১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’
জাতির দুর্ভাগ্য, অতীতের বাইশটি বছর এদেশের রাজনীতিতে দেশবাসী যে চিত্র-বিচিত্র নাটকের অভিনয় দেখিয়াছে, আজও যেন সেই একই নাটকের অভিনয় তাহারা দেখিতেছে। অতীতে পুঁজিবাদী, কায়েমিস্বার্থী, ক্ষমতার দাপটে বিশ্বাসী ও বর্ণচোরা একশ্রেণির মানুষের যে চক্রান্ত লক্ষ করা গিয়াছে, আজও তাহাই আমরা লক্ষ করিতেছি। দেশকে শাসনতান্ত্রিক সংকটমুক্ত করার অথবা সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা অর্পণের প্রশ্ন যখন মুখ্য হইয়া দেখা দিয়াছে, ঠিক তখনই সেই অতীতের নিয়মে যেন মৌমাছির চাকে ঢিল পড়িয়াছে। সেই একই অশুভ শক্তি ও বর্ণচোরা শিবির আবার সস্তা স্লোগানে মতলব হাসিলের পাঁয়তারা ভাজিতেছে। কায়েমি স্বার্থ ও বেসামরিক প্রশাসনযন্ত্রের একটি ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী মহলের পক্ষপুষ্ট হইয়া একশ্রেণির উগ্র দক্ষিণপন্থি আবার যেমন ‘ধর্মের’ নামে মাঠে নামিয়াছেন, তেমনি ‘দেশ যদি বাঁচাতে চাও হাতিয়ার তুলে নাও’ অথবা ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি, নকশালবাড়ি’ ইত্যাকার স্লোগান মুখে লইয়াও কেহ কেহ মাঠে নামিবার প্রয়াস পাইতে চাহেন। এদিকে বয়োবৃদ্ধ রাজনীতিক মওলানা ভাসানীর কণ্ঠেও নিত্যনতুন ডাক শোনা যাইতেছে। ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’ স্লোগানে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিপথে ঠেলিয়া দিয়া এই সেদিনও যিনি ‘গোলটেবিলে সমস্যার সমাধান হইবে না’ অথবা ‘গোলটেবিলে বসে যারা, আইয়ুবের দালাল তারা’ ইত্যাকার স্লোগান তুলিয়াছিলেন, পরে আবার তাহাকেই আমরা ‘গোলটেবিলের প্রস্তাবক’ হইতে দেখিয়া কিছুটা স্বস্তিবোধ করিলেও পরবর্তী পর্যায়ে তাহার মুখে কখনো আবার ‘ঘেরাও’ অথবা ‘লংমার্চের’ বুলি উচ্চারিত হইতে শোনা গিয়াছে। ‘গোঁড়া সমাজতন্ত্রী’ হইয়াও সর্বশেষে এই মওলানা ভাসানীকেই আমরা আহমদাবাদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদে ৩রা অক্টোবর ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন ও ঘরে ঘরে কৃষ্ণ পতাকা ও বক্ষে কালো ব্যাজ ধারণের জন্য কৃষক সমিতির ‘প্রত্যেকটি ইউনিটের’ প্রতি নির্দেশ দিতেও শুনিয়াছি। গণতান্ত্রিক শিবিরে মওলানার এই সর্বশেষ ‘নির্দেশনামার’ প্রতিক্রিয়া কী হইয়াছে দেশবাসীর তাহা অজানা নহে। এমনকি যে কৃষক সমিতির নামে ও উদ্দেশ্যে তিনি এই ‘নির্দেশনামা’ জারি করিয়াছেন তাহার প্রতিক্রিয়ার কিঞ্চিৎ উদ্ধৃতি দিলেই মওলানা সাহেব সত্যিকারে কোন পথের পথিক তাহা বুঝিতে আশা করি কষ্ট হওয়ার কথা নহে। পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সহ-সভাপতি জনাব হাতেম আলীসহ সমিতির মোট ১৩ জন নেতা এক যুক্ত বিবৃতিতে সাফ সাফ বলিয়াছেন: ‘মওলানা ভাসানীর প্রতিবাদ দিবস আহ্বানের ফলে গণতান্ত্রিক মহলে স্বাভাবিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইয়াছে। কারণ, ইতিপূর্বে দাঙ্গার বিরুদ্ধে দিবস পালন করিতে গিয়া আমাদের দেশেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে।’ কৃষক সমিতির এই ভাষ্যের উপর আমাদের কোনো মন্তব্যের প্রয়োজন আছে বলিয়া আমরা মনে করি না। ওদিকে আবার ওই মওলানা ভাসানীই উত্তরবঙ্গে যে ‘লক্ষ স্বেচ্ছাসেবকের’ আয়োজন করিয়াছেন, কোনো ‘লং মার্চের’ পরিকল্পনা তাহার পশ্চাতে আছে কি না, তাহা অবশ্য আমাদের জানা নাই।
সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিস্বরূপ ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন কমিশনের মারফত ভোটার লিস্ট প্রণয়নের কাজ শুরু করাইয়াছেন। ভোটার লিস্ট প্রকাশের কর্মসূচিও ঘোষিত হইয়াছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই জানাইয়াছেন যে, শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান হইলে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যাইতে পারে।
ক্ষমতাসীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনারের বিভিন্ন ঘোষণার পর একদিকে দেশবাসীর মনে নির্বাচন সম্পর্কে যেমন কিছুটা আশার সঞ্চার হইয়াছে, তেমনি নির্বাচন যে হইতে চলিয়াছেই, এমনটা গভীর বিশ্বাসও যে সকল মহলে জাগিয়াছে তেমনও নহে। নির্বাচনের তারিখসহ উহার গোটা কর্মসূচি ঘোষিত হইলে মানুষের মন হইতে এ সংশয় কাটিয়া যাইত বলিয়াই আমরা মনে করি। নির্বাচন সম্পর্কে গণমনে এই যুগপৎ আশা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসরে আবার যখন আমরা দেখি যে, সেই একই শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই চরমপন্থি রাজনৈতিক শিবির তাহাদের মতলবি তৎপরতায় অবলীলাক্রমে লিপ্ত থাকিয়া চলিয়াছে এবং তাহাও আবার জাতীয় সংহতিরই নামে, তখন আবার ভাবিত না হইয়া আর উপায় কী! বিগত ২২ বছরের অভিজ্ঞতা হইতে এদেশের মানুষের মন ও মানসের পরিচয় পাওয়া আদৌ কষ্টসাধ্য নহে। এ অবস্থায় তাই গণতন্ত্রমনা মানুষের দেশে গণতন্ত্র বা জনগণের বিচারবুদ্ধিতে যাহারা বিশ্বাসী নহে, সেই উগ্র বা চরমপন্থিদের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা জোগাইয়া দেশে সংহতি প্রতিষ্ঠা করা যাইবে, এমনটাই বা ভাবা যায় কী করিয়া! তাই যখন দেখা যায়, সমস্যাজর্জরিত মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করিয়া সস্তা স্লোগানের দ্বারা গণতন্ত্রবিরোধী কোনো তন্ত্রমন্ত্রের মতলব হাসিলের চেষ্টা চলিতেছে এবং সে চেষ্টায় সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতারও যখন অভাব ঘটে না, তখন দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতখানি নিঃসংশয় হওয়া চলে তাহাও বিবেচ্য।
উগ্রপন্থি ও সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির পিছনে সমর্থন জোগাইয়া দেশের বৃহত্তর স্বার্থের সংরক্ষণ করা অথবা জাতীয় সংহতি দৃঢ় করা যাইবে, এই চিন্তাধারায় যদি কাহাকেও বিশ্বাস করিতে হয়, তাহা হইলে আর বলিবার কী থাকিতে পারে! চরমবাদে উসকানি বা পৃষ্ঠপোষকতা জোগাইয়া সারা দেশকে যদি সেই চরমবাদের দিকেই ঠেলিয়া দেওয়া হয়, অথবা দুই প্রান্তের দুই উগ্রপন্থি শিবিরকে চাঙ্গা করিয়া পারস্পরিক সংঘাত সংঘর্ষ যদি অনিবার্য করিয়া তোলা হয়, তাহা হইলে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা কী দাঁড়াইবে তাহাও চিন্তা করিয়া দেখা দরকার। স্বয়ং সামরিক সরকার ও দেশের গণতান্ত্রিক শিবির উভয়েই যখন দেশের শান্তি বজায় রাখিয়া নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে গণতান্ত্রিক জীবনধারার দিকে আগাইয়া লইতে চাহেন, তখন ভিন্ন তন্ত্রমন্ত্রের পূজারী, জনগণের বিচারবুদ্ধি, বিবেক ও মতামতের কোনো তোয়াক্কা যাহাদের নাই, সর্বোপরি নির্বাচনে যাহাদের জুজুর ভয়, সেই চরমপন্থি শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানোর ব্যাপারটিকে কোনো দেশপ্রেমিক ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখিতে পারেন কি? তাই আমাদের বক্তব্য জনগণের সার্বভৌমত্বে যদি আমাদের বিশ্বাস থাকে, গণতন্ত্রই যদি আমাদের আদর্শ হয়, তাহা হইলে, দেশ ও দশের বৃহত্তর স্বার্থে দেশের বুকে চরমপন্থি মানসিকতার প্রসার ঘটানোর পরিবর্তে সত্যিকার নিয়মতন্ত্রে বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক শিবিরের যাত্রাপথকে সহজতর করার পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। আর এজন্য দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ও নির্বাচনী কর্মসূচি ঘোষণা করত সকল মহলের মন হইতে দ্বিধা সংশয়ের ভাবও কাটাইয়া তোলা দরকার। আমরা মনে করি, নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জনগণকে যত শীঘ্র তাহাদের রায় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, জাতির জন্য ততই মঙ্গল। (ঈষৎ সক্ষেপিত)
লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ১৭ই আশ্বিন ১৩৭৬
