বন্দর থেকে কনটেইনার সরছে অফডকে!

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:২৪ এএম

উন্নত দেশের কোনো বন্দরে কনটেইনার খুলে সেই কনটেইনারের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয় না। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে তা হয়ে আসছে। এখন এসব কনটেইনার অফডকে (বেসরকারি কনটেইনার ডিপো) নিয়ে সেখান থেকে আমদানিকারকদের সরবরাহ করতে চাইছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের এই মতের সঙ্গে একমত নন আমদানিকারকরা। তাদের দাবি, এখনই শতভাগ আমদানিপণ্য অফডকমুখী না করে পর্যায়ক্রমে করা উচিত। আর এ সময়ের মধ্যে অফডকগুলো যেমন সক্ষমতা অর্জন করবে, তেমনিভাবে নতুন নতুন অফডকও গড়ে উঠবে বলে ব্যবসায়ীদের অভিমত।

গত ১৪ অক্টোবর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সব এফসিএল (পণ্যভর্তি কনটেইনার) কনটেইনার স্থানান্তর এবং অফডক থেকে ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে চিঠি দেওয়া হয়। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বরাবরও একই ইস্যুতে চিঠি দিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, একই ইস্যুতে ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সচিব বরাবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান কমোডর এম আনোয়ারুল ইসলাম ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আগামী এক বছরের মধ্যে অফডকগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সব পণ্য অফডক থেকে ডেলিভারি নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৫৩ হাজার ৫১৮ একক কনটেইনার। এর মধ্যে গড়ে ৪০ হাজার ৫১০ কনটেইনার জমা থাকে, যা বন্দরের ৭৫ শতাংশ জায়গা দখল করে থাকে। বাকি ২৫ শতাংশ জায়গায় আমদানি করা পণ্য (এফসিএল কনটেইনার) কনটেইনার থেকে খুলে ডেলিভারি দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৩২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। এসব কনটেইনারের মধ্যে প্রায় ২২ লাখ কনটেইনার আমদানি-রপ্তানি পণ্যের এবং বাকি কনটেইনারগুলো খালি কনটেইনার। হ্যান্ডেলিংকৃত ২২ লাখ কনটেইনারের মধ্যে এলসিএল (বাল্ক পণ্য) কনটেইনার থাকে প্রায় ৫০ হাজার। অবশিষ্ট ২১ লাখ ৫০ হাজার কনটেইনারের মধ্যে আমদানি পণ্যের এফসিএল কনটেইনার প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার ও রপ্তানি পণ্যের এফসিএল কনটেইনার প্রায় ৭ লাখ। বর্তমানে রপ্তানি পণ্যের ৭ লাখ বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপো থেকে বন্দরে জাহাজীকরণ হয়ে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ৩৮ আমদানি পণ্যের আরও প্রায় ২-৩ লাখ কনটেইনার। এতে প্রশ্ন জাগে, আমদানি-রপ্তানির ২২ লাখ এফসিএল কনটেইনারের মধ্যে ১০ লাখ অফডকগুলো হ্যান্ডেল করার পর অবশিষ্ট ১২ লাখ কি হ্যান্ডেলিং করতে পারবে?

অফডকে এখনই শতভাগ নয়: দেশের আমদানিপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে থাকে পোশাকশিল্প মালিকরা। এ বিষয়ে কথা হয় পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিজিএমইএর কোনো আমদানিপণ্য অফডকে নেওয়া যাবে না। যদি এটা করা হয় তাহলে তা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, ‘অফডকগুলো এমনিতেই রপ্তানিপণ্য হ্যান্ডেল করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে ওঠে। এখন যদি আমদানিপণ্য ওদের মাধ্যমে ডেলিভারি নিতে দেওয়া হয় তাহলে আমদানি-রপ্তানি উভয় পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে বিপর্যয় নেমে আসবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পোশাক খাত। অফডকগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক।’

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘বিশ্বমানের বন্দরের জন্য অবশ্যই বন্দরের ভেতরে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া যায় না। অফডক স্থাপন নীতিমালা অনুযায়ী এগুলোতে পণ্য ওঠানো-নামানোর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা রয়েছে। তাই অফডকে শতভাগ পণ্য ডেলিভারির অনুমোদন দেওয়ার আগে তাদের সক্ষমতা অর্জন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যথায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।’

আরও নতুন অফডক প্রয়োজন : বর্তমানে চালু থাকা ১৮টি অফডকের মাসিক সক্ষমতা রয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের। গাণিতিক হিসাবে যা বছরে ২১ লাখ ২ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করতে পারবে বলে সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কাগজে-কলমে এ সক্ষমতার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে এগিয়ে নিতে আমদানি-রপ্তানি সব পণ্য অফডকগুলো হ্যান্ডেল করা প্রয়োজন। কিন্তু এর আগে অফডকগুলোকে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং আরও নতুন নতুন অফডক গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

নতুন অফডক গড়ে তোলার পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের জন্য পৃথক পৃথক অফডককে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই নতুন নতুন অফডক গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডেল করলে উভয় কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

বিজিএমইএর এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ইনকনট্রেন্ড কনটেইনার ডিপোর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কনটেইনার থেকে আমদানি পণ্য খালি করে সেই কনটেইনারে আবার রপ্তানিবাহী পণ্য লোড করা হয়। এখন যদি আমদানি-রপ্তানি পৃথকীকরণ করা হয়, তাহলে খালি কনটেইনার পরিবহনের জন্য এক ডিপো থেকে আরেক ডিপোর ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। তখন আরও সমস্যা বাড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে কনটেইনারগুলোর সক্ষমতা রয়েছে। তবে শতভাগ এলসিএল কনটেইনারগুলো হ্যান্ডেল করতে গেলে বিপর্যয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য বর্তমানে যেমন ৩৮টি আমদানিপণ্য অফডকগুলো হ্যান্ডেল করে, এর সঙ্গে আরও ১৫ বা ২০টি আইটেম বাড়িয়ে দেওয়া হোক। পরে আরও আইটেম বাড়িয়ে দিয়ে এক বা দুই বছরের মধ্যে শতভাগ এফসিএল কনটেইনার অফডকে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আর এ সময়ের মধ্যে অফডকগুলো যেমন সক্ষমতা অর্জনের জন্য সময় পাবে, তেমনিভাবে নতুন নতুন বিনিয়োগকারীও আসবে।

১৮টি অফডকের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘অফডকগুলোর ধারণক্ষমতা ঠিকই রয়েছে। তবে এখনই অফডকে শতভাগ পণ্য চাপিয়ে না দিয়ে উন্মুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। যেসব আমদানিকারক চাইবে অফডক থেকে নিতে আবার কেউ চাইলে বন্দর থেকেও ডেলিভারি নিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন ব্যবসা উন্মুক্ত হয়ে যাবে তখন অনেক বিনিয়োগকারী অফডক স্থাপনে বিনিয়োগ করবে। আবার অফডকগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দর থেকে কনটেইনার খুলে পণ্য ডেলিভারি নেওয়ার নজির বিশ্বের কোনো বন্দরে নেই। আর এসব পণ্য ডেলিভারি নিতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যান আসা-যাওয়া করে। এতে বন্দরে ভেতরে পণ্য আনা-নেওয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাইরের রাস্তায় দীর্ঘ যানজট দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া এসব যানবাহনের সঙ্গে প্রতিদিন হাজারো মানুষ বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করছে, যা নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।’

অফডকগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি বলেন, ‘অফডকগুলো সক্ষমতা অর্জন করবে। এ ছাড়া নতুন নতুন অফডক গড়ে উঠবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত