বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ বা ‘বড় মুক্তা’ বাংলাদেশ উপকূলে আসছে না। কার্তিক মাসের ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলেই আঘাত হানতে পারে। তবে এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় টানা বর্ষণ হতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আজ মঙ্গলবার তা নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর আগামীকাল বুধবার ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে গত রবিবার সন্ধ্যায় সৃষ্ট লঘুচাপটি আরও ঘনীভূত হয়েছে উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকালে লঘুচাপটি নিম্নচাপে রূপ নিতে পারে। এরপর গভীর নিম্নচাপ ও পরে ঘূর্ণিঝড় হিসেবে তৈরি হতে আরও একদিন সময় লাগতে পারে। তবে ঝড়ে রূপ নেওয়ার সময় তা উপকূলের খুব কাছাকাছি চলে আসবে বলে বেশি শক্তিসঞ্চয় করার সময় পাবে না।’
ঝড়টি কোন দিকে যেতে পারে জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, নিম্নচাপ সৃষ্টির আগে ঝড়ের গতিবিধি নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তারপরও আবহাওয়াবিষয়ক বিভিন্ন মডেল পর্যালোচনা করে দেখা যায় এখন পর্যন্ত তা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে যেতে পারে।
হাফিজুর রহমানের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে। ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের সতর্ক বার্তায় জানায়, ঘূর্ণিঝড়টি বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। এ সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮৮ থেকে ১১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে মঙ্গলবার তা নিম্নচাপে ও বুধবার ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে।
কামরুল ইসলাম বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। আসন্ন ঝড়টির পূর্বাভাস বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিম্নচাপ থেকে ঝড়ে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য ঝড়টি খুব কম সময় পাচ্ছে। আর এই কম সময়ের কারণে ঝড়টি সাগরে সঞ্চিত হয়ে শক্তিশালী হতে পারবে না এবং বাঁক নেওয়ার সময়ও পাবে না। যেহেতু বাঁক নিতে পারছে না, তাই বর্তমান গতিপথে মনে হচ্ছে তা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে যাচ্ছে।
কিন্তু তা কি বাংলাদেশ উপকূলে আসতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ঝড়টি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার পরপরই যদি ডান দিকে টার্ন নিয়ে নেয় তাহলে এটি পুরোপুরি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা (খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা প্রভৃতি এলাকা) দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। তবে এই শঙ্কা খুব কম।’
তবে ডান দিকে টার্ন নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে আবহাওয়াবিদরা জানান। তাদের মতে, সম্প্রতি বিদায় নিয়েছে মৌসুমি বায়ু। এর প্রভাবে স্থলভাগ থেকে বাতাসের গতিবেগ সাগরের দিকে ধাক্কা দেওয়ার একটি শক্তি কাজ করছে। এই শক্তির কারণে উত্তর গোলার্ধে (বাংলাদেশ এই গোলার্ধে) বাতাস ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরে বলে ঝড়টি দক্ষিণে ধাক্কা খাবে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দিকে আঘাত করতে পারে।
বছরের এ সময়ের ঘূর্ণিঝড়গুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের দিকেই বেশি আঘাত করে জানিয়ে ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘সাগরের ঝড়টি যেহেতু উপকূলের খুব কাছাকাছি এসে ঝড়ে রূপ নিচ্ছে, তাই আর টার্ন নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। বিভিন্ন মডেল উপাত্তে ধারণা করা যাচ্ছে ঝড়টি ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে অতিক্রম করতে পারে।
বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত না করলেও এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত হতে পারে উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার দেশের উপকূলীয় এলাকায় টানা বর্ষণ হতে পারে।’
বঙ্গোপসাগরে প্রাক বর্ষা মৌসুম (এপ্রিল-মে) ও প্রি বর্ষা মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। ১৮৯১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত অক্টোবর মাসে বঙ্গোপসাগরে ৯৪টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যে ১৯টি ঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করা ঝড়গুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ওপর দিয়ে গিয়েছে। গত বছরের এ সময়ে তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। এর মধ্যে অক্টোবরে ‘হামুন’, নভেম্বরে ‘মিধিলি’র পর ডিসেম্বরে ‘মিগজাউম’ নামের তিনটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছিল।
