পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে সমিতির আন্দোলনকারীদের যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। দুই দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন নিয়ে সমিতির কর্মীদের সঙ্গে আরইবি কর্তৃপক্ষের এ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এর জের ধরে চাকরিচ্যুতি, মামলা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে শনিবার ঢাকায় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের পর গতকাল অন্তত সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করেছে আরইবি। সমিতির যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তারাসহ আরও অনেকে ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে দাপ্তরিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান হুঁশিয়ার করে বলেছেন, কেউ চাকরি না করলে সেখানে বিকল্প লোক নিয়োগ দেওয়া হবে।
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আন্দোলনের বিষয়ে সরকার ও আরইবি যে এখন বেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তা মনে করছেন অনেকেই। আরইবি ও পল্লীবিদ্যুতের দ্বন্দ্বের কারণে শেষ পর্যন্ত গ্রাহককেই যে ভোগান্তি পোহাতে হবে, সেই আশঙ্কা থেকেই যায়। যদিও সরকার বলছে, বিদ্যুৎসেবা জরুরি জনসম্পৃক্ত বিষয়, কোনোভাবেই এর ব্যত্যয় হতে দেওয়া হবে না।
আরইবির অধীনে ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। দেশের ৪ কোটি ৭২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ গ্রাহকই আরইবির অধীন। আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি একীভূতকরণ এবং অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নসহ চুক্তিভিত্তিক ও অনিয়মিত কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে প্রায় ১০ মাস ধরে কর্মবিরতিসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছিলেন সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আগস্টের শেষদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করার পর বৃহস্পতিবার আরইবি কর্তৃপক্ষ সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত এবং মামলার পর ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে ৬১টিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় আন্দোলনকারীরা। এতে ৩৩ জেলার প্রায় দুই কোটি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
গত বুধবার থেকে এখন পর্যন্ত পল্লীবিদ্যুতের ২৪ কর্মীকে চাকরিচ্যুত ও দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ঢাকা ও কুমিল্লায় ১৭১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে আরইবি। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৬ জন, যাদের মধ্যে ছয়জনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
আরইবির পক্ষ থেকে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, সমিতির কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছেন। গত সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালীদের মদদে বিদ্যুৎ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
পল্লীবিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক মো. সালাউদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ন্যায্য দাবি আদায়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করার একপর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ^াসে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেয় আরইবি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন পল্লীবিদ্যুতের কর্মীরা।
গত বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারীরা জানিয়েছিলেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমের সঙ্গে রবিবার বৈঠক হবে। সেখানে তারা সুষ্ঠু সমাধান পাওয়ার আশায় আন্দোলন স্থগিত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করেছেন। বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে ওইদিন মাহফুজ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে তাদের (পল্লীবিদ্যুতের) কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে, বাকিগুলোর বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। যেকোনো দাবি জানানোর জন্য সরকারের দরজা সবসময় খোলা রয়েছে। আমরা যেটা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি, সেটা মাঠে না গড়ানোই ভালো।’
তবে গতকাল ওই বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। আন্দোলনকারীদের দাবি, তারা আলোচনায় বসতে রাজি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকের বিষয়ে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তা বাতিল হয়েছে। পরে বৈঠকটি হবে বলে এখনো আশা করেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে মাহফুজ আলমকে গতকাল একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে ঠিক কী কারণে বৈঠকটি বাতিল হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি দেশ রূপান্তর।
৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্ট্যান্ড রিলিজ : আগের দুই দফা দাবির পাশাপাশি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল, মামলা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
এরপর গতকাল সমিতির সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বদলি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অফিস আদেশে কাজের স্বার্থে ও জনস্বার্থে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে আরইবি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, এ সংকট তৈরি হয়েছে মূলত আরইবির স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে। ‘শাটডাউন’-এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পাশাপাশি আরইবি সংস্কার দাবি করে তারা বলেন, সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র সমন্বয়কসহ স্বাধীন কমিশন গঠন করা পল্লীবিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
জ্বালানি উপদেষ্টা যা বললেন : আরইবি ও পল্লীবিদ্যুতের মধ্যে চলমান সংকট নিয়ে গতকাল জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পল্লীবিদ্যুতে যারা আন্দোলন করছেন তাদের কেউ যদি মনে করেন তিনি চাকরি করবেন না তাহলে সেখানে অন্য লোক দেওয়া হবে। আমাদের বিকল্প লোক রেডি আছে। জনগণকে বিদ্যুৎ দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকার যেভাবেই হোক, সেটা এটা পালন করবে।’
ঢাকায় এক অনুষ্ঠানের পর তিনি আরও বলেন, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির যৌক্তিক দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী করার যে দাবি তুলেছে, সেটা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। হুট করে কোনো ঘোষণা দেওয়া যায় না। এখানে আর্থিক সংশ্লেষ আছে।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্ল্যাক আউটের ঝুঁকিতে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কাজ কাউকে করতে দেওয়া হবে না। কেউ নাশকতার চেষ্টা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মীরা যা করেছে সেটা অন্যায়। বিদ্যুৎ বন্ধ করা বেআইনি ও অন্যায়। আশা করব, তারা এসব কাজ থেকে সরে আসবে।’
