সরকার পতন

আত্মগোপনে বেরোবির শিক্ষকসহ প্রায় ১০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী 

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:২৭ পিএম

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের হামলায় জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত একশজনের খোঁজ মিলছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হত্যা এবং হামলা করে শিক্ষার্থীদের আহত করার ঘটনায় জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক, ৪ কর্মকর্তা, ৫ কর্মচারী ও অন্তত ৮০ শিক্ষার্থী ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন।

গত ১৬ জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেইটের সামনে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও বহিরাগত আওয়ামী নেতাকর্মীর হামলায় নিহত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আবু সাঈদ মিয়া এবং আহত হয় প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক। আবু সাঈদ নিহতের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ওইসব হামলাকারীদের ধাওয়া দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে ধাওয়ার মুখে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এবং গ্যারেজের পেছনের দেয়াল টপকে বেড়িয়ে যায়। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকেই দেখা মেলেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৮০’র অধিক শিক্ষার্থীর। 

পরে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোণঠাসা হয়ে পড়লে তড়িঘড়ি করে সেদিনই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক আন্দোলন অনেকটাই গতি বিহীন হয়ে পড়ে৷ তবে রংপুরের সমন্বয়কদের সাথে সমন্বয় করে ফের আন্দোলনে যায় তারা।

এদিকে ১৬ তারিখের পর থেকে সরাসরি হামলায় জড়িত শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, কর্মকর্তা রাফিউল হাসান রাসেল, পলাশসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়নি। তবে ৫ তারিখ সরকার পতনের পর এবং গেইটের সামনে সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর থেকে হামলায় জড়িত অন্য শিক্ষক লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মন্ডল, কর্মকর্তা তৌহিদুল জনি, হাফিজুর রহমান তুফান, কর্মচারী আশিকুন্নাহার টুকটুকি, নুরুন্নবী, আমির হোসেনসহ বেশ কয়েকজন আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে হামলা ও আবু সাঈদ নিহতের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে বাদি হয়ে গত ১৮ আগস্ট আবু সাঈদের বড় ভাই ১৭ নামধারী আসামি ও অজ্ঞাত আরো ৩০-৩৫ জনের বিরুদ্ধে তাজহাট থানায় মামালা করেন। এ মামলার আসামির মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামধারী অন্তত ৬ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান ও কর্মকর্তা রাফিউল হাসান রাসেল ও শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সম্পাদক শামীম মাহফুজ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার টগর ও দপ্তর সম্পাদক বাবুল। ৬ জনের ৫ জনই ৩ মাস থেকে আত্মগোপনে এবং মামলার পর সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশিত হলে তারপর থেকে আত্মগোপনে রয়েছে সহযোগী অধ্যাপক আসাদ মন্ডল। এছাড়াও অজ্ঞাত ৩০-৩৫ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম সংযুক্ত হওয়ার গুঞ্জন উঠলে তার পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান  কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান পলাশ, তৌহিদুল জনিসহ কর্মচারী টুকটুকি, নুরুন্নবী, আমির হোসেন ও মোক্তারসহ বেশ কয়েকজন এবং শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মধ্যে রয়েছেন অনন্ত ৮০ জন। 

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিরা ৬৯ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রশাসন বরাবর জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৪ আসামি শিক্ষার্থী ছাড়াও রয়েছেন, শাখা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আখতার হোসেন, গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বি, বিধান বর্মন, মো. তানভীর আহমেদ, মো. শাহীন আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাকিব-আল-হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক এলিট, মো. পিপাস, সেজান আহমেদ আরিফ, বিভিন্ন পদে থাকা মৃত্যুঞ্জয় রায়, মানিক চন্দ্র সেন, সুদীপ্ত সরকার বাধন, মেহেদী হাসান মিরাজ, মেজবাউল সরকার জয়, মেহেদি হাসান আবির, কফি আনান মান্না, উজ্জ্বল মিয়া, শাখাওয়াত হোসেন, শোয়াইবুল (সাল্লু), মোজ্জামেল হক, মুসান্নাবিন আহম্মেদ নাবিল, আবু সালেহ নাহিদ, মাসুদুল হাসান, হাবিবুর রহমান, জামাল, এস এম লাবু ইসলাম, শাহিন ইসলাম, হৃদয়, মোশাররফ, লাবু ইসলাম, আকাশ, মাসুদুল হাসান, হাবিবুর রহমান, তৌফিক, ফিলিপ রায়, শফিউল সম্রাট, রাইয়ান, বায়েজিদ, রিফাত, আতিফ দীপ্ত মন্ডল, অমিত হাসান, কমল দেবনাথ, সবুজ কুমার, মামুন, নাফিউল ইসলাম, গাজিউর, সাজ্জাদ,  সবুজ মহন্ত, তানজিল, রিজন মন্ডল, লিয়ন, রবীন্দ্র, জয়ন্ত রায়, জিহান আলী সহ অনেকে। তবে এছাড়াও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন যারা হামলার সাথে জড়িত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন, অফিস করছেন বলে জানা যায়।

এছাড়াও অনেক ছাত্রলীগ কর্মী রয়েছেন যারা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ঘোষণার পর এখনও আসেনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী ক্যাম্পাসে পরীক্ষা দিতে আসলে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে তারা এবং শিক্ষার্থী পরবর্তীতে তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সামনে জুতার মালা টানিয়ে রাখে।

১৬ জুলাইয়ের পর শিক্ষার্থীরা আবু সাঈদ হত্যার বিচার চেয়ে আসছে এবং জড়িতদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থার জন্যও বলে আসছেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা অন্যায় করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেকে আবার সামনে ঘুরাফেরা করছে। এই প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আসামিরা কোথায় আছে তা এখনও পুলিশ শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এসব খুবই দুঃখজনক।

এদিকে আত্মগোপনে থাকা বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মাত্র দুইজনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তারা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ‘হলের একটা সিটের জন্য আমরা নিরুপায় হয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করি। সভাপতি, সম্পাদকসহ কট্টর ছাত্রলীগ নেতারা আমাদের জোর করে বাধ্য করে এসব প্রোগ্রামে নিয়ে যেত। তবে আমরা যে এসবে এভাবে জড়িয়ে যাব ভাবতে পারিনি। আজকে এসবের কারণে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

এদিকে আবু সাঈদ হত্যা ও অন্যান্য আহতের ঘটনায় দুইবার তদন্ত কমিটি গঠন করে করলেও প্রথম কমিটি তদন্ত সম্পন্ন না করেই পদত্যাগ করে এবং পরবর্তী কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন করতে বললেও মাস পেরোলেও এখনও প্রকাশিত হয়নি। 

আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি ও হামলায় জড়িত থাকা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থীদের বিচার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী যদি কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তবে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মতামত সাপেক্ষে সিন্ডিকেট সভায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়ে যতদ্রুত সম্ভব সিদ্ধান্ত নেব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত