যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি মাত্র এক সপ্তাহ। আগামী ৫ নভেম্বর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। আর রিপাবলিকান প্রার্থী দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আসন্ন নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে নির্বাচনপূর্ব জরিপগুলোতে। বরাবরের মতো এবারও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে দুই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলো। এসব রাজ্যে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান খুবই কম হওয়ায় ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার এবিসি নিউজের প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, এ সাত দোদুল্যমান রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পেনসিলভানিয়া। সর্বশেষ এ জরিপে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে জনসমর্থনে ট্রাম্পের চেয়ে ১ পয়েন্ট এগিয়ে আছেন কমলা। তার ৪৮ শতাংশ সমর্থনের বিপরীতে ট্রাম্পের সমর্থন ৪৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব ভোট রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জটিল ইলেকটোরাল কলেজ ব্যবস্থার অধীনে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক নির্বাচক থাকেন। ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৮টির জন্য নিয়ম হলো সাধারণ নাগরিকদের ভোটে জয়ী প্রার্থী সে অঙ্গরাজ্যের সবকটি ইলেকটোরাল ভোট পাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মেইন ও নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্য ব্যতিক্রম। এ দুই অঙ্গরাজ্যে আনুপাতিক হারে ইলেকটোরাল ভোটার বণ্টিত হয়। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে জয়ী হওয়ার জন্য ৫৩৮টি ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে ২৭০টি ভোট পেতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলো বড় প্রভাব রাখে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে দুই প্রার্থীর অবস্থান কেমন, তা দেখে নেওয়া যাক।
পেনসিলভানিয়া : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে পেনসিলভানিয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ অঙ্গরাজ্যে যে প্রার্থী জয় পাবেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এ রাজ্যে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা ১৯টি। একসময় ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য ছিল পেনসিলভানিয়ায়। তবে বিগত এক দশকে সে চিত্র অনেকটাই বদলেছে। ফিলাডেলফিয়া ও পিটার্সবার্গের মতো ক্ষয়িষ্ণু শিল্পনগরগুলোর জন্য পরিচিত পেনসিলভানিয়া। কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকটে রয়েছে অঙ্গরাজ্যটি। এবিসি নিউজের জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যটিতে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের থেকে খানিকটা এগিয়ে রয়েছেন কমলা। এ রাজ্যে লাতিন ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। এ অঙ্গরাজ্যে প্রায় ছয় লাখ লাতিন ভোটার রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি পুয়ের্তো রিকান। গত রবিবার নিউ ইয়র্ক সিটিতে ট্রাম্পের সমাবেশে পুয়ের্তো রিকোকে ‘মহাসাগরের মাঝে আবর্জনার ভাসমান দ্বীপ’ বলায় যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পুয়ের্তো রিকানদের মধ্যে তা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজ্যটির পুয়ের্তো রিকানরা বলছেন, ট্রাম্পের জনসভার কৌতুক মনে রাখা হবে। ফলে লাতিন ভোটারদের একটি বড় অংশ কমলা হ্যারিসের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে ২০১৬ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প অঙ্গরাজ্যটিতে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্টে জয়ী হন। তবে ২০২০ সালে ১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্টে জয়ী হন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেন।
জর্জিয়া : রিপাবলিকান শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জর্জিয়া। এ রাজ্যে ১৬টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে। দেশটির সবশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দক্ষিণ-পূর্বের এ অঙ্গরাজ্যটিতে তীব্র লড়াই হয়েছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে অঙ্গরাজ্যটিতে জয়লাভ করেন। এর আগে ১৯৯২ সাল থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির কোনো প্রার্থী অঙ্গরাজ্যটিতে জিততে পারেননি। তবে সে নির্বাচনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল রাজ্যটিতে। জর্জিয়ার কৌঁসুলিরা ট্রাম্পকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের একটি মামলায় অভিযুক্ত করেছিলেন। জনমত জরিপে ট্রাম্প এগিয়ে থাকলেও সেখানকার সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন আদায়ে জোর চেষ্টা চালিয়েছেন কমলা হ্যারিস। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সংখ্যালঘু ভোটারদের নিজ বলয়ে টানতে পারলে, তা রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসতে পারে।
নর্থ ক্যারোলিনা : যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বের অঙ্গরাজ্যটিতে ১৯৮০ সালের পর শুধু একবার ডেমোক্রেটিক পার্টি জয়লাভ করেছিল। তবে কমলা হ্যারিসের বিশ্বাস, এবার তার দল নর্থ ক্যারোলিনায় ভালো করবে। নর্থ ক্যারোলিনার জনসংখ্যা এখন এক কোটির বেশি। ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা ১৬। ঘূর্ণিঝড় হেলেনের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে রাজ্যটি। এ অঞ্চলের ভোটাররা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব রাখতে পারেন। এখানেও জনমত জরিপে সামান্য এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প।
মিশিগান : মিশিগান একসময় ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে সেখানে পাশার দান উল্টে দেন ট্রাম্প। তবে ২০২০ সালে জো বাইডেন আবারও সেখানে রিপাবলিকানদের পরাজিত করেন। তার বড় সমর্থক ছিল কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী ও ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকরা। তবে মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে প্রায় দুই লাখ আরব-আমেরিকানের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে আছেন ডেমোক্র্যাটরা। আর সেটি সাপেবর হয়ে উঠতে পারে ট্রাম্পের জন্য। এ রাজ্যে ১৫টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে। এবিসির জরিপে এ রাজ্যে ট্রাম্পের থেকে খানিকটা পিছিয়ে রয়েছেন কমলা।
অ্যারিজোনা : ২০২০ সালের নির্বাচনে এ অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। সেখানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন মাত্র ১০ হাজার ৪৫৭ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশা, বাইডেন-কমলা প্রশাসনের অভিবাসননীতির ফলে জনমনে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণে অ্যারিজোনায় ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন বাড়বে। অঙ্গরাজ্যটি মেক্সিকো সীমান্তবর্তী। এবারের নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসীদের নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান সেখানকার ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ১১টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে রাজ্যটির।
উইসকনসিন : ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় অঙ্গরাজ্যটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি ডেমোক্রেটিক পার্টির তৎকালীন প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। সেখানে ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। তবে ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে বিপুল ভোটে হারান জো বাইডেন। আসন্ন নির্বাচনে রাজ্যটিতে জয়ের প্রত্যাশা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি বছর রিপাবলিকানদের গ্রীষ্মকালীন জাতীয় সম্মেলনও উইসকনসিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাইডেন যখন নির্বাচনী দৌড়ে ছিলেন, তখন উইসকনসিনে ট্রাম্প এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু কমলা মনোনয়ন পাওয়ার পর সে ব্যবধান কমিয়ে এনেছেন। রাজ্যটিতে দুই প্রার্থী জনসমর্থনে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছেন। ১০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে উইসকনসিনে।
নেভাডা : ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ঘাঁটি নেভাডা। এ অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা ৩১ লাখ। ২০০৪ সালের পর সেখানে রিপাবলিকানরা একবারও রাজ্যটিতে জিততে পারেননি। তবে আসন্ন নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ট্রাম্প অগ্রগতি দেখানোয় রিপাবলিকান সেখানে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। অবশ্য অঙ্গরাজ্যটিতে ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দিয়েছেন কমলা। তাতে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে। ছয়টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট থাকা রাজ্যটিতে জনসমর্থনে এগিয়ে আছেন কমলা।
