বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দুই দেশের পক্ষ থেকেই ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করা হয়। এর মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে গত সাড়ে ১৫ বছর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ। কিন্তু গত তিন মাসে সম্পর্ক শীতলের দিকে রূপ নিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আগের তিন মাসের তুলনায় বিরোধপূর্ণ বক্তব্য কমে আসছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল সম্মেলনে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বক্তব্যেও তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষ একটি এজেন্ডার ওপর নির্ভরশীল নয়। এই এজেন্ডা বলতে তিনি দিল্লির আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এ পরিস্থিতিতে আগামী মাসের মাঝামাঝিতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরের বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত। তার এ সফরের খবরে দুই দেশের সম্পর্কের শীতলতা কাটিয়ে ওঠার আশা করা হচ্ছে কূটনৈতিক ও অন্যান্য মহল থেকে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গতকাল বুধবার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-ভারত ফরেন অফিস কনসালটেশনের (এফওসি) পরবর্তী রাউন্ডে যোগ দিতে ভারতীয় প্রতিনিধিদল ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ঢাকা সফরে আসছে। দলটির নেতৃত্বে থাকবেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে প্রথম উদ্যোগ।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের কারণে দুই দেশের মধ্যে ‘সম্পর্কের উন্নতির জটিলতা’ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, তিনি প্রতিবেশী দেশে না থাকলে, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ হতো।
কূটনৈতিক দুনিয়ায় পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে দুই দেশের বার্ষিক পরামর্শমূলক বৈঠক এফওসিকে নিয়মিত বা স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে এবার বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরটি নিয়মিত সফরের থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে তার সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
জানা গেছে, ডিসেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্র সচিব পযায়ের বৈঠকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া এবং ভিসাসেবা চালুর বিষয়ে সুখবর আসতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এটি হবে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক। সফরকালে বিক্রম পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারত দেশটিতে বাংলাদেশিদের জন্য প্রথম দিকে সব ধরনের ভিসা বন্ধ রাখে। পরে অবশ্য চিকিৎসা ও খুব জরুরি ভিসার বিষয়টি শিথিল করে। তবে তাও এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এরই মধ্যে গত তিন মাসে সীমান্ত হত্যায় তিনবার ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। শুধু ভিসা জটিলতাই নয়, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যেও সংকট তৈরি হয়। দুই দেশের শীতল সম্পর্কের মধ্যেও ভারত থেকে নিত্যপণ্যের কিছু কিছু চালান এসেছে। তবে সম্পর্কের জট কোনোভাবেই খোলেনি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চিন্তা রয়েছে। গত তিন মাস ধরে এ নিয়ে চেষ্টাও চলছে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে সাইডলাইনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রিনিয়াম জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। ভিসার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা করা হয়। কিন্তু এরপরও বিষয়টি এগোয়নি।
অবশ্য গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোনালাপ হয়। ওই ফোনালাপে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনার সময় নরেন্দ্র মোদি সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গটি তোলেন।
জানা গেছে, এফওসি বৈঠকে অভিন্ন গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে পর্যালোচনা, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচার ও দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ভিসা সেবা চালু, ভারত থেকে নিত্যপণ্য আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে রপ্তানির নানা বাধা সরানোসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
এফওসিতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন। দলটিতে ঐতিহ্যগতভাবে স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, পানিসম্পদ ও খাদ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সফরটি নিয়মিত পরামর্শমূলক কাঠামোর মধ্যে হলেও এই মুহূর্তে হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৪ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে বার্ষিক এফওসি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
