যে কারণে স্বৈরশাসন অকল্যাণকর

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:৩১ এএম

কোরআনে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বিষয়ে ফেরাউনের শাসনামলকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত স্বৈরশাসন এমন একটি সরকারব্যবস্থা, যাতে শাসনকর্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ধারক। এই শাসনকর্তাকে বলা হয়ে থাকে স্বৈরশাসক। যিনি দেশের জনগণ, সংবিধান এমনকি আইনের রীতিনীতি অগ্রাহ্য করে জোর করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তার অধীনস্ত করে রাখেন। এর ফলে জনগণ তাদের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বাস্তবে রাষ্ট্রে কোনো স্বাধীন বিচারব্যবস্থা থাকে না। যে কারণে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলে দুর্নীতি।

স্বৈরাচার শাসকের বর্ণনায় কোরআন ফেরাউনকে একজন অহংকারী ও সীমালঙ্ঘনকারী শাসকরূপে চিহ্নিত করেছেন। অন্য সব মানুষের তুলনায় ফেরাউন নিজেকে শ্রেষ্ঠ, উন্নত ও প্রভাবশালী বলে ঘোষণা দিয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পর আমার সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে মুসা ও হারুনকে ফেরাউন ও তার পরিবারবর্গের কাছে প্রেরণ করেছি। কিন্তু তারা সবাই নিজেদের শ্রেষ্ঠ ও অহংকারী হিসেবে প্রকাশ করল। আসলে তারা ছিল বড়ই অপরাধী লোক।’ (সুরা ইউনুস ৭৫) 

স্বৈরশাসনে শাসিত জনতা আস্তে আস্তে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ভুলে যায়। এক পর্যায়ে তারা স্বাধীন চিন্তাশক্তিও হারিয়ে ফেলে। স্বৈরশাসনের অধীন স্বাধীন চিন্তার অবকাশ থাকে না বলেই এরূপ হওয়া স্বাভাবিক। তখন স্বৈরশাসক জনগণকে নিজের দাসে পরিণত করে। সে চায়, জনগণ অন্ধের মতো তার অনুসরণ করুক, নিজেদের স্বাধীন চিন্তা-বিবেচনা ভুলে গিয়ে নিতান্ত অক্ষমের মতো তাকে মেনে চলুক।

অন্যভাবে বললে, স্বৈরশাসক চায়, জনগণ তার দাসত্ব করুক, তার কথা অকপটে মেনে নিক। স্বৈরশাসক কখনো এটা মেনে নিতে পারে না যে, জনগণ তাকে ভুলে গিয়ে অন্য কারোর পরামর্শে চলুক। তাই জনগণকে সবসময় তার অধীনে রাখার জন্য স্বৈরশাসক জনগণের ওপর সব রকম পদ্ধতি প্রয়োগ করে। যা হতে পারে প্রতিবাদী ভালো লোকদের অপরাধী সাজিয়ে জনগণের সামনে খারাপভাবে উপস্থাপন করা, তাদের নানাভাবে অপমান, অপদস্থসহ ভয় দেখানো, তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করা, কাউকে আবার অপরাধীর তকমা লাগিয়ে কারাগারে বন্দি করা, আবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানুষিক নির্যাতন করা ইত্যাদি। এতেও জনগণকে নিজের অধীনে রাখতে ব্যর্থ হলে প্রতিবাদী জনগণকে বিচার বহির্ভূত হত্যা করতেও স্বৈরশাসক বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না।

স্বৈরশাসনের অধীন জনগণের যে চরম মাত্রার দুর্দশা ও দুরবস্থার সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন না করে বরং সুন্দর, সর্বোত্তম প্রমাণ করতে স্বৈরশাসকরা প্রাণপণে চেষ্টা করে। তারা লোকদের বুঝাতে চেষ্টা করে যে, আসলে তোমাদের বর্তমান জীবনধারা আগের থেকেও অনেক ভালো। কিন্তু তোমাদের এই ভালো থাকা ওরা সহ্য করতে পারছে না, তাই ওরা সর্বদা সবখানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। আসলে আমরাই তোমাদের ভালো চাই। স্বৈরশাসক ফেরাউন ও তার দলবলের ভাষায় কথাটি এই, ‘(ফেরাউনের) লোকজন বলল, অবশ্যই এই দুজন মানুষ (মুসা ও হারুন) হচ্ছে জাদুকর, তারা জাদুর (খেলা) দিয়ে তোমাদের দেশ থেকে তোমাদের বের করে দিতে এবং তোমাদের এই সুন্দর, সর্বোত্তম জীবনধারা শেষ করে দিতে চায়।’ (সুরা তাহা ৬৩)

স্বৈরশাসকরা অনেক সময় নিজেদের নিরঙ্কুশ কর্র্তৃত্বের সিংহাসনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেদের বড় ধার্মিক, আল্লাহভীরু, রাসুল প্রেমিক ও মানব দরদী হিসেবে উপস্থাপন করে। অথচ তাদের আসল উদ্দেশ্য ধর্মের লেবাস ব্যবহার করে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় বসার প্রক্রিয়াকে আরও মজবুত করা। পবিত্র কোরআনে ফেরাউনের কথার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে এভাবে, ‘আমি তো তোমাদের সেই রায়ই দেব, যা আমি সর্বোত্তম মনে করব। আর আমি তোমাদের সত্য পথ ছাড়া অন্য কিছুই দেখাব না।’ (সুরা মুমিন ২৯) প্রখ্যাত দার্শনিক ইবনে খালদুন বলেছেন, ‘স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং এই ব্যবস্থা জনগণের জন্য অকল্যাণকর ও পরিত্যাজ্য।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত