড় ধরনের লোকসান করে এখন সর্বস্বান্ত। ধারের টাকা পরিশোধের সামর্থ্যও তার নেই।
নাসিরউদ্দিনের মতো এমন পরিস্থিতি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থাকা লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর। গত প্রায় দেড় দশক ধরেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান-কমিশনাররা বাজার কারসাজিকারকদের সঙ্গে মিলে বিনিয়োগকারীদের এমন সর্বনাশ ঘটিয়েছেন। দুর্বল ও নামসর্বস্ব কোম্পানি তালিকাভুক্তি ও এসব কোম্পানির শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটে নেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে নাসিরউদ্দিন ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এসইসির সাবেক চেয়ারম্যানের শাস্তির দাবিও জানান তিনি।
দেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে প্রচলিত শব্দ ‘আস্থাহীনতা’। বিনিয়োগকারীদের এই আস্থাহীনতা দূর করার জন্য ২০১০ সালের ধসের পর এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামও নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন, দেখিয়েছেন। কিন্তু ড. খায়রুল হোসেনের দুর্বল আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) অনুমোদন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতের কারসাজিকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় পুঁজিবাজারের ‘আস্থা’ যেন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকার গঠনের পর শিবলী রুবাইয়াতের পদত্যাগের পর নতুন সম্ভাবনায় মৌলভিত্তির কোনো পরিবর্তন না হলেও পুঁজিবাজারে উল্লম্ফন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর মাত্র চার কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ১৫ শতাংশ বেড়ে ছয় হাজার পার হয়ে যায়। কিন্তু নতুন কমিশন গঠনের পর ধারাবাহিক দরপতনে বাজার আবার সরকার পতনের আগের দিনের অবস্থানে ফিরে এসেছে। গত দুই মাস ধরেই বিরতি দিয়ে দরপতন হচ্ছে। আবারও ফিরে এসেছে আস্থাহীনতা।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠনের পর আবারও সেই আস্থাহীনতা ফিরে এসেছে। শুরুতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির দায়ে ৪২৯ কোটি টাকা জরিমানা করে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বাজারে উল্টো আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরের অনিয়ম, কারসাজির তদন্তে একযোগে ১২টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন তদন্তের ঘোষণা দেওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতি ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার ছেড়ে দিচ্ছেন অথবা সাইডলাইনে ফিরে গেছেন। এতে করে বিনিয়োগ কমে গিয়ে পুঁজিবাজার ধারাবাহিক দরপতনে পড়েছে।
এ বিষয়ে এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আস্থাহীনতা দূর করতে হলে আইন কার্যকর করতে হবে। বাজারে যে কারসাজি বা ম্যানপুলেশন, সার্কুলার ট্রেডিং হয়, এসব যদি বন্ধ করা যায়, সুশাসন যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আস্থা তৈরি হবে। যাদের তালিকাভুক্ত করা হবে তারা যদি উপযুক্ত কোম্পানি হয়, তাহলে মানের উন্নয়ন হবে। এটা তো রাতারাতি করা যাবে না, সময় লাগবে। বর্তমান রেগুলেটরের যে সমস্যা তারা এটা রাতারাতি করতে চাচ্ছেন। দ্রুত অ্যাকশন নিতে চাচ্ছেন। দ্রুত অ্যাকশন নিতে গিয়ে বাজারে একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে, একটা ভুল সংকেত যাচ্ছে। তারা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো নেওয়া উচিত, কিন্তু আমার মনে হয় মার্কেট প্লেয়ারদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সুসম্পর্কের মাধ্যমে একটু সময় নিয়ে এসব করা উচিত। শুধু আইনি ব্যবস্থা নিলে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে, যা কাম্য নয়। মোট কথা মার্কেট প্লেয়ার, ব্রোকার, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিসহ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু করতে হবে। তবে শেষ কথা হচ্ছে, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা করতে পারস্পরিক সমঝোতা, মতৈক্যের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে ওঠানামা থাকবেই। বাজার তার নিজস্ব শক্তিতেই ফিরে আসবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে আমরা ইতিমধ্যেই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি, তাদের পরামর্শ নিচ্ছি। এ ছাড়া পুঁজিবাজার সংস্কারে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিত ও বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা দূর হবে।’
ডিএসইর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিয়োগের পর থেকে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ১১ শতাংশ কমে ৫২৫৭ পয়েন্টে নেমে এসেছে। লেনদেনও অর্ধেক কমে ৩০০ কোটি টাকায় নেমেছে। ইতিমধ্যেই অনেক শেয়ারের দাম কমায় অনেক বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ফোর্সড সেলের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই দুর্বল মৌলভিত্তির। ইতিমধ্যেই অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে পালিয়ে গেছেন। অনেক কোম্পানি বন্ধ, লোকসানি। এসব কোম্পানিই বিগত বছরগুলোয় কারসাজি হয়েছে সবচেয়ে বেশি এবং ক্ষতিও বেশি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। আবার মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে পরিচিত স্কয়ার ফার্মা, বিএটিবিসি, গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করেও বিপুল লোকসানে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বছরের পর বছর এসব শেয়ারে বিনিয়োগ ধরে রেখেও লোকসান এড়ানো যায়নি।
আবার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পুঁজিবাজারকে অধোগতিতে ঠেলে দিয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। এ কারণে গত কয়েক বছরে মৌলভিত্তির শেয়ারগুলোর লাগাতার দাম কমায় বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়েছেন। স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। কারণ ব্যাংক, এনবিএফআই, বীমা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিসহ সব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও পুঁজিবাজারে লোকসানে রয়েছে। মার্জিন ঋণের কারণে ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই এখন জরিমানার আতঙ্কে রয়েছেন। অনেকেই সাইডলাইনে চলে গেছেন, বাকিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা বিগত সময়ে পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহজ ঋণ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) অনৈতিক সুবিধার কারণে ভালো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে অনীহা দেখায়। সরকারও কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি। ১৫ বছরেরও বেশি সময় অন্তত ৪০টি সরকারি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার কথা জানালেও তাদের আনতে পারেনি।
একটি দেশের অর্থনীতির জন্য পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের সরকারগুলোও এ বাজারকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেয়। এ কারণে বিগত সময়ে দেশের অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি পুঁজিবাজার। বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, পুঁজিবাজার পরিস্থিতি দুর্বল থাকায় এ খাত থেকে টাকার জোগান অনেক কম। বর্তমানে দেশে যত পুঁজির জোগান দেওয়া হয়, তার মাত্র ২-৩ শতাংশ যায় পুঁজিবাজার থেকে। এজন্য সরকারেরও মাথাব্যথা নেই। গত কয়েক দশক ধরে এ বাজার থেকে শুধু লুটই হয়েছে। গত ১৫ বছরে সরকার যেসব কমিশন নিয়োগ দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই পুঁজিবাজার বিষয়ে ভালো ধারণা ছিল না। এবারও একই ধরনের ব্যক্তিদের কমিশনে আনা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আপত্তি উঠেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করছেন।
