কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই গত ১৫ বছর ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। চর দখলের মতো ব্যাংকও দখল হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপে। কিন্তু পটপরিবর্তনের পরও কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। দুই ডেপুটি গভর্নরের (ডিজি) বিরুদ্ধে এস আলমের মতো গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা জানিয়েছেন, ডেপুটি গভর্নর (ডিজি) নুরুন নাহার এবং ড. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই বর্তমান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পর্যন্ত সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ এবং অন্যান্য অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নামে-বেনামে অনেক অভিযোগ আসে। আমাদের এইচআর সেটা খতিয়ে দেখেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গভর্নর বরাবর না এলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না।’
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ব্যাংকগুলোয় তারল্যসংকট প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, একযোগে অধিক গ্রাহক টাকা তুলতে গেলে পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই টিকবে না। কিছু গ্রাহকের আমানতের টাকা উত্তোলনের প্রয়োজন হচ্ছে না, তারপরও অনেক গ্রাহক টাকা তুলতে যাচ্ছেন। ফলে কিছু কিছু ব্যাংকের তারল্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অপ্রয়োজনে বা এক ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্য ব্যাংকে রাখার প্রবণতা না কমলে সব গ্রাহকের টাকা একসঙ্গে ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।
গ্রাহকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকের আমানতের টাকা নিয়ে আতঙ্কের কিছুই নেই, সবাই তার আমানতের টাকা ফিরত পাবেন। তবে আমি গ্রাহকদের উদ্দেশে বলব, অহেতুক আতঙ্কের কিছু নেই। কিছুটা সময় লাগবে ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপরিকল্পনা আছে ব্যাংকগুলো ভালো অবস্থানে নিয়ে আসতে। সব আমানতকারীকে আহ্বান করছি, প্রয়োজনের বেশি টাকা আপনারা তুলবেন না। আমরা আস্থা ফেরাতে চাই। আমরা সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে গত দেড় মাসে ৫ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকার সাপোর্ট দিয়েছি। যদি আরও বেশি সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, তাহলে সে বিষয়েও বিবেচনা করা হতে পারে। তবে ব্যাংকগুলো নিয়ে বেশি আতঙ্কের কিছু নেই।’
আরেক প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক স্ব-প্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে রিসিভার নিয়োগ দিতে পারে না। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী একটি গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রিসিভারের বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অন্য কোনো গ্রুপে রিসিভার দেওয়ার জন্য আদালতের কোনো নির্দেশনা এখনো আসেনি। কোনো গ্রুপ ফরমাল চ্যানেলে অর্থ পাচার করে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক তার তদন্ত করবে। কিন্তু হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হলে সেটা তদন্ত করা কঠিন। বিএফআইইউ এ বিষয় নিয়ে কাজ করছে।’
ঋণ অনিয়ম নিয়ে কাজের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি বলেন, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ ইতিমধ্যে অনেক ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। এ বিষয়েও তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কোনো তথ্য দেয়নি।
এ ছাড়া গঠিত টাস্কফোর্স কার্যকর কিছু করছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, একটি টাস্কফোর্স ব্যাংকিং সংস্কারে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে দ্বিতীয় টাস্কফোর্স কাজ করছে। তৃতীয়টা পাচার করা টাকা ফেরত আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন দেশের আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজ চলছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে, সেটা তদন্ত করা হচ্ছে। আপনারা যেহেতু আবার বিষয়টি বলছেন, আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগে খোঁজ নেব।’
হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘আমরা ১১টা ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনে কাজ করছি। এই ব্যাংকগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমাদের শুরুতে মনোযোগ এখন ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। অন্য ব্যাংকগুলোকে এখন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তবে এই ১১ ব্যাংকই শেষ নয়, প্রত্যেক ব্যাংকের অনিয়ম খতিয়ে দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভবিষ্যতে সেসব ব্যাংকের নামও জানতে পারবেন আপনারা।’
