বাজার নিয়ে সিন্ডিকেট ভয়ংকর গুনাহ

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৮:১৩ এএম

নিত্যপণ্যের বেসামাল দামে দিশেহারা মানুষ। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত জোটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে যাওয়া এক প্রকার আতঙ্ক মনে করছেন তারা। বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী লাগাম এখনই টেনে না ধরলে মানুষের বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের অবৈধ মজুদদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কারণেই আজ মানুষের এত কষ্ট। পাশাপাশি দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতৎপরতা এবং নামে-বেনামে চাঁদাবাজিও ভোগাচ্ছে সাধারণ জনগণকে। তবে ব্যবসা ও বাজার পরিচালনার জন্য ইসলাম এমন কিছু কল্যাণকর নীতিমালা দিয়েছে, যেগুলো মেনে চললে স্বস্তি ফিরে আসবে বাজারে। বেঁচে যাবে খেটে খাওয়া মানুষ ও মধ্যবিত্ত সমাজ।

ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে অত্যধিক লাভ করার প্রবণতা হারাম করেছে। দুনিয়া ও আখিরাতে মজুদদারির ভয়াবহ শাস্তি সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা স্বর্ণ-রৌপ্য তথা ধন-সম্পদ জমা করে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না তাদের যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দিন। সে দিন এসব ধন-সম্পদ আগুনে গরম করা হবে। তারপর তাদের কপাল, পাঁজর আর পিঠে দাগ দেওয়া হবে। বলা হবে, তোমরা যা কিছু নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে এগুলো সেসব ধন-সম্পদ। এখন মজা বুঝো।’ (সুরা তওবা, আয়াত ৩৪-৩৫) এককভাবে চক্র গড়ে তুলে অযৌক্তিক লাভের আশায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী মজুদ করে আল্লাহর বান্দাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা ভয়ংকর গুনাহ। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পণ্য মজুদ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, আল্লাহতায়ালা তার ওপর দরিদ্রতা চাপিয়ে দেন।’ (আবু দাউদ ৫৫) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘শুধুমাত্র পাপী ব্যক্তিই মজুদদারি করে থাকে।’ (মুসলিম ১৬০৫) মজুদদারকে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুর্নীতিপরায়ণ ছাড়া কেউ মজুদদারি করে না।’ (তিরমিজি ১২৬৭) অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে লোক চল্লিশ দিন খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখল, তার সঙ্গে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)

সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘বাজারের বাইরে গিয়ে কেনাবেচা করার জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করবে না। পশুর স্থানে দুধ জমিয়ে রাখবে না। আর দালালি কিংবা অপকৌশল করে পণ্যের দাম বাড়াবে না।’ (তিরমিজি ১২৬৮) হজরত ওমর (রা.) খলিফা থাকাকালীন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুদ না করে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বাইরে থেকে খাদ্যশস্য কিনে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গুদামজাত না করে। যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের জনপদে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে সে ওমরের মেহমান। (মুয়াত্তা মালিক) এসব হাদিস বিশ্লেষণ করে বিখ্যাত আলেম আল্লামা ইবনে হাজর হাইতামি (রহ.) ফতোয়া দিয়েছে, ‘গুদামজাত করে মূল্য বৃদ্ধি করা হারাম।’ (নিহায়াতুল মুহতাজ, ৩/৪৫৬)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু গুনাহের ভয় দেখিয়েই বসে থাকেননি। তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শনে যেতেন। কোনো অসংগতি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘একদিন রাসুল (সা.) স্তূপ করে রাখা খাদ্যশস্যের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতর হাত ঢোকালে আঙুলগুলো ভিজে গেল। স্তূপের মালিককে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী? মালিক জবাব দিল, হে আল্লাহর রাসুল! বৃষ্টির পানিতে তা ভিজে গিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তবে তা ওপরে রাখলে না কেন, যেন মানুষ তা দেখতে পায়? যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম ১০১)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় বনু কায়নুকা গোত্রে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে বাজারে কোনো ধরনের প্রতারণা, ঠকবাজি, ওজনে কম দেওয়া বা পণ্যদ্রব্য মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ইসলামি স্কলাররা বলেন, ‘সরকারের কর্তব্য হলো অস্থিতিশীল বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। ব্যবসায়ীরা যদি অতিরিক্ত মূল্য নেয় এবং বাজার অস্থিতিশীল হয়ে যায়, তখন জনগণের ভোগান্তি কমানোর জন্য সরকার পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেবে, যতক্ষণ না বাজার স্বাভাবিক হয়।’ (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, ১/৩১৩) হানাফি মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন, ‘নগরবাসী বিপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সরকার মজুদদারকে বাধ্য করবে, যেন সে তার পণ্য সাধারণ মূল্যে বা যতটুকু বেশি মূল্যে মানুষ মেনে নেয়, সেই মূল্যে বিক্রি করতে।’ (আলমগিরি ৩/২১৪)

আমাদের দেশে কোনো সরবরাহ ঘাটতি না থাকলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দালালরা পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা খুবই শক্তিশালী। কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে তারা বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে। এর ফলে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি ভোক্তাদেরও পণ্য কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ না করা পর্যন্ত বাজারের এই অবস্থা চলতেই থাকবে। এই ধরনের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের বিষয়ে হাদিসে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির অসদুদ্দেশ্যে মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাকে আগুনের হাঁড়িতে বসিয়ে শাস্তি দেবেন।’ (তাবরানি ৮/২১০)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত