সমস্যা কমে যাবে

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:১৯ এএম

বিদ্যুতের বর্তমান সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে গণ-অভ্যুত্থানে বিতাড়িত সরকারের একাধিক চক্র। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে, তা এখন পরিষ্কার। মূলত দুর্নীতি করার জন্যই বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে, বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছিল। অথচ যার নাম হয়েছে, ‘উন্নয়ন’ এবং ‘বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান’। বর্তমানে দৃশ্যমান যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার বাইরে অনেক কিছুই আছে। সেই বিষয়গুলো সমাধান করলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কেটে যাবে বিদ্যুৎ সমস্যা। এরই মধ্যে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। এমন কথা কেউ অস্বীকার করছে না, এই মুহূর্তে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। কিন্তু তার আগে, অতীতের পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি। কেন, কী কারণে এ সমস্যা হলো, তা ব্যাখ্যা করা দরকার। তবে বিদ্যুৎপরিস্থিতি যাই হোক, কোনোভাবেই তাকে ‘স্থায়ী’ হিসেবে মনে করার কোনো কারণ নেই। এ রকম সমস্যা অতীতেও হয়েছে। আবার সেই সংকট কেটেও গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই দেশব্যাপী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। 

ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কমেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানি নির্ভর এ খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়াও বাড়ছে। ফলে চাহিদা মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। শেখ হাসিনা সরকার গত পনেরো বছরে দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করে অপরিকল্পিতভাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।  জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকার অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় রেখে গেছে, তারই ফলে এই খাত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিগত সরকারের অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতে পলিসিগত যে ভয়াবহ ভুল হয়েছে সেটা হলোÑ  পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা শক্তিশালী অর্থনীতির বিবেচনায় আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার অর্থনীতির একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গ্যাসের পাশাপাশি তেল ও কয়লার ব্যবহার বেড়েছে।

আমদানি নির্ভরতার সংকটের দৃষ্টান্ত হিসেবে ২০২২-২৩ সালকে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা। জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় ওই বছর। অনেক পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা হলেও সেগুলো থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন তারা। কারণ অর্থের অভাবে গ্যাস ও তেল কেনা যাচ্ছে না। এ রকম বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি স্থগিত বা রিনিউ করা হয়নি। দেশের দক্ষিণে চারটি বড় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হলো পায়রা, রামপাল, এস আলম এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ লাইন না থাকার কারণে এগুলো থেকে বিদ্যুৎ ঢাকার দিকে আনা যাচ্ছে না। অথচ তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০০৮ সালেই প্রথম ১০টি প্রতিষ্ঠানকে রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথম দিকে বিরোধিতা করলেও ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আরও তেলনির্ভর রেন্টাল প্ল্যান্টের অনুমোদন দেয়। কেননা মারাত্মক লোডশেডিংয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আর কোনো উপায় ছিল না। লোডশেডিংয়ের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এর মাঝেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমস্যার জায়গা নিল প্রাথমিক জ্বালানির স্বল্পতা। ২০০৭-এ প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি ছিল, যা মেটানোর আর কোনো উপায় ছিল না। আজ সেই ঘাটতি দৈনিক ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২০ সালে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মহাপরিকল্পনা (পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান বা পিএসএমপি) এবং ২০১৬ সালের পিএসএমপিতে এই ঘাটতির কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলোতেই অভ্যন্তরীণ উৎস হতে জ্বালানি গ্যাস অনুসন্ধানের বদলে বাইরে থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর অধিক নির্ভরশীলতার নীতি গৃহীত হয়। ২০১০-এর পরিকল্পনায় স্থানীয় খনিতে প্রাপ্ত কয়লার ওপর ৩০ শতাংশ নির্ভরতার কথা বলা হলেও ২০১৬ সালের পরিকল্পনায় তা বাদ দেওয়া হয়। যদিও সরকার এসব পরিকল্পনা সেভাবে অনুসরণ করেনি, তার বদলে জ্বালানির আমদানি বৃদ্ধি অব্যাহত থেকেছে। এর ফলেই আন্তর্জাতিক বাজরের মূল্য ও জোগানের ওঠানামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। 

বিদু্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির প্রধান কারণ গ্যাসের অভাব। সামিটের এফএসআরইউ সাড়ে তিন মাস বন্ধ ছিল। সেটা এখন ঠিক হয়েছে। এতদিনে নতুন গ্যাস হয়তো চলে এসেছে। জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এরই মধ্যে জানিয়েছেন লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পূর্ব ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গোড্ডা প্ল্যান্ট থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ রপ্তানি করা আদানি পাওয়ার আগস্টের শুরুতে সরবরাহ ১৪০০ থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট থেকে কমিয়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে।  এরপর সরবরাহ আরও কমিয়ে প্রায় ৫২০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৭ সালে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। আদানি গ্রুপের ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ১৬০০ মেগাওয়াটের গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ২৫ বছরের জন্য একচেটিয়াভাবে বিদ্যুৎ কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে মূল্য সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এই চুক্তিও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরকার বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং কয়লা।  ডলার সংকট, গ্যাস সংকট এবং আর্থিক চাপের মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ছিল না।  কিন্তু আস্তে আস্তে সমস্যা কাটতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে জলবিদ্যুতের জন্য দক্ষিণ এশীয় গ্রিড তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মে-জুনে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহল প্রচণ্ড ভারত সফরের সময় বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে ৩ অক্টোবর এ চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, নেপাল প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের ভেতরের সঞ্চালন লাইন দিয়ে বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত বিদু্যুৎ রপ্তানি করবে। প্রথম ধাপে নেপাল, ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদু্যুৎ রপ্তানি করবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৪ সেন্ট (১০০ সেন্টে ১ ডলার)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে সাত টাকা। ভারত সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নেপাল থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের পর নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে সফল হয়েছে বাংলাদেশ।

উপমহাদেশে বাংলাদেশই প্রথম কোনো দেশ, যারা একসঙ্গে ভারত এবং নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই নীতি অনুসরণ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরস্পর সহযোগী হলে, বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে। বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। সমস্যা যা দেখা যাচ্ছে, তা আপাতত। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এর সমাধান হবে।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত