এখন তো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ‘স্থবিরতা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘অস্থিরতার কারণে, অনিশ্চয়তার কারণে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, বিশৃঙ্খলার কারণে বেসরকারি খাতে উৎপাদন যা আছে, সেখানে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। পোশাক খাতে স্থবিরতা আছে।’
গতকাল সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের তৃতীয় একনেক।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নাই-ই। তার ওপর সুদের হার অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে করে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন না নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, অন্যদিকে সরকারি উন্নয়নব্যয়ও যদি না বাড়ে, তাহলে তো অর্থনীতির মন্দা অবস্থা তৈরি হবে।’
এর জন্য নতুন উদ্ভাবনী ও মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন প্রকল্প তৈরির কথা চিন্তা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে সব উপদেষ্টাদের চিঠি দেবেন বলেও জানিয়েছেন এ উপদেষ্টা।
এ সময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হলে প্রবৃদ্ধির কী হবে জানতে চাইলে ‘এক বছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হলেও অনেক প্রবৃদ্ধি হতে পারে’ বলে মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পৃথিবীর একমাত্র চট্টগ্রামেই ‘দোতলায়ও বন্যা হয়’ উল্লেখ করে দেশের এই বাণিজ্যিক জেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সরকারের নেওয়া এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প।
একনেক নতুনভাবে শুরু হওয়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন (ক্যাচমেন্ট-২ ও ৪)’ নামের এ প্রকল্প অনুমোদন দেয়।
সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্বিতীয় একনেকে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর এবং ব্যয় ৬ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বাড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৩৭ শতাংশ। বরাদ্দের হিসাবে এ সরকারের সবচেয়ে বেশি ব্যয় এখানে হলেও নতুন নেওয়া প্রকল্প চট্টগ্রামেরটিই।
একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘অনেক কিছু ঘেঁটে একটা নতুন প্রকল্প হচ্ছে। এটা আমাদের সময়ে নতুন শুরু হচ্ছে কিন্তু খুব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এটা অনুমোদিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর একমাত্র জায়গা যেখানে দোতলায় বন্যা হয়। হেসে বলেন, ফ্লাইওভারেও বন্যা হয়। ওপরে হয়, নিচেও হয়।’ এসব উল্লেখ করে ‘এই প্রকল্প জরুরি’ বলেও মন্তব্য করেন এ উপদেষ্টা।
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণ উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘চট্টগ্রামের যেহেতু খালবিল সব ভরাট হয়ে গেছে, পাহাড়ি ঢল যেটা নামে মনে করা হতো, সবই তো সমুদ্রে চলে যাবে। আসলে যায় না। এত বেশি দালানকোঠা নির্মাণ করা হয়েছে এবং খালগুলা ভরাট করা হয়েছে। ঝরনার পানি আটকে ফেলা হয়, সে কারণে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা একটা বড় বিষয়।’
অতীতের পানি নিষ্কাশনের যত বড় প্রকল্প আছে, কোনোটাই আসলে সফল হয়নি উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে চট্টগ্রাম ওয়াসা, তবে চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশন সমস্যা শুধু একটা প্রকল্প দিয়ে সমস্যা যাবে না।
এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াসার সঙ্গে চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এসব মিলে ‘সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা’র পরামর্শ দিয়েছে।
আট বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে জাইকা ৪ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা ও সরকার ৯৬৯ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে বলে অনুমোদনে বলা হয়।
প্রকল্পের অর্থায়ন বিষয়ে বলেন, ‘জাপানের জাইকার ঋণই অধিকাংশ। বাংলাদেশ সরকারের কিছু অর্থায়ন আছে। জাপানি ঋণ খুবই ভালো ঋণ। এগুলো খুবই দীর্ঘমেয়াদি এবং কম সুদে দেওয়া হয়।’
উন্নয়ন বাজেটই ছোট হচ্ছে গত ১৫ অর্থবছরে সবচেয়ে কম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে। এ বিষয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রথমদিকেই বলছিলাম, প্রতিবছরই বাজেটের থেকে কম বাস্তবায়ন হয়। এবার উন্নয়ন বাজেটটাই ছোট করব নানা কারণে।’ তিনি বলেন, ‘যে প্রকল্পগুলো ছিল, যেগুলো নতুন করে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই বাদ দিতে হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সেগুলো ব্যয় অনুযায়ী সুফল বয়ে আনবে, সেটা আমাদের মনে হয়নি। এগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।’
ছোট হলে সেটি কী আকারের হবে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো এ বছর এখনো পরিকল্পনা করিনি বাজেট কী আকারের হবে। সাধারণত সংশোধিত বাজেট তো ডিসেম্বরের দিকেই হয়। প্রথম সংশোধন হয়। কাজেই বাজেট সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেবে।’
তবে বর্তমান উন্নয়ন বাজেট এ সরকারের নেওয়া নয় উল্লেখ করে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘এ বছর এডিপি বাস্তবায়নের হার অনেক কম। প্রথম চার মাসে বাজেটের ৮ শতাংশের মতো খরচ। এটা আমাদের বাজেট না। আগের সরকারের বাজেট। বৈদেশিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। দেশীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সে রকমই হয়েছে। একমাত্র অন্য বছরের তুলনায় বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে, সেটা হয়েছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব বাজেটে ব্যয়। সেটা বরং ১২-১৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।’
