বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনে পুরনো মুখ শফিকুল ইসলাম মানিক। সাবেক এই ফুটবলার কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও ভোটের বাজারে সেভাবে জনপ্রিয় হতে পারেননি। ২০২০ নির্বাচনে সভাপতি পদে নির্বাচন করে পেয়েছিলেন মোটে এক ভোট। এবার মানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সহ-সভাপতি পদে। যেখানে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে আছেন সাবেক তারকা সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বিরও। দেশের অন্যতম সেরা এই প্লে-মেকার এবারই প্রথম বাফুফের নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন। তবে দুই সাবেককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে ভোটের মাঠে ভালোভাবেই আছেন চার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সংগঠক।
যশোরের শামস-উল-হুদা ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী নতুন মুখ হলেও ভোটের রেসে বড় ঘোড়া হিসেবে মুনশিয়ানা দেখিয়ে চলেছেন। ব্রাদার্সের স্বর্ণসময়ের অন্যতম কারিগর, বর্তমান ব্রাদার্সের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব সাব্বির আহমেদ আরেফ, সাবেক ফুটবলার ও লক্ষ্মীপুর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, রাজনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দীন চৌধুরী হ্যাপি এবং স্পোর্টস মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান কে-স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী ফাহাদ করিমও জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন চারের একজন হতে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সহ-সভাপতি পদে নেই কোনো নতুন মুখ। গত নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি তিন সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ, আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক, মহিউদ্দিন আহমেদ মহি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় রয়েছেন আত্মগোপনে। ফলে এই চার পদেই মিলবে নতুন মুখের দেখা।
‘যার নাই কোনো গতি, সে হয় সহ-সভাপতি’ প্রচলিত এই কথাটা বাফুফের সঙ্গে একেবারেই যায় না। সভাপতি ও সিনিয়র সহ-সভাপতির পর দায়িত্বের দিক থেকে চার সহ-সভাপতির গুরুত্ব অনেক। বাফুফের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোর দায়িত্বে থাকেন তারা। এবার যেহেতু সভাপতি ও সিনিয়র সহ-সভাপতির নির্বাচনের উত্তেজনা আগেই প্রশমিত হয়ে গেছে, সেহেতু সহ-সভাপতি নির্বাচন নিয়ে বেশি আগ্রহ সবার মধ্যে। ছয় প্রার্থীই চেষ্টা চালাচ্ছেন শেষ মুহূর্তে ১৩৩ ভোটারের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে। তবে তাদের বাফুফেতে আসতে চাওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেকটাই মিলে গেছে। মোটা দাগে, ক্রমশ নিম্নমুখী ফুটবলকে মেরামতের কাজটা তারা করতে চান হাতে হাত রেখে। যশোরের শামস-উল-হুদা ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বাফুফের বড় পরিসরে কাজ করতে চাচ্ছেন কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে, ‘২০১১ সালে যশোরে আমার শ্বশুর প্রয়াত শামস-উল-হুদা সাহেবের নামে আমরা ফুটবল অ্যাকাডেমির পথচলা শুরু করি। এতদিন আমাদের কর্মকান্ড এই অ্যাকাডেমিকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল। তৃণমূলে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় যেটা বুঝেছি, যদি ঢাকার বাইরের ফুটবল নিয়ে ভালোভাবে কাজ করা যায়, তবে দেশের ফুটবলের উন্নতি ঘটবেই।’ বাফুফের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কাছের কিছু লোকজনের অনুরোধে ফেডারেশনে নির্বাচন করছি। আমার মনে হচ্ছে, ঢাকার বাইরের ফুটবল জাগাতে পারলে মিলবে মুক্তি। এ জন্য পরিকল্পনা লাগবে। ফেডারেশন উদ্যোগী হলে সরকার ও করপোরেট হাউজগুলোকে পাশে পাওয়া যাবে। আমি যদি নির্বাচিত হতে পারি, প্রথমে চেষ্টা করব আটটি বিভাগে আটটি অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার। এরপর পর্যায়ক্রমে জেলাগুলোতে বাফুফের তত্ত্বাবধানে এবং বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অ্যাকাডেমি গড়ার উদ্যোগ নিতে চাই। তাতে করে ফুটবলারের সংকট আর থাকবে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র থাকাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় দলে নিয়মিত খেলেছেন ও অধিনায়কত্ব করেছেন ওয়াহিদ উদ্দীন চৌধুরী হ্যাপি। লক্ষ্মীপুরের ফুটবল নিয়ে কাজ করারও আছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। সেগুলো কাজে লাগিয়ে মরা ফুটবলকে জাগাতে চান বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বড় ভাই হ্যাপি, ‘বাফুফের বাইরে থেকে দেখেছি বিগত ১৪-১৫ বছরে কোনো কাজই হয়নি। ফুটবলের র্যাংকিং কেবল নিচের দিকেই নেমেছে। এখন সময় হয়েছে আলাদা করে চিন্তা করার। জেলার ফুটবলকে যেভাবেই হোক জাগাতে হবে। শুরুতে ১৯-২০ জেলায় ফুটবল অ্যাকাডেমি করতে হবে। এরপর প্রতিটি জেলায় মডেল অ্যাকাডেমি গড়ে তুলতে পারলে ফুটবল উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিও ঘটবে।’ সাব্বির আহমেদ আরেফের স্বপ্ন অবশ্য নিজের ক্লাবকেন্দ্রিক। তিনি বিশ্বাস করেন ব্রাদার্স ইউনিয়ন অতীত ঐতিহ্য ফিরে পেলে সামগ্রিকভাবে দেশের ফুটবলের উন্নতি হবে, ‘আমি ব্রাদার্সের সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় দল দুবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। মাঝখানে ক্লাব থেকে দূরে ছিলাম। তবে ফুটবলের অবনতি হতে দেখেছি। আবার ব্রাদার্সের দায়িত্ব নিয়েছি প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার যোগ্য সন্তান ইশরাকের নেতৃত্বে। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্রাদার্সকে কক্ষে ফিরিয়ে আনব। যাতে করে ক্লাবটি অতীতের মতো দেশের ফুটবলের জন্য কাজ করতে পারে। বাফুফেতে নির্বাচিত হলে এই কাজটা করা আরও সহজ হবে আমার জন্য।’
ফাহাদ করিমের সঙ্গে এতদিন বাফুফের সম্পর্কটা ছিল পেশাদারিত্বের। বাফুফের জন্য স্পন্সর জোগাড় করে দেওয়াই ছিল তার প্রতিষ্ঠান কে-স্পোর্টসের কাজ। নির্বাচিত হলে সেই সম্পর্ক গৌণ হয়ে যাবে জানালেন ফাহাদ, ‘নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবারই আমার প্রথম। এটা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জের এবং আনন্দেরও। আমি এতদিন ফুটবলের জন্য কাজ করেছি কোনো রকম কমিশন না নিয়ে। নির্বাচিত হলে কথা দিচ্ছি স্বার্থের সংঘাত হয় এমন কিছুই করব না। এখানে আমি নিতে নয়, কিছু দিতে আসতে চাই। তাছাড়া নারী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগটাও করতে চাই।’
সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বিরের লক্ষ্য একটা শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ে তোলার, যাতে করে দেশের র্যাংকিং ১৫০-এর নিচে নিয়ে আসা যায়। শফিকুল ইসলাম মানিকের প্রতিশ্রুতি বাফুফের নির্বাচিত সদস্য ও ডেলিগেটদের বাফুফে ভবনে বসে কাজ করার পরিবেশ করে দেবেন এবং ফুটবল কোচিং উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করবেন।
