পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও আস্থা বাড়াতে মূলধনি মুনাফার ওপর প্রযোজ্য কর অর্ধেকে নামিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিদ্যমান আইনে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার লেনদেন থেকে ৫০ লাখ টাকার অধিক মূলধনি মুনাফার ওপর করের হার ৩০ শতাংশ, যা গতকাল সোমবার কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এনবিআর এ তথ্য জানিয়েছে। এর ফলে মন্দার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পদশালী করদাতাকে প্রদেয় করের ওপর বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়। এতে পুঁজিবাজার থেকে অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর বিদ্যমান আইন অনুসারে আয়কর ও সারচার্জ বাবদ মোট ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। গতকালের নতুন প্রজ্ঞাপনে ৫০ লাখ টাকার বেশি মূলধনি মুনাফার ওপর প্রদেয় আয়কর ও সারচার্জ বাবদ সর্বোচ্চ করহার কমিয়ে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
গতকাল পুঁজিবাজারে যখন মূল্য সংশোধনের কারণে সূচক কম ছিল, ঠিক সে সময় অর্থাৎ দুপুর ১২টায় এনবিআর থেকে মূলধনি মুনাফায় কর কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি থেকে প্রজ্ঞাপনটি প্রচারের পরই পুঁজিবাজার উত্থানের ধারায় ফিরে আসে। গতকাল দুপুর ১২টায় ডিএসইর প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ২০ পয়েন্ট কমে লেনদেন হলেও দিনশেষে সূচকটি ৬১ পয়েন্ট উল্টো যোগ হয়েছে। তালিকাভুক্ত দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে ডিএসইর প্রধান সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫২৫২ পয়েন্টে। আগের দিনের তুলনায় লেনদেনও কিছুটা বেড়েছে।
এনবিআরের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার অর্জন পরবর্তী লেনদেনের সময়কাল নির্বিশেষে অর্থাৎ শেয়ার ক্রয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে অথবা পাঁচ বছরের পরে সব ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপর করের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ সময়কালে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সব শেয়ার লেনদেন থেকে ৫০ লাখ টাকার অধিক অর্জিত মূলধনি আয়ের পরিমাণ নির্বিশেষে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। এ ছাড়া করদাতার নিট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি, ১০ কোটি, ২০ কোটি এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে প্রদেয় করের ওপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ, ২০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ এবং ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী একজন করদাতার ৫০ কোটি টাকার অধিক নিট সম্পদ থাকলে, পুঁজিবাজার থেকে অর্জিত ৫০ লাখ টাকার অতিরিক্ত আয়ের ওপর তাকে ১৫ শতাংশ হারে কর এবং প্রদেয় কর ১৫ শতাংশের ওপর ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ সারচার্জসহ মোট ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ কর ও সারচার্জ দিতে হবে। তবে করদাতার নিট সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার কম হলে সারচার্জের হার ৩৫ শতাংশের কম হতে পারে। সেক্ষেত্রে আয়কর ও সারচার্জের মোট হার নিট সম্পদের ভিত্তিতে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ হতে আরও কম হবে।
স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাসহ অন্য সব করদাতার তালিকাভুক্ত কোম্পানির সিকিউরিটিজ লেনদেন থেকে অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর সর্বোচ্চ করের হার কমায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে মনে করে এনবিআর।
দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে মন্দা চললেও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ৫০ লাখ টাকার বেশি মুনাফার ওপর কর আরোপ করা হয়। সেকেন্ডারি বাজারে শেয়ার লেনদেন করে কোনো বিনিয়োগকারী এক বছরে ৬০ লাখ টাকা মুনাফা করলে মুনাফার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত-সুবিধার আওতায় আছে। বাকি ১০ লাখ টাকার মুনাফা ওই বিনিয়োগকারীর মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হতো।
সম্প্রতি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফার ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের দাবি জানায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সঙ্গে এক বৈঠকে এই দাবি জানানো হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি থেকেও এই কর প্রত্যাহারে এনবিআরকে অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে মূলধনি মুনাফার ওপর করহার কমানো হলো।
গতকাল এক বিবৃতিতে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারের দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি করে বাজারকে বিনিয়োগসমৃদ্ধ করতে মূলধনি মুনাফার ওপর কর ছাড়ের বিষয়টি খুবই প্রয়োজন ছিল। এ বিষয়ে মূলধনি মুনাফার ওপর বিদ্যমান কর প্রত্যাহার চেয়ে আমরা ইতিমধ্যে অর্থ উপদেষ্টার কাছে সুপারিশ করেছিলাম। তিনি আমাদের সুপারিশ সুবিবেচনা করে মূলধনি মুনাফার ওপর করের হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করায় আমরা ডিবিএর পক্ষ থেকে তাকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এই করছাড়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের প্রতি তার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার প্রতিফলন হয়েছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটে পুঁজিবাজার বিনিয়োগ সমৃদ্ধ হবে।
