সংবিধান-পরিবর্তন-সংশোধন 

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৪, ০২:০৯ এএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক মাস ধরে সংবিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। মূলত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়া থেকে এর শুরু। প্রশ্ন ওঠে, এই সরকারের দায়িত্ব নেওয়া সাংবিধানিক কি না। কেউ কেউ দাবি করেন, গণ-অভ্যুত্থানে আগের সংবিধানের কোনো বৈধতা আর নেই, দাবি ওঠে নতুন করে সংবিধান রচনার। অবশ্য, দেশের স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতাসীনরা নানা সময় সংবিধানের অজুহাত দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে ছয়টি কমিশন গঠন করেছে যার একটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার। এর প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

সম্প্রতি এ আলোচনাকে উসকে দিয়েছেন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। চাইলেই সংবিধান পরিবর্তন করা যায় না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক চাইলেই এই পরিবর্তন সম্ভব। তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির কলমের খোঁচা দিয়ে এটা (সংবিধান) বদলানো যাবে না।...যখন দেখা যাবে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার মত গড়ে উঠেছে, তখন সংবিধানে হাত দেওয়া যেতে পারে।’ ড. কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘জনগণই সংবিধানের হেফাজতকারী। সংবিধান নিয়ে জনগণকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের যে পবিত্রতার কথা আমরা বলি, মৌলিক আইনের যে কথা আমরা বলি, সব আইনের ঊর্ধ্বে সংবিধান। তাই যেনতেনভাবে এটাতে হাত দেওয়া যায় না।’

কামাল হোসেনের কথার সঙ্গে সায় দেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ‘যে সময় যে সরকার আসে, তারা তাদের সুবিধামতো সংবিধান সংস্কার করে। কেন? এটা তো আমাদের দলিল, রাষ্ট্রের দলিল, জনগণের দলিল। সেটাতে হাত দেওয়ার আগে কিন্তু চিন্তাভাবনা করা উচিত।’ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘দেশ ও রাষ্ট্র চালাতে গেলে সব সরকারেরই সমস্যা হয়। কিন্তু সমস্যায় পড়ে গত ৫২ বছরে বিভিন্ন নামে ১২ বার সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন আমরা করেছি। এটা আমরা কেন জানি করেই চলেছি। এগুলো রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা সম্পর্কে আমাদের অপরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ। সমস্যায় পড়লেই আমরা সমাধান খুঁজি সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের। এটা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না।’

অবশ্য, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য মাহফুজ আলম সম্প্রতি বলেছেন, ‘যেদিন আমাদের এক দফা ঘোষণা করা হয়, তখনই পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আমরা খারিজ করেছি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামই নতুন সংবিধান।’ অন্যদিকে কমিশনের চেয়ারম্যান আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করব। তাদের বক্তব্য শুনব। লিখিত বক্তব্য চাই। তারপর সে অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে সংবিধান সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস ও পুনর্লিখন কোনটা করা হবে।’

সংবিধানের মূল কাজ শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতাকে সীমিত করে জনতাকে সুরক্ষা দেওয়া। যে কারণে সংবিধান সংশোধন দুঃসাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশে সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে সংসদে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি লাগে। ধরেই নেওয়া হয়, এতে বিরোধী দলেরও কিছু সমর্থন থাকে। গণভোটকে সংবিধান পরিবর্তনের সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম ধরা হয়। সংসদের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কিছুর পরিবর্তন পাস করানো হলেও গণভোটের মাধ্যমে এর (সংবিধানের) ওপর জনগণের সম্মতি নেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। কিন্তু, বাংলাদেশে প্রায় সব সংশোধনীই সংসদের মাধ্যমে ঘটেছে। কেবল দ্বাদশ সংশোধনীর সম্মতির জন্য ১৯৯১ সালে সাংবিধানিক গণভোট হয়। সংবিধান দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে পরিবর্তন করা যেমন কঠিন আবার দরকার পড়লে এর পরিবর্তনে দ্বিধা থাকা উচিত না, তবে সেই পরিবর্তন যেন সুচিন্তিত বিবেচনাপ্রসূত এবং জনমুখী হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত