সংলাপে সংস্কারে নেই ২৮ দল

  • প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ডাকা হয়নি
  • প্রশাসন নির্বাচন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতের সংস্কারের বিষয়েও মতামত চায়নি কোনো কমিশন
  • রাজনৈতিক ঐকমত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ বিশ্লেষকদের
আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৪, ১১:৫৬ পিএম

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রক্রিয়া চলছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও সুশীল সমাজের মতামত চেয়েছে। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কয়েক দফা রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনা বা সংস্কার প্রক্রিয়ায় নেই দেশের বেশ কয়েকটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল এবং সর্বশেষ ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, তারা রয়ে গেছে এ প্রক্রিয়ার বাইরে। ভবিষ্যতে এসব দলকে ডাকা হবে কি না অথবা তাদের মতামত চাওয়া হবে কি না সেটা স্পষ্ট করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এসব দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাও অস্পষ্ট।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থক মিলিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের বাইরে রেখে বা উপেক্ষা করে দেশে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে না। উল্টো সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও পোক্ত করতে পারে।

তীব্র গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। এর তিন দিনের মাথায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এরপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে সংস্কার কমিশনগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের সুপারিশমালা পেশ করতে পারবে বলে প্রধান উপদেষ্টা গত রবিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে উল্লেখ করেছেন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে।

সংস্কারের বিষয়ে কেউ কেউ নতুন নির্বাচন ব্যবস্থা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলছেন। বেশ কয়েকটি দল নির্বাচন ব্যবস্থা বদলানোর জন্য সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী পদ্ধতির প্রস্তাব করেছে, যদিও বিএনপি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এর বাইরে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। তবে সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য এখনো সেভাবে দৃশ্যমান নয়। আর সরকার কী ধরনের সংস্কার করতে চায়, তাও এখন স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন যে সময়ই হোক না কেন, রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসবে, তারা এসে যদি এসব সংস্কার না মানে, বদলে দেয়, তখন এগুলো অর্থহীন হয়ে পড়বে। এজন্য ভালোমন্দ যাই করা হোক না কেন, তার জন্য সবার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, তাদের কর্মপদ্ধতি, পরিকল্পনা আলোচনায় আসা প্রয়োজন।

তাদের মতে, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মূল রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে, তাদের মধ্যকার সমঝোতার পূর্বশর্ত তৈরি না করে কোনোরকম আরোপিত সংস্কার বা তার প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪৮। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত দুই দফায় ১০ থেকে ১২টি দল ও কয়েকটি জোটের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বৈঠক করেছেন। এসব দল ও জোট তাদের নিজের দাবিদাওয়াও তুলে ধরেছে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে গঠিত কমিশন ইতিমধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া দল ও জোটের মধ্যে রয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণতন্ত্র মঞ্চ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টি গণফোরাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, ১২ দল, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। সংলাপে আমন্ত্রণ পাওয়া দল ও সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছিল।

অন্যদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৮ দলের একটিকেও এখন পর্যন্ত সংলাপে ডাকা হয়নি। এসব দলের মধ্যে আছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (ইনু), জাকের পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মুকিত), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি।

আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অনেকেই দেশ ছাড়েন। দলটির দলীয় কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। কেউ আত্মগোপনে আছেন। দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সমর্থন থাকলেও জুলাই আন্দোলনের মাঠে দেখা যায়নি জাতীয় পার্টিকে। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই বৈঠকে জাতীয় পার্টির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

তবে দলটির ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ডাকা সংলাপে জাতীয় পার্টিকে এখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি দলটির কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংলাপ বা সংস্কারে আমাদের ডাকা হয়নি। কেন ডাকা হয়নি আমরা জানি না। তবে আমাদের ডাকলে আমরা সরকারকে আমাদের অবস্থান জানাতে পারতাম।’

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো জাতীয় পার্টিরও দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন আমরা বিরোধী দলেও ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে দেশের রাজনীতি ও মানুষ সম্পর্কে আমদের ধারণা রয়েছে। প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কেও আইডিয়া রয়েছে। সেগুলো আমরা সরকারকে শেয়ার করতে পারতাম।’

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আরও চার-পাঁচটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, সংস্কার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের মতামত চেয়ে চিঠি পাননি তারা। সংলাপেও ডাকা হয়নি তাদের। তবে তাদের প্রত্যাশা রাজনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্রে হয়তো তাদের ডাকা হবে।

বাংলাদেশ কংগ্রেসের চেয়ারম্যান কাজী রেজাউল হোসেন বলেন, ২০১৯ সালে নিবন্ধন পাওয়ার পর পার্টির পরিচিতির জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তারা আওয়ামী সরকারে বা সংসদে ছিলেন না। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে তাদের অবস্থান ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আগ্রহ নিয়ে আছি সরকার আমাদের ডাকবে।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের চাপ দিয়ে ভোটের মাঠে নামানো হয়েছে। আমরা তো ইচ্ছে করে যাইনি। তখন এর বিরুদ্ধে কথা বলার মতো কেউ সাহস দেখায়নি।’

নিবন্ধিত এসব দলকে বাদ দিয়ে সংস্কার ও সংলাপ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি নিবন্ধিত যে দলগুলো রয়েছে, সেগুলো ছোট হোক বা বড় হোক; তাদের সবাইকে ডাকা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় দল এখন বিএনপি। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য আসছে, তাতে বোঝা যায় তারা দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয়। গণতান্ত্রিক চর্চা হলে রাজনীতিতে কে থাকবে, কে থাকবে না, সেটা জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’

রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘কী কারণে অন্যান্য দলকে ডাকা হচ্ছে না সেটা অনুমান করা কঠিন। যতটা বোঝা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ধারাটাকে দূরে রেখে সরকার নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। হয়তো এই দলগুলোকে আওয়ামীপন্থি হিসেবে তারা চিন্তা করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা থাকবে কি না, সংশয় রয়েছে।’

আগের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে আওয়ামী লীগ নানাভাবে দূরে রেখেছে। আমরা ওইরকম জেদাজেদি চাই না। জেদাজেদি, হিংসা, বিদ্বেষ পরিহার করা উচিত। যদি এসব দল কেউ অপরাধ করে থাকে, অবশ্যই তাকে বিচার বা শাস্তির আওতায় আনতে পারে। তবে দল হিসেবে দূরে রাখা বা তাদের মতামত না নেওয়া ঠিক হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত