নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির ধকল বেশি গ্রামে

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:২৮ এএম

কোনোভাবেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বেশ কয়েক ধাপে ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়িয়েও কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অক্টোবরে গড় মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশে ঠেকেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এটিকে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বলা হয়। বিবিএসের তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির ধকল শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের বেশি। অক্টোবরে শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়েছে। এ মাসে গ্রামাঞ্চলে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বিপরীতে একই সময়ে দেশের শহর এলাকাগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

অক্টোবর মাসের সিপিআই তথ্যে দেখা যায়, মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশে। এটি আগের মাস সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে ঠেকেছিল। গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশের অর্থ হলো, ২০২৩ মাসের অক্টোবর মাসে যে পণ্য ১০০ টাকায় কিনতে হয়েছিল এ বছরের অক্টোবরে তা কিনতে হয়েছে ১১০ টাকা ৮৭ পয়সায়।

অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশে ঠেকেছে। যদিও গত জুলাইয়ে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বেড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানুষের কৃষিজমি ডুবে ফসল নষ্ট হয়, খামারগুলো নষ্ট হয়ে হাঁস-মুরগির সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দেয়। তাছাড়া বাজারের সিন্ডিকেট ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় পণ্যের দাম কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়িয়ে চলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ক্রমশ বাড়ছে। ইতিমধ্যে সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশে উঠেছে। গত দেড় বছরের কম সময়ে সুদহার বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এতে ছোট-বড় সব খাতের ব্যবসায়ীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি কমে-বাড়ে, সব মিলিয়ে ১০-এর কাছাকাছি রয়েই গেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা যে নীতিগুলো গ্রহণ করেছি, সেগুলো দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ইতিমধ্যে ১০ শতাংশে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও সুফল হচ্ছে না।’

আশপাশের দেশগুলো সবাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও আমরা কেন পারছি না, কারণ ব্যাখ্যা করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের শুধু চাহিদা সংকোচন করে সম্ভব না। খেয়াল রাখতে হবে মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদার বৃদ্ধির কারণে ঘটে না। এখানে অন্য কারণও কাজ করে। বিশেষ করে আমাদের রাজস্ব নীতি কতটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে বাজারব্যবস্থা, এখানে সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজার যদি স্থিতিশীল না হয়, তাহলে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।’

বাজার নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাশালীদের প্রভাব থাকে বলে মনে করে তিনি বলেন, ‘এসব মধ্যস্বত্বভোগীর মধ্যে কেউ যদি ক্ষমতাশালী থাকে, সে যদি তার সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়; তখন সেটিকে সে ব্যবহার করে মূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে। এখানে সিন্ডিকেট বলতে কিছুই নেই, তারা নিজেরা যোগসাজশ করে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। আমাদের এখন খুঁজে দেখতে হবে পণ্যের মূল্য বাড়ানোর পেছনে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী কারা। সেটি বের করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক, দক্ষ করতে না পারলে শুধু বাজার তদারকি ব্যবস্থা দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্রে পড়েছে। প্রতি বছরই এ সময়ে দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা দেখা দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের মাঠ, খামার নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে উৎপাদন বিঘিœত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা যায় এ কয়েক মাসে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি লাগাম ছাড়িয়ে গেলেও বিবিএসের তথ্য বলছে, অক্টোবরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমেছে, যেটি আগের মাস সেপ্টেম্বরেও ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশ বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে মেয়াদি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তিন বছরের বেশি সময় ধরে ঋণ ও আমানতের সুদহার এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতি নানা সংকটে পড়লে গত বছর জুলাই থেকে স্মার্ট পদ্ধতির আওতায় সুদের হার বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে চলতি বছরের মে মাসে সুদের হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির আওতায় নীতি সুদহার কয়েক দফা বাড়ানো হয়। এতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং গত মাসে তা প্রায় ১৬ শতাংশে উঠেছে।

সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ২৭ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে সব ধরনের ঋণের সুদের হার চলতি মাসে আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাজার ব্যবস্থাপনায় খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় খাদ্যপণ্যের দামে খেয়াল রাখতে হবে। খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এটার খুব যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন সরকার বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা ইতিমধ্যে বিভিন্ন কমিটি করে দিয়েছেন। যাদের মূল লক্ষ্য বাজার মনিটরিং করা, এটার প্রয়োজন আছে। কিন্তু এটি ততক্ষণ পর্যন্ত ইফেকটিভ হবে না যতক্ষণ না বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির মূল কারণ আমরা দূর না করতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘মনিটরিং করে মূল্য বেঁধে দিতে পারেন। বাজারে পণ্যের মূল্য কতটুকু হবে এটি নির্ভর করে যারা উৎপাদনকারী তাদের ওপর। ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের একটি সরবরাহ চেইন থাকে। এখানে উৎপাদনকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী, মজুদদার, মিলমালিকসহ বিভিন্ন হাত ব্যবহার হয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে যায়। এখানে অনেক মধ্যস্বত্বভোগী থাকে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত