পুলিশের সোর্স পরিচয়ে চাঁদাবাজি

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:০৪ এএম

কখনো থানা পুলিশের, কখনো গোয়েন্দা পুলিশের, কখনো নৌ-পুলিশের ক্যাশিয়ার, মুন্সি বা সোর্স বলে নাম ভাঙান তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার এমন নানা পরিচয়ে তারা কর্ণফুলী থানার বিভিন্ন স্পটে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই চাঁদাবাজ চক্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসীর পক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা এবং ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

যদিও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর দায়িত্বশীলরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাশিয়ার বা সোর্স পরিচয়ে যারাই অপকর্ম করুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কর্ণফুলী উপজেলার নৌঘাট ও ক্রাইম স্পটগুলোতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে বছরের পর বছর চাঁদাবাজি করছেন কামাল মেম্বার নামে এক ব্যক্তি। সাদা রঙের প্রাইভেট কারে চড়ে ঘাটে ঘাটে তার চাঁদাবাজি চলছে। এভাবে মাসে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন তিনি।

কালাম মেম্বারের হয়ে কাজ করেন আরও তিনজন। তারা হলেন জাহাঙ্গীর, এরশাদ ও নুরুল আবছার মাঝি। এই তিনজন উপ-সোর্স বা উপ-ক্যাশিয়ার পরিচয়ে চাঁদা তোলেন।

কর্ণফুলী থানা এলাকায় বর্তমানে পুলিশের ক্যাশিয়ার পরিচয়ে প্রতি মাসে চাঁদা তোলেন শাকিল নামে এক যুবক। তিনি পূর্বের থানা ক্যাশিয়ার আবদুস সবুরের নাতি।

সবুর নৌ-পুলিশের ক্যাশিয়ার হিসেবেও নিজেকে ব্যবসায়ীদের কাছে জাহির করেন। এ ছাড়া কোস্ট গার্ডের ক্যাশিয়ার পরিচয় দেন জহির ও ফরিদ নামে দুই ব্যক্তি।

এসব সোর্স-ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ৮-৯ বছর ধরে কর্ণফুলী এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছেন। পুলিশের ভয় কিংবা নানামুখী হয়রানির শঙ্কায় তারা মুখ বুজে তাদের চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। এসব ক্যাশিয়ারকে শর্ত অনুযায়ী পর পর দুই মাস টাকা দিতে না পারলেই নানা হয়রানির শিকার হতে হয় ব্যবসায়ীদের। এমনকি অনেকে মিথ্যা অভিযোগে জেলও খেটেছেন। তাই ভয়ে মুখ খুলছেন না কেউ।

স্থানীয়রা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাশিয়ার ও সোর্স পরিচয়ধারী চাঁদাবাজরাই নিয়ন্ত্রণ করছে কর্ণফুলী উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের মাদকের কারবার, জুয়ার আসর, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ অপরাধের নানা ক্ষেত্র।

জানা যায়, প্রভাতী বাজারের চোলাই মদ বিক্রেতা জুলধার ফারুক, জুলধা পাইপের গোড়ার চোলাই মদ কারবারি নেজাম, ফকিরনীর হাটের চোলাই মদ কারবারি নাছির,দারোগার হাট নদীর পাড়ের নুরু মিয়ার তিনটি জুয়ার আসর, জুলধা ডাঙ্গারচর ঘাটের কামালের জুয়ার আসর, ডাঙ্গারচর এলাকার ইয়াবা কারবারি এরশাদ, বেলাল ও জামাল, বড়উঠান এলাকার খুচরা মাদক কারবারি আইয়ুব, পিংকি, হোসেন ও আজাদ, বড় উঠানের মাদক কারবারি এনাম ও জামাল, ইছানগরের মাদক কারবারি জুয়েল, চরলক্ষ্যার শাহেদ, চরপাথরঘাটার ডিবি সোর্স মাসুদ নানা অপরাধে জড়িত।

কর্ণফুলী উপজেলার যেসব স্পট থেকে সোর্স ও ক্যাশিয়াররা চাঁদা তোলেন সেগুলো হলো চরপাথরঘাটার পুরনো ব্রিজঘাট, ইছানগরের বাংলাবাজার ঘাট, কর্ণফুলী ঘাট, বিএফডিসি গেট, তোতার বাপের হাট, নতুন ব্রিজের দক্ষিণ পাড়, শিকলবাহার তাতিয়া পুকুরপাড়, ব্লকের পাড়, ভেল্লাপাড়া ব্রিজের কর্ণফুলী পাড়, জুলধার পাইপের গোড়া, ১১ নম্বর মাতব্বর ঘাট, জুলধা প্রভাতী বাজার, ফকিরনিরহাট, দারোগার হাট ও জুলধা ডাঙারচর ঘাট।

এ ছাড়া মইজ্জ্যারটেক চেকপোস্ট ও টোলপ্লাজায় প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে চাঁদা তোলেন মিজান নামে এক ব্যক্তি। সাত-আট বছর ধরে মিজান ও তার শ্যালক জুবায়ের প্রতি রাতে মহাসড়ক দিয়ে আসা বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি করছেন।

চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে কামাল মেম্বার, জহির হোসেন ও আবদুস সবুরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা অভিযোগ অস্বীকার করে সংযোগ কেটে দেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ওসি মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের নানা অভিযোগ আমি যোগদান করার পরে শুনেছি। এ বিষয়ে সিএমপি কার্যালয়ে অভিযোগ দিলেও আমার কাছে এখনো আসেনি।’

সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ‘কেউ যদি অভিযোগ দিয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাশিয়ার বা সোর্স পরিচয়ে পুলিশি সেবা কার্যক্রম ও পুলিশের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না।’

এ বিষয়ে সিএমপি বন্দর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাকিলা সোলতানা বলেন, ‘যে কেউ অভিযোগ করতেই পারে। তবে অভিযোগের আলোকে তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা পেলে অবশ্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত