ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের ডকট্রিন ‘ইসরায়েলিজম’

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০৫ এএম

জেরুজালেমে একটি মিলনায়তনের আলো নিভে আসছে। এখানে ইসরায়েল সরকারের অর্থায়নে একটি অনুষ্ঠানে আমেরিকান ইহুদি তরুণ-তরুণী জড়ো হয়েছেন। গানের তালে তালে নাচ চলছে। গানের সঙ্গে চলতে থাকা একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যাচ্ছে, সবুজ তৃণভূমির ওপর দিয়ে ট্যাংক এগিয়ে যাচ্ছে; সূর্যের রক্তিম আভা স্পষ্ট, আর আকাশে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উর্দি গায়ে চাপানো তরুণ-তরুণীরা রণবাদ্যের তালে বিমোহিত। ভিডিওচিত্রে একজন বয়স্ক মানুষ বলছিলেন, ‘অ-ইহুদিরা আমাদের মোহমুগ্ধ অনুভূতি এবং ইসরায়েলকে ঘিরে আমাদের আবেগ বুঝতে পারবে না।’ পরে এই বয়সী মানুষটির পরিচয় জানা গেল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূলে কাজ করা সংস্থা ‘অ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ (এডিএল)’-এর পরিচালক অ্যাব্রাহাম ফক্সম্যান। ভিডিওতে এক তরুণীর কণ্ঠে শোনা গেল, ‘ইসরায়েলি সেনারা উষ্ণ, অসাধারণ; তারা শক্তিশালী। তারা সে রকম সবকিছু, যা আমরা হতে চাই।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অতর্কিত ইসরায়েল আক্রমণে এক হাজার ১৩৯ জন নিহত হওয়ার এক বছর পার হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বছরব্যাপী অব্যাহত ইসরায়েলি নৃশংসতায় গাজা উপত্যকায় ৪২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্য ১৬ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে। ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে অস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যা দিয়ে ইসরায়েল অঞ্চলটিকে রীতিমতো ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর গাজা এবং ইউক্রেনে চলতি যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের অবস্থান বৈসাদৃশ্যপূর্ণ, কারণ  ইসরায়েল তার মিত্র এবং রাশিয়া শত্রু। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের কারণ কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক। তবে এর বাইরেও আমেরিকায় আবেগসর্বস্ব, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রতি দেশটির গভীর সমর্থন বারবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষত, আমেরিকান ইহুদিরা এই সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকে।

জেরুজালেমের ওই মিলনায়তনের ভিডিওচিত্রটি মূলত একটি প্রামাণ্যচিত্রের দৃশ্য, যা নির্মিত হয় গত ৭ অক্টোবরের আগে। ‘ইসরায়েলিজম’ শীর্ষক ডকুফিল্মটির বড় অংশে উঠে এসেছে ‘বার্থরাইট ইসরায়েল ফাউন্ডেশন’-এর কর্মকাণ্ড, যাদের কাজই হলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের বিনামূল্যে ইসরায়ল ভ্রমণ করানো। সামগ্রিকভাবে প্রামাণ্যচিত্রটি ফিলিস্তিনিদের দেশহারা করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রপাগান্ডা মেশিন কীভাবে কাজ করে, তা উন্মোচন করেছে। ডকুফিল্মটিতে দুজন আমেরিকান ইহুদির চিন্তা রূপান্তরের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তাদের একজন সিমোন জিমারম্যান, লস অ্যাঞ্জেলেসে বড় হয়েছেন। ইহুদি স্কুলের পড়াশুনা শেষে কিছুদিন ইসরায়েলে বসবাসও করেন তিনি। এমন একটি পরিবেশে তিনি শৈশব থেকে বড় হয়েছেন যেখানে ইসরায়েলের প্রতি ভালোবাসার পাঠ দেওয়া হয়। অন্যজন হলেন এইটান, যিনি একসময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। এইটান বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে শুনেছেন,  ইসরায়েল যে ভূমিতে সেই জায়গাটি ‘আমাদের’। তার ভাষ্য, ছোটবেলা থেকে আমার দেশরক্ষার মানসিকতা গড়ে উঠছিল। ফিল্মে দেখা যায়, শৈশবের বিদ্যাশিক্ষাজাত চিন্তায় দুজনেরই চিন্তাভাবনার পরিবর্তন আসে।

তরুণী জিমারম্যানকে শেখানো হতো, ইসরায়েলকে সেবা করার অনেক পথ রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া যেতে পারে। আবার অন্যভাবেও লড়াই করা যায়। একবার ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কসভায় ইসরায়েলকে সমর্থনে কথা বলতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি শুনলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের পরিবারের ওপর বোমা ফেলা হয়, তল্লাশি চৌকিতে ফিলিস্তিনিদের প্রহার করা হয়। এ সময় তার মনে হয়েছিল, তিনি কেবল কয়েক ঘণ্টার আলাপ শুনে ইসরায়েলি দখলদারির ভেতরের জীবন সম্পর্কে বুঝতে পারবেন না এবং এসব অভিযোগকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না।

জিমারম্যান ক্যাম্পাসভিত্তিক সবচেয়ে বড় ইহুদি সংগঠন ‘হিলেল’-এ ফিরে এলেন। ইসরায়েল সরকারের অর্থায়নপুষ্ট অনেক ফেলো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছেন, যারা এর সঙ্গে যুক্ত। এখানে যেন তিনি এক প্রকারের নীরবতাকে সঙ্গে করে এনেছেন। জিমারম্যানের ভাষ্য, ‘ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে কঠিন কঠিন সেই প্রশ্নগুলো তুলতে অনেকেই ভয় পায়, যেগুলো আমাদের সামনে ছুড়ে দেওয়া হয়।’ পরবর্তী সময়ে এই তরুণী পশ্চিম তীরে যান ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলতে। পশ্চিম তীরে তার এই ভ্রমণ তার শৈশবের চিন্তা থেকে তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তার এই পরিবর্তন তার সম্প্রদায়ের মধ্যে তাকে বেশ বিপাকেই ফেলেছে। স্বজাত্যের প্রতি ঘৃণাপোষণকারী একজন হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাকে ইহুদিবিদ্বেষী ইহুদি হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো ‘ইসরায়েলিজম’ তার এই চিন্তাগত পরিবর্তনকে ‘আলো ও সত্যের’ দিকের অভিযাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

অন্যদিকে, এইটানের পরিবর্তন প্রক্রিয়াটা ভয়ংকর এক বিবর্তনের মতো। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাকে নিযুক্ত করা হয় কোনো এক পাহাড়ের শীর্ষে। পশ্চিম তীরের অবৈধ ইহুদি বসতি রক্ষার জন্যই তাকে মোতায়েন করা হয়। বলে রাখা ভালো, পশ্চিম তীরে এই মুহূর্তে ৭ লাখ ইসরায়েলি দখলদার বসতি গেড়ে রয়েছে। দখলদারি ছাড়াও আরও নির্মম কিছুর সাক্ষী এইটান। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তরুণ এক ফিলিস্তিনিকে মারধরের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমার কমান্ডার কিছু বলছিল না। আমিও কথা বলতে পারছিলাম না। আমি যতটা সময় সেনাবাহিনীতে ছিলাম, সেই ক্ষুদ্র সময়ের অনেক ঘটনার মাত্র একটি এটি।’ তিনি জানান, ঘটনাটি প্রথম যেদিন তিনি সামনে আনেন, সেদিন অনেক কেঁদেছিলেন।

দুই আমেরিকান ইহুদির চিন্তাজগতের পরিবর্তনকে তুলে আনার ব্যাপারটি ডকুফিল্মের আধেয় হিসেবে চিত্রায়ণের কারিগর দুজন। একজন হলেন এরিন অ্যালেক্সম্যান এবং আরেকজন স্যাম এইলার্স্টেন। যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যে বিদ্বেষের আবহের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ অ্যালেক্সম্যান, অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষমতায়িত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করার উৎসাহ খুঁজে পান। এই নির্মাতা বলেন, ‘একজন তরুণ হিসেবে ইহুদি লোকজন কী ধরনের দুর্বিষহ অবস্থা সহ্য করেছে তা কল্পনা করা কঠিন ও বেদনাদায়ক। আমি যখন ইসরায়েল সম্পর্কে জানা শুরু করলাম, তখন বুঝলাম, ইসরায়েল হলো, সুড়ঙ্গের শেষ আলোর রেখা। অনেক নিপীড়নের পর আমরা আমাদের পিতৃভূমিতে ফিরলাম এবং আমরা প্রচ- শক্তিশালী হলাম।’ কিন্তু এই অনুভূতিটা বদলে গেল যখন হাইস্কুলের এক শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হলো। অ্যালেক্সম্যানের বামপন্থি মনোভাবাপন্ন পরিবারের কথা জানতেন সেই শিক্ষক।  সে সময় ওই শিক্ষকের একটি প্রশ্ন তার চিন্তার জগতে ধাক্কা দেয়।  শিক্ষক অ্যালেক্সম্যানকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে কিছু জানো?’ কিন্তু অ্যালেক্সম্যান তো তা জানে না। কারণ, ইসরায়েল-কেন্দ্রিক অধ্যয়নে ফিলিস্তিন সম্পর্কে কিছু ছিল না। অ্যালেক্সম্যান জানান, তারা (ইসরায়েলি অ্যাকাডেমিশিয়ান) আরবদের ব্যাপারটি এমনভাবে তুলে ধরে, যেন আরবরা পুরনো কোনো বিষয়।

অ্যালেক্সম্যানের শিক্ষক তার ছাত্রকে পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি ও বামপন্থি ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও তাত্ত্বিকদের বই পড়তে বলেন, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন রশিদ খালিদি এবং টম সেগেভ। এই নির্মাতার নতুন বোধোদয় হয় যে ইতিহাসের এক বড় অংশ তার পড়াশোনাতেই ছিল না।

ইসরায়েলিজমে ইসরায়েলি প্রশাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সমর্থনের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি পশ্চিম তীরের অবস্থা এবং সামি আওয়াদ ও বালা হিলো নামের দুজন ফিলিস্তিনির কাছ থেকে ‘নাকবা’ তথা ফিলিস্তিনিদের বিপর্যয়ের গল্প বর্ণনা করা হয়েছে।

হিলেলের কানেক্টিকাট ইউনিভার্সিটি অধ্যায়ের এনগেজমেন্ট পরিচালক ও সাবেক ইহুদি স্কুলশিক্ষক জ্যাকুই স্কুলফ্যান্ড বলেন, ‘ইসরায়েল মানেই জুদাইজম, জুদাইজম মানেই ইসরায়েল। আপনি এখানে পার্থক্য করতে পারবেন না।’ কানেক্টিকাটের শিক্ষার্থী জস বলেন, ‘বার্থরাইটের ট্যুরে ইসরায়েলি সেনারা সব সময় পাশে পাশে থাকে।’ জসের পাশাপাশি থাকা টম বারকান, যাকে ইসরায়েল সরকার ফেলো হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখেছে, তার মন্তব্যটি এ রকম ‘আমেরিকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলুন এবং সেখানে আমাদের সম্ভবত একজন ব্যক্তি হলেও রয়েছেন।’ বারকন ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর আবারও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে নতুন করে যোগ দিয়েছেন। তিনি একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের কথা ছাড়ুন। সে রকম বললে আপনি ইসরায়েলবিরোধী।’ ডকুফিল্মটিতে, ইহুদিবাদী ‘রিফর্ম জায়োনিস্টস অব আমেরিকা’ শীর্ষক সংগঠনের কর্তা রাব্বি বেনেট মিলার বলেন, ‘আমরা বীজ বপন করছি যা একদিন প্রস্ফুটিত হবে। কেউ কি জানে যে তাদের জায়নবাদী হতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে? সম্ভবত না।’

নির্মাতাদের কথা হয় পশ্চিম তীরের হেবরন অঞ্চলে অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ইশাই ফ্লেশারের সঙ্গে।  তিনি বলেন, ‘এখানে জিহাদি তৎপরতা রয়েছে- যারা এখানে আমাদের উপস্থিতি মানতে চায় না। কিন্তু এই কাজটা তাদের জন্য কঠিন। আমাদের এই লক্ষ্য আমাদের জীবদ্দশায় ফলপ্রসূ হবে এবং কেউই আমাদের থামাতে পারবে না।’

বেথলেহেমের সেই ফিলিস্তিনি শিক্ষক বাহা হিলো ইসরায়েলি তরুণ-তরুণীদের পশ্চিম তীর দর্শন নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘কীসের জন্য একটি ১৮ বছর-বয়সী আমেরিকান শিশুকে ফিলিস্তিনে বিনামূল্যে দশ দিনের জন্য ঘুরতে নিয়ে আসা হয়।  আবার এই ছেলেটি কী করে এখানে এসে তার জীবন উৎসর্গ করতে চায়। কেন একজন বিদেশি মনে করবে যে এখানকার আদি বাসিন্দাদের চেয়েও তাদের অধিকারটি অধিকতর গুরুত্ববাহী? উত্তরটি হলো- কেউ তাদের শিখিয়েছে যে এই জায়গায়ই তাদের বাড়ি।’

ইহুদি আমেরিনকানদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কেও চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন অ্যালেক্সম্যান। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলপন্থি সংগঠনগুলোর স্বর অনেক উঁচু শোনা যায়। কিন্তু তারা সমগ্র সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নয়। অনেক আমেরিকান ইহুদি রয়েছে যারা সাগর ও নদীর মধ্যে বসবাসকারী সবার সমান অধিকার ও ন্যায্যতার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।’

মিডল ইস্ট আইয়ের নিবন্ধ অবলম্বনে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদ অনীক

লেখক: সাংবাদিক, মিডল ইস্ট আই

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত