রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরতের পর মদিনার মানুষ তার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দেখে তাকে শাসক হিসেবে গ্রহণ করে নেন। এতে অসুবিধা হয়ে যায় ইহুদিদের। তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নামে এক ব্যক্তিকে মদিনার নেতা বানানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছিল ইতিমধ্যে। কিন্তু রাসুল (সা.) চলে আসায় ইহুদিরা মদিনার নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ল। এতে তারা রাসুল (সা.)-এর বিরোধিতায় উঠে পড়ে লাগল। ইহুদিরা বলাবলি শুরু করল, ‘এতিম মুহাম্মদের কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। ত্যাগ নেই। সংগ্রাম নেই। তার জীবন তো বিলাসিতায় পূর্ণ। তার যে কয়টি বিবি আছে কোনো রাজা-বাদশাহর তো এত বিবি নেই। এমন মানুষ কীভাবে মদিনার শাসক হয়?’ মুফাসসির ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইহুদিদের এমন হিংসুটে সমালোচনার জবাবে আল্লাহতায়ালা সুরা নিসার ৫৪ নম্বর আয়াত নাজিল করে জানিয়ে দিলেন, ‘তবে কী আল্লাহ মানুষকে নিজ অনুগ্রহে যেসব নেয়ামত দিয়েছেন তা নিয়ে তারা ঈর্ষা করে? আমি তো ইব্রাহিমের বংশধরদেরও কিতাব ও প্রজ্ঞা দিয়েছিলাম এবং তাদের দান করেছিলাম বিশাল সাম্রাজ্য।’ (তাফসিরে মাজহারি ৩/১৩৬)
এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য দলের দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। প্রথমত ওই দলটি কিতাবের অনুসারী হবে। পাশাপাশি আল্লাহর সঙ্গে মজবুত সম্পর্কের মাধ্যমে গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী হবে। এ দুটি গুণ যে দলের মধ্যে থাকবে আল্লাহ তাদের হাতে বিশাল রাজত্ব তুলে দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন। এ দুটি গুণই ছিল রাসুল (সা.) ও তার সাহাবিদের মধ্যে। এক দিকে তারা কোরআনের অনুসারী, অন্যদিকে তারা প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তো আল্লাহ বলতে চাচ্ছেন, মদিনার মানুষ সঠিক দলকেই নেতৃত্বের জন্য বাছাই করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে যারা ইসলামি নেতৃত্বের সমালোচনা করছে তাদের না আছে কিতাবের জ্ঞান, না আছে হিকমত বা প্রজ্ঞার আলো। শুধু তাই নয়, আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কেননা বংশগতভাবেই তার ভেতর নেতৃত্বের গুণ রয়েছে। তার পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশে ইউসুফ, দাউদ ও সুলাইমান (আ.)-এর মতো রাজারা বিশ^জুড়ে সাম্রাজ্য চালিয়েছেন। সুতরাং তোমরা যারা পরাজিত শক্তি বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছ, তোমাদের চেষ্টা কখনো সফল হবে না। ইতিহাস সাক্ষী! এ ইহুদিরা বারবার ইসলামি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নষ্টের চেষ্টা করেছে। প্রতিবার রাসুল (সা.) ওহি ও হিকমতের আলোয় তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছেন।
সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা স্থিতি কখনো কখনো ভেঙে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীলদের দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। ইতিহাস সাক্ষী, রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর নেতৃত্ব নিয়ে যে গোলযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, আবু বকর ও ওমর (রা.)-এর দৃঢ়তায় মুসলিম উম্মাহ তা থেকে বেঁচে যান। আবু বকর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই পরাজিত ইহুদিদের দোসরদের ইন্ধনে চারদিকে আন্দোলনের হিড়িক পড়ে যায়। কেউ জাকাত দিতে অস্বীকার করে। কেউ ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। কেউ নবী হওয়ার দাবি নিয়ে বিশৃঙ্খলা বাঁধিয়ে ফেলে। একের পর এক আন্দোলন লেগেই থাকে। আবু বকর (রা.)-এর মতো কোমল মানুষও সেদিন কঠোর কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘কেউ যদি জাকাতের একটি রশি দিতেও অস্বীকার করে, আমি আবু বকর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’ অন্যান্য সাহাবিরা বললেন, ‘তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ করবেন?’ আবু বরক (রা.) বললেন, ‘কোরআনে জাকাত অস্বীকারকারীদেরও কাফের বলা হয়েছে। তা ছাড়া যারা আন্দোলন করছে তারা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাধাচ্ছে। রাষ্ট্রের স্থিতি বজায় রাখতে এখন কঠোরতার বিকল্প নেই।’ পরবর্তী সময় ওমর (রা.) বলেছিলেন, ‘সেদিন যদি আবু বরক (রা.) কঠোর না হতেন তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যেতাম।’ (তারিখে খুলাফা)
আমাদের দেশের বর্তমান অস্থিরতা ও অরাজকতা থামাতে সুশৃঙ্খলভাবে আইনের শাসন প্রয়োগের বিকল্প নেই। যেখানেই আইনের ব্যত্যয় হবে সেখানেই প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। এ কঠোরতা কোরআনের নির্দেশ, রাসুল (সা.)-এর সুন্নত, সাহাবিদের সুন্নত, দেশের কল্যাণ, জনগণের কল্যাণ এবং জালেমদের পুনর্বাসনের প্রতিরোধও। আল্লাহতায়ালা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন। আমিন।
