দলে গেছে প্রেক্ষাপট। রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়া লেগেছে ক্রীড়াঙ্গনেও। ফুটবলে সেটা ঝড়ো হাওয়ায় রূপ নিয়েছে। যার ঝাপটায় উড়ে গেছে চেনা-পরিচিত অনেকেই। ফুটবলে তাই নতুনের আবাহন। পুরনোকে ভুলে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। সেই জন্য মঞ্চ প্রস্তুত। ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আজ ঘটতে যাচ্ছে বড়সড় বাঁকবদল।
চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন আগেই বিদায় বলে দিয়েছেন। অথচ সবকিছু অনুকূলে থাকলে আজ তিনি পঞ্চমবারের মতো থাকতেন সভাপতির লড়াইয়ে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই বিষম চাপে পড়ে যান ২০০৮ সালে প্রথম ফুটবলের মসনদে বসা সালাউদ্দিন। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে সখ্যের সুযোগ নিয়ে পরপর চারবার বাফুফের সভাপতি হন কিংবদন্তি এই ফুটবলার। তবে ফুটবলকে তিনি নিয়ে যেতে পারেননি প্রত্যাশিত উচ্চতায়। ব্যর্থতার এই বোঝা কাঁধে নিয়েই তাকে ছাড়তে হচ্ছে বাফুফে। অথচ তিনি আরেকবার চেয়েছিলেন সভাপতি হতে। সেটা পারেননি নানামুখী চাপের কাছে নতি স্বীকার করে। সালাউদ্দিন যাচ্ছেন বলেই ফুটবলের অভিভাবকের পদে আসছে পরিবর্তন। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ সালাউদ্দিনের ছেড়ে যাওয়া মসনদে আসীন হবেন বাফুফের দুইবারের সহ-সভাপতি তাবিথ আউয়াল।
তাবিথের জন্য এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো ব্যাপার। ২০১২ ও ২০১৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে সহ-সভাপতি হয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির এই ব্যবসায়ী নেতা। ২০২০ সালে অবশ্য ভোটের হিসাব মেলাতে পারেননি। উপ-নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে হার মানেন মহিউদ্দিন আহমেদ মহির কাছে। বাফুফেতে জায়গা হারানোর পর ফুটবল থেকে মোটামুটি দূরেই ছিলেন। জুলাই-আগস্টে দেশে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সরকার পরিবর্তন ঘটলে সুযোগটা চলে আসে তার সামনে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা বিএনপি ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ক্রীড়াঙ্গনেও আনাগোনা শুরু হয়। সালাউদ্দিনের সরে যাওয়ার পর অবশ্য আরেক ফুটবল সংগঠক তরফদার রুহুল আমিন দিয়েছিলেন সভাপতিতে প্রার্থিতার ঘোষণা। তবে তাবিথের ঘোষণার পর তরফদার চুপসে যান। এক পর্যায়ে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তাবিথের পথ পরিষ্কার করে দেন। পথে অবশ্য ছোট্ট একটা কাঁটা থেকে গেছে তাবিথের। তা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন তিনি। সভাপতি পদে আনুষ্ঠানিকতার নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন দিনাজপুরের এক বর্ষীয়ান ফুটবল কোচ এ এইচ এম মিজানুর রহমান চৌধুরী। ফুটবলাঙ্গনে একেবারেই অপরিচিত এই ব্যক্তিকে তাবিথ কত বড় ব্যবধানে ভোটে হারাবেন, সেটাই এখন দেখার।
এদিকে তাবিথের পথ থেকে সরে গিয়ে তরফদার মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে। যে পদের জন্য আগেই তৈরি হয়ে ছিলেন বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ও বাফুফের গত নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সহ-সভাপতি হওয়া ইমরুল হাসান। ভোটের মাঠে ভীষণ জনপ্রিয় ইমরুলকে হারানো কঠিন। তাই তরফদার ও তার অনুসারীরা নানাভাবে নির্বাচন থেকে সরে যেতে ইমরুলকে চাপ দিতে থাকেন। তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় ইমরুলের দৃঢ়তায়। শেষে নিশ্চিত হার বুঝতে পেরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নির্বাচন ময়দান ছেড়ে যান তরফদার। ইমরুলই একমাত্র প্রার্থী যাকে আজ মেলাতে হচ্ছে না কোনো ভোটের হিসাব।
ওপরের দুই পদের নির্বাচনের আকর্ষণ মিলিয়ে গেলেও আগ্রহ আছে চার সহ-সভাপতি পদ নিয়ে। শেষ চার মেয়াদের পরিচিত অনেকেই এখন দৃশ্যপটে নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিন সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ, আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক ও মহিউদ্দিন আহমেদ মহি আছেন আত্মগোপনে। ইমরুল প্রমোশন পাওয়ায় সহ-সভাপতি পদে দেখা যাবে চার নতুন মুখ। আর এর জন্য লড়ছেনও ছয় নতুন। দুই সাবেক ফুটবলারের সঙ্গে এখানে ভোটের লড়াই হবে চার ব্যবসায়ী সংগঠকের। গত নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচন করে এক ভোট পাওয়া শফিকুল ইসলাম মানিক এবার লড়ছেন সহ-সভাপতি পদে। প্রথমবারের মতো বাফুফে নির্বাচনমুখী হয়েছেন জাতীয় দলের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির। এছাড়া ঝিনাইদহ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও যশোরের শামস-উল-হুদা ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, ব্রাদার্স ইউনিয়নের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব সাব্বির আহমেদ আরেফ, লক্ষ্মীপুর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওয়াহিদ উদ্দীন চৌধুরী (হ্যাপি) ও স্পোর্টস মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান কে-স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী ফাহাদ করিম চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন চার সাবেক ফুটবলারকে।
এদিকে ১৫ নির্বাহী সদস্য পদের জন্য প্রার্থী মোট ৩৭ জন। এর মধ্যে সর্বশেষ কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকা ৮ জন নির্বাচন করছেন। বাকিরা সবাই নতুন প্রার্থী। পুরনোদের মধ্যে নেতিবাচক কারণে আলোচনায় আছেন কাজী সালাউদ্দিনের কাছের মানুষ হিসেবে বিগত দেড় দশক ফুটবল ফেডারেশনে আধিপত্য বিস্তার করা মাহফুজা আক্তার কিরণ। সালাউদ্দিনের বিদায় নিশ্চিত হলেও এই নারী মরিয়া বাফুফেতে টিকে থাকতে। ফুটবলের উন্নতি যে উদ্দেশ্য নয়, তা তার আগের দীর্ঘ সময়ের কর্মকান্ডে পরিষ্কার। মূলত বিগত ১৬ বছরের কুকীর্তি নিয়ে যাতে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে এবং নিজের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে অতীতের মতো ফেডারেশনের বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দিতেই মরিয়া হয়েছেন নারী ফুটবল কমিটির এই চেয়ারম্যান। এছাড়া সালাউদ্দিন-কিরণের বলয়ের লোক হিসেবে পরিচিতদের কয়েকজন ক্ষমতায় থেকে যেতে চাচ্ছেন ভোল পাল্টে। যাদের অন্যতম জাকির হোসেন চৌধুরী, বিজন বড়ুয়া, টিপু সুলতান। সরে যাওয়ার নানামুখী চাপ সহ্য করেও নির্বাচনে ময়দান ছাড়েননি আবাহনীর দীর্ঘদিনের ম্যানেজার সত্যজিৎ দাশ রূপু ও ব্রাদার্সের ম্যানেজার আমের খান।
নতুন হয়েও এরমধ্যেই ভোটারদের কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন বেশ কজন তরুণ প্রার্থী। যাদের অন্যতম চুয়াডাঙ্গা ডিএফএর সভাপতি এখলাছ উদ্দিন, গাইবান্ধার ডেলিগেটস মাহমুদা খাতুন অদিতি, চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান সংগঠক শহিদুল আলম, ফর্টিজ এফসির সভাপতি শাহীন আহমেদরা। এছাড়া খন্দকার রকিবুল হাসান, সাইফুর রহমান মনি, গোলাম গাউছ, ছাইদ হাছান কাননের মতো জনপ্রিয় সাবেকরাও আছেন ভোটের লড়াইয়ে। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে আলোচনায় আছেন দুজন ব্যক্তি। প্রথমজন আমিরুল ইসলাম বাবু। গত নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে হেরে যাওয়া এই সংগঠক এবার ফিরেছেন নিজের প্রিয় পদে। যেখানে অতীতে তিনবার তিনি অনেক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়জনের নাম তাসমিয়া রেজোয়ানা। নিজের পরিচয় ছাপিয়ে তিনি পরিচিত হচ্ছেন স্বামীর পরিচয়ে। তাসমিয়া সালাউদ্দিনের আমলে বাফুফেতে হওয়া সব দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনিয়মের হোতা সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগের সহধর্মিণী। ফিফা ও বাফুফের নিষেধাজ্ঞায় থাকা সোহাগ স্ত্রীকে ব্যবহার করে ফুটবল অঙ্গনে টিকে থাকতে চাচ্ছেন। তাই কারও তোয়াক্কা না করে স্ত্রীর জন্য তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন ডেলিগেটদের কাছে। এমনকি সভাপতি হতে যাওয়া তাবিথের দুটি অনুষ্ঠানেও নির্লজ্জের মতো এর তার কাছে ভোট চাইতে দেখা গেছে তাকে। তাবিথের অনুষ্ঠানে সোহাগের অবাধ যাতায়াত নির্বাচনের মধ্যেই তাবিথের অবস্থান নিয়ে হচ্ছে জোর আলোচনা-সমালোচনা।
আজ রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে সকালের সেশনে হবে বাফুফের বার্ষিক কংগ্রেস। যার সভাপতিত্ব করবেন বিদায়ী সালাউদ্দিন। এরপর মেজবাহউদ্দিন নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অধীনে বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে বিরামহীন নির্বাচন।
১৩৩ জন ডেলিগেটের রায়ে আজ দেখা মিলবে বাফুফের নতুন নেতৃত্ব। বেশিরভাগ ডেলিগেট নতুন হওয়ায় ২১ পদের জন্য তাবিথ আউয়াল ও ইমরুল হাসান ছাড়া লড়াইয়ে থাকা বাকি ৪৪ জন প্রার্থীর কেউই খুব একটা নির্ভার থাকতে পারছেন না।
