তারুণ্যের ভাবনায় দেশ সংস্কার

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০৩ এএম

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে যত প্রগতিশীল আন্দোলন, সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয় হয়েছে সবগুলোর নেতৃত্বে ছিল তারুণ্য শক্তি। আগামীর বাংলাদেশকে সংস্কার করতে ‘তারুণ্য শক্তি’ই প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। তাদের ভাবনা ও প্রগতিশীল চিন্তাই দেশ ও জাতির কল্যাণ নিয়ে আসবে।     

দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : দেশ সংস্কারে সর্বপ্রথম যে বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণভেদে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ পুনর্গঠনে অংশ নেওয়া। দেশের সব কল্যাণ কাজে প্রশাসনকে সহযোগিতা করা। আক্রমণাত্মক বা হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক, সামাজিক ঐক্য রাখতে হবে।

তারুণ্যের সম্ভাবনাকে কাজে রূপান্তর : তরুণের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, সেখানে দেশের সব স্তরে তরুণদের সহযোগিতা ও নেতৃত্ব অবশ্যই প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় সব ব্যবস্থাপনায় তারুণ্যের অংশগ্রহণ একই সঙ্গে যেমন দেশের কল্যাণে আসবে, অন্যদিকে তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে দক্ষ জনশক্তির জ্যামিতিক উল্লম্ফন হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকিং ও আর্থিক সহায়তা প্রকল্প : গ্রামীণ জনজীবনের মান উন্নয়ন করতে দেশের প্রত্যেক গ্রামে ‘গ্রামীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা উচিত। এতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে এবং গ্রামীণ ব্যাংকিং মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। তরুণরা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সহজেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। ফলে তরুণ-তরুণীরা মেধা, বিবেচনা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। সেই সঙ্গে, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকলে যেমন গ্রামে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, তেমনি গ্রামীণ মানুষ শহরমুখী হবেন না। এতে শহরে প্রান্তিক মানুষের চাপ কমে আসবে।

১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই রাষ্ট্রে মানুষের বসবাস প্রায় ১৭ কোটি। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৯৭১ জন মানুষ বসবাস করে। বর্তমান বাস্তবতায়, মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য তরুণ বেকার দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। এ ধরনের ক্রমবর্ধমান জন্মহার নিয়ন্ত্রণে দেশের সব স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই। এ জন্য গ্রামে গ্রামে সাপ্তাহিক ‘উন্নয়নবান্ধব পরামর্শমূলক পরিকল্পনা’র উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও সামাজিক কুসংস্কার নির্মূলে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। গ্রামের তরুণ সমাজকেই এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

কৃষক ও কৃষিমানের সংস্কার : দেশের আদি পেশা ‘কৃষি’। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বলা যায়, এটিই বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের উন্নয়ন সাধনে কৃষি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের আবহাওয়া ফসলের চাহিদা বিবেচনায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকের সহায়তা করতে হবে। পাশাপাশি, কৃষককে সর্বোচ্চ আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। উন্নত বীজ সংগ্রহ, সঠিক উপায়ে বীজ রোপণ ও পরিচর্যা, উচ্চ ফলনশীল জাত সংগ্রহ করা এবং তা উৎপাদন করার পরামর্শ দিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ শুধু পরিসংখ্যান নয়, মাঠ পর্যায়ে তাদের কর্ম প্রসারতা আরও বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে সাপ্তাহিক, মাসিক অথবা দ্বিমাসিক কর্মশালার আয়োজন করে কৃষকদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আধুনিকায়ন :  বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। কালের বিবর্তনে দেশে কুটির শিল্প বিলুপ্ত প্রায়। কিন্তু সম্ভাবনাময় এ শিল্প হতে পারে অর্থনীতির শক্তিশালী একটি ক্ষেত্র। এ জন্য প্রয়োজন গুণগতমানের আধুনিকায়ন। মাটির আসবাবপত্র, কাঠের শিল্প, কাঁসা শিল্প, পাটশিল্প, কাগজ শিল্প, তাঁত শিল্প, বাঁশ বা বেতের তৈরি আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আধুনিকায়ন করতে হবে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কুটির শিল্পকে ব্যবহার করলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি কমবে, অন্যদিন বাংলার ঐতিহ্য অক্ষুন্ন থাকবে। নগরায়ণের জ্যামিতিক বৃদ্ধির ফলে সবুজায়ন কমে গেছে। কয়েক বছরের তাপমাত্রায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ কমাতে হলে, দেশব্যাপী সবুজায়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে যেখানে গাছপালার পরিমাণ কম, সেখানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সবুজায়নের আওতাধীন করতে হবে। এ জন্য শহরের সড়কের পাশে, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনার আঙিনা সবুজায়ন করা যেতে পারে। শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ পার্ক করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে পরিবেশ ঠা-া থাকবে এবং দূষণ রোধ করা যাবে।

উপসংহার : সংস্কার ও উন্নয়নে সমষ্টিগত তারুণ্য শক্তির ভূমিকা অগ্রাহ্য করা যাবে না। এই শক্তি শুধু একটি দেশের ভবিষ্যৎ নয়, বরং গতি, চিন্তা ও অগ্রগতির প্রাণচিহ্ন। দেশের সব স্তর এবং বিভিন্ন খাতে তরুণ সমাজের অবদান নিশ্চিত করতে হলে, তাদের মানসিক ও সামাজিক সংস্কারের পাশাপাশি কৃষি ও কুটির শিল্পের আধুনিকায়ন, আর্থিক সহায়তা এবং পরিবেশবান্ধব সবুজায়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় তরুণদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই দেশকে একটি উন্নত, সচেতন এবং দায়িত্বশীল সমাজে রূপান্তর করতে পারে। জাতীয় ঐক্য, সচেতনতা এবং প্রগতিশীল চিন্তা তারুণ্যকে একটি শক্তিশালী পন্থায় এগিয়ে নিয়ে যাবে। নিকট ভবিষ্যতেই তরুণদের নেতৃত্ব এবং সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংস্কার সম্পন্ন হবে এবং একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটবে। শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত