১৯ অক্টোবর, ১৯৮৪ সাল। দর্শকে টইটম্বুর তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়াম। প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ শেষ হবে আবাহনী-মোহামেডান ঐতিহাসিক ডার্বি দিয়ে। তবে সে ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ নেই মানুষের। তারা গ্যালারিতে জড়ো হয়েছেন এক কিংবদন্তীকে বিদায় জানাতে। ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে তিনি মাঠে প্রবেশ করতেই গ্যালারি ফেটে পড়েছিল তুমুল করতালিতে। একের পর এক ফুলের মালায় ভরে উঠছিল মাঝারি গড়নের মানুষটির শরীর। এক সময় তো মুখ ঢেকে যাওয়ার দশা। কেবল নিজ দল আবাহনী নয়, মোহামেডানের খেলোয়াড়, সমর্থকরাও ফুলের মালায় বিদায় জানান কাজী সালাউদ্দিনকে।
২৬ অক্টোবর, ২০২৪। চার দশক পর আরেকটি অক্টোবরের ভোর ফুটেছে। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারত এমনই এক বিদায়ী মঞ্চ। সেটা আর হলো কই। জীবনের শেষ ১৬ বছর যে সেই সালাউদ্দিনকেই মহানায়ক থেকে ফুটবলের খলনায়কে পরিণত করেছে। তাই বিদায়বেলা সঙ্গী শুধুই কাঁটার জ্বালা।
এবারের বিদায়টা মাঠ থেকে নয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের মসনদ থেকে। সেবার মাঠ থেকে বিদায়টা ছিল স্বেচ্ছায়, সবার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা নিয়ে। তবে এবারের বিদায়টা ভীষণ অনিচ্ছায় এবং সবার বিরক্তির পাত্র হয়ে।
২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভোটযুদ্ধে নেমেছিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রথম সুপারস্টার সালাউদ্দিন। ধুঁকতে থাকা ফুটবলকে নিজের ক্যারিশমায় জাগিয়ে তুলবেন, এমন আকাশচুম্বী প্রত্যাশায় ভোটাররা সালাউদ্দিনকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। প্রথম মেয়াদের চারটি বছর প্রত্যাশা মেটাতে কাজ করেছেন সালাউদ্দিন। নিয়মিত হয়েছিল শীর্ষ লিগ। ফুটবলাররা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন, দেখেছিলেন পেশাদার ফুটবল খেলে জীবিকা অর্জনের স্বপ্ন। ফুটবলপ্রেমীরাও সালাউদ্দিনের প্রথম চার বছরের কর্মকান্ডে স্বপ্ন ঘুড়িটা উড়িয়েছিল দূর আকাশে। মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে ২০১২ সালেও নির্বাচিত হন সভাপতি পদে। এরপর অবশ্য মোহভঙ্গ ঘটতে সময় লাগেনি।
হ্যাঁ। সালাউদ্দিন বদলে ফেলেন নিজেকে। অগ্রাধিকারে এরপর আর ফুটবলের সত্যিকারের উন্নয়ন থাকেনি। বরং নিজের এবং ছায়াসঙ্গীদের চাওয়া-পাওয়া বড় হয়ে ওঠে তার কাছে। ফুটবলকে সঠিক পথে রাখতে যা যা করা প্রয়োজন ছিল, তার বেশিরভাগটাই করতে পারেননি কিংবা বলতে পারেন করতে চানওনি। জাতীয় দল আর শীর্ষ লিগ নিয়েই পড়ে থেকেছেন। আর ভীষণ জোর দিয়েছিলেন নারী ফুটবল উন্নয়নে। ফুটবলার উঠে আসার জমিনে পানি-সার কিছুই দেননি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে গ্রাম-গঞ্জের ফুটবল। জেলাগুলো লম্বা ঘুমে চলে যায়। তাদের জাগানোর দায়িত্ব নিয়েও জাগাননি এক রহস্যময় কারণে। অথচ ফি নির্বাচনে জিততে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেছেন, কিনেছেন ভোট। আবার টাকায় যেটা সমাধান হয়নি, সেটা করতে ব্যবহার করেছেন সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। এভাবেই দেখতে দেখতে চারবার সভাপতি পদ দখলে রেখেছেন।
তারকাখ্যাতি ব্যবহার করে তিনি পারতেন দেশের ফুটবলে সোনা ফলাতে। শুরুর দিকে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছিল ফুটবল সহায়তায়। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়েছে। তবে তাদের বিদায়গুলো হয়েছে হতাশায়। সিটিসেল, গ্রামীণফোন, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড, সাইফ পাওয়ারটেক, বসুন্ধরা গ্রুপের মতো পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ জলে যেতে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বারবার। প্রতিষ্ঠানের মতো অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিও একটা সময় সালাউদ্দিনের মোহে ফুটবলমুখী হয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকেও সালাউদ্দিন নিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, সুযোগ সুবিধা। তবে যখন মোহভঙ্গ ঘটেছে, অনেকেই আর সালাউদ্দিনমুখী হননি। আবার অনেককে প্রয়োজন শেষে নিজেই ছুড়ে ফেলেছেন সালাউদ্দিন।
ফিফা-এএফসির কাছ থেকে আসা বিপুল অর্থ ব্যবহারে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না সালাউদ্দিনের ফুটবল প্রশাসনের। তার নাকের ডগায় দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেন ফিফার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ। এছাড়া কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত মাহফুজা আক্তার কিরণকে নানা রকম বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গেছেন নির্লজ্জের মতো। তাকে ফিফা-এএফসিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হেন কিছু নেই করেননি। অথচ ফুটবলের জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ আনতে পারেননি বছরের পর বছর। এছাড়া সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় থোক বরাদ্দ এনে সেগুলোর বেহিসাবি খরচ করেছেন। আবার সরকারকেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কাঠগড়ায়। সংবাদমাধ্যমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেও ছাড়েননি। সংবাদকর্মীদের বাবা-মা নিয়েও মেতে উঠেছেন রঙ-তামাশায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। অথচ চার মেয়াদে সরকারপ্রধানের কাছ থেকে ফুটবলের জন্য বিশেষ কিছুই আদায় করতে পারেননি। পারেননি ফুটবলের জন্য একটি স্টেডিয়াম বরাদ্দ নিতে। জাতীয় দল নিয়ে অনেক পরিশ্রমের গল্প দিতেন সুযোগ পেলেই। অথচ জাতীয় দলকে শক্তিশালী করার দিকে ঝোঁক দেননি। ১৬ বছরে ২৩ জন কোচ বদলেছেন। তাতে দেশের ফুটবলের একটি সুনির্দিষ্ট ফুটবল স্টাইল গড়ে ওঠেনি।
এ সব কিছু যোগফলে দেশের ফুটবল ও ফুটবলারদের মান কেবল নিচের দিকেই নেমেছে। র্যাংকিং গিয়ে পৌঁছেছে তলানিতে। তাতে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। ফুটবল সমর্থকরা দিনের পর দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় তির্যক সমালোচনা করে গেছেন সালাউদ্দিনের। এসবে কিছুর তোয়াক্কা না করে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকা- করে গেছেন। মিশেছেন, ফুটবল নিয়ে লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছেন আস্থাভাজনদের। এমনকি ফিফার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া সোহাগের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এখনো।
এত কিছুর পর বিদায়বেলায় ফুলের মালা নয়, সালাউদ্দিনের জন্য থাকল শুধুই কাঁটার জ্বালা। যা বড় আক্ষেপ হয়েই থাকবে ফুটবলের মানুষদের কাছে।
