বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের পাশাপাশি সরকার, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সংস্কার করতে হবে। এছাড়া পুলিশ সংস্কার সম্ভব নয়। পাশাপাশি জনবান্ধব ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী, শিক্ষক, আমলা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকরা। গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকায় এক মুক্ত আলোচনা সভায় তারা এমন মত দেন। সিরডাপ মিলনায়তনে ‘৫৩ বছরেও পুলিশ কেন জনবান্ধব হয়ে উঠছে না, পুলিশ সংস্কার: কেন? কোন পথ?’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করা হয়।
সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘পুলিশের সবকিছু ভেঙে পড়েছে। পুলিশে মিলিটারাইজেশনের (সামরিকীকরণ) ফলে কী ক্ষতি হয়েছে সেটা সবাই দেখছেন। এখন পুলিশে মিলিটারি ব্রেন ঢুকে পড়েছে। এ জন্য পুলিশে সংস্কার জরুরি। পলিটিক্যাল ভিশন (রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা) না থাকলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। তাছাড়া জনগণকে সম্পৃক্ত করে পুলিশিং করলে বড় সংখ্যক পুলিশের প্রয়োজন হবে না।’
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই আলোচনা সভায় নুরুল হুদা আরও বলেন, ‘আমাদের মতো বিভাজিত সমাজে পুলিশিং কঠিন বিষয়। পুলিশ পাবলিক সার্ভেন্ট থেকে ডমিস্টিক সার্ভেন্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও অন্য বাহিনী থেকে পুলিশের কোনো ইউনিটে কাউকে আনলে তাকে অন্তত ৬ মাস পুলিশিংয়ের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’
আলোচনা সভায় পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য গোলাম রসুল বলেন, ‘আমরা গত ২ মাস ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছি। কেমন পুলিশ হবে সে বিষয়ে জনগণের মতামতকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা মিডিয়া এবং বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপ চালাচ্ছি। সেখানে জনসাধারণের মন্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, সেটা হচ্ছে জাতীয় জননিরাপত্তা কমিশন গঠন করা। এটি একটি স্থায়ী কমিশন হবে, এটির একটি সচিবালয় থাকবে এবং এটির একটি গবেষণাগার থাকবে। রাজনৈতিক ব্যক্তি, সিভিল সোসাইটি নিয়ে সম্মিলিতভাবে এটি গঠন করা হবে। এজন্য বিদ্যমান আইন এবং যেসব অসংগতি রয়েছে সেগুলো রিভিউ (পর্যালোচনা) করে এবং সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।’
সভায় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ সম্পর্কে আমাদের সংবিধানে ও আইনে বলা হচ্ছে পুলিশ ডিসিপ্লিন ফোর্স, ল’ ইনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ও সিভিল ফোর্স। সমস্যাটা আসলে এখানে যে পুলিশ কি সিভিল ফোর্স নাকি ল’ ইনফোর্সমেন্ট এজেন্সি, নাকি ডিসিপ্লিন ফোর্স। কেননা এই তিনটির কার্যক্রম একেক ধরনের। আবার নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। কেননা যার আইজি হওয়ার কথা, তিনি আইজি হচ্ছেন না। ফলে এসব জায়গা ঠিক করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করলে হবে না। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে পুলিশের ইনফোর্সমেন্ট বিভাগে, তদন্ত বিভাগে এবং বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা আসলে জনমানুষের কাছে পুলিশ একটি আদর্শ বাহিনীতে রূপ নিতে পারে।’
অনুষ্ঠানে পুলিশের সাবেক ডিআইজি মেজবাউন্নবী বলেন, ‘এই ছাত্র আন্দোলনের পর আমার মনে হয় ভালো পুলিশ পাওয়ার এটাই শেষ সুযোগ, বারবার এমন সুযোগ আসবে না। র্যাব যখন শুরু হয়েছে, তখন থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। মনে চাইল আর একটা বাহিনী বানিয়ে ফেললাম সেটা হবে না। যার ৬ দিনের ট্রেনিংও নেই, সেও এই বাহিনীতে পুলিশিং করছে। এই জিনিসটা পুরোটাই রাজনীতিকেন্দ্রিক হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ১৬৩ বছর ধরে পুলিশ একটা ব্যাড কালচারে ঢুকেছে। ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের ভেতর পুলিশ কাজ করে। জুডিশিয়ারি আছে, সেসব জায়গায়ও সংস্কার করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সাবেক শিক্ষার্থী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সৈয়দ আবদুল্লাহ বলেন, ‘পুলিশে চাকরি বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। একজন পুলিশ সদস্য যদি বাড়িঘর ও জায়গা-জমি বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরিতে যোগ দেন, তাহলে তিনি যেভাবেই হোক তার সেই টাকা তুলতে অন্যায় পথ বেছে নেবেন। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতি বলয়মুক্ত করতে হবে। ফলে একটি থানায় ওসিকে না দিয়ে থানার দায়িত্ব একজন বিসিএস ক্যাডারকে দিতে হবে। আর ওসিকে সেই বিসিএস ক্যাডারের সহযোগী হিসেবে রাখাতে হবে। কেননা ওসি বিভিন্নভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হতে পারেন। এছাড়াও পুলিশকে সার্ভিস বাহিনীতে রূপান্তর করা জরুরি। এ জন্য একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। যাতে করে পুলিশের কার্যক্রম, সমস্যা এবং পুলিশের দায়িত্বের জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে। কেননা পুলিশের ভুলভ্রান্তি পুলিশ দেখবে না। এ জন্য সাবেক পুলিশ সদস্য, সাবেক বিচারক ও শিক্ষক প্রতিনিধির মাধ্যমে একটি মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।’
হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম, দার্শনিক ও গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. আনিসুজ্জামান, আইসিটি ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির কো-অর্ডিনেটর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মাজহারুল হক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি ইয়াসমিন গফুর, ফ্রন্ট পেইজ সম্পাদক সেলিম খান, সাংবাদিক আহমেদ সেলিম রেজা, আইনের শিক্ষক ড. আহমেদুজ্জামান, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেত্রী জাকিয়া শিশির, হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. পারভেজ এবং সাবেক পুলিশ কনস্টেবল মান্নানসহ আরও অনেকে।
