কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরসাদীপুর ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৩৩টি অবৈধ ইটভাটা। এর মধ্যে ১৯টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ টিনের ড্রাম চিমনি। এ ছাড়া ইউনিয়ন ঘেঁষে কুষ্টিয়া সদর ও পাবনা অংশ জুড়ে রয়েছে আরও সাতটি ভাটা। এগুলোর কোনোটিই বৈধ উপায়ে গড়ে উঠেনি। এসব ভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি জমি ও পদ্মা নদীর তীরের মাটি। জ¦ালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মা নদীর কারণে জেলা ও উপজেলা শহরের সঙ্গে চর সাদিপুরের যোগাযোগের একমাত্র বাহন নৌকা। ফলে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যক্তিরা কৃষি জমিতে গড়ে তুলছেন অবৈধ ইটভাটা। ভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের কাছে জিম্মি এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা আরও জানান, পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে ২২ বর্গমাইল আয়তন নিয়ে গঠিত চরসাদীপুর ইউনিয়ন। এখানে ২৩ হাজার মানুষের বসবাস। বিভিন্ন সময়ে ভাঙনে প্রায় পাঁচ বর্গমাইল এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ১৭ বর্গকিলোমিটারে বসতি এবং কৃষিজমি। কিন্তু ভাটায় কৃষিজমি ও পদ্মার তীরের মাটি ব্যবহার করায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমির পরিমাণ। ভাটার আশপাশে প্রত্যাশিত ফসল হচ্ছে না। পরিবেশ বিপন্ন হওয়ায় বেড়েছে রোগ-বালাই। তার ওপর অবাধে ইটভাটার ভারী যানবাহন চলাচলে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
ভাটা মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ইউনিয়নের শ্রীকোল এলাকায় ১৩টি, ভৈরবপাড়ায় ১১টি, সাদিপুরে ৯টি, আটরশিতে চারটি, মারিয়াপাড়ায় দুইটি, ঘোষপুরে চারটিসহ ইউনিয়ন জুড়ে ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর সবগুলোই অবৈধ। প্রতিটি ইটভাটায় আকার ভেদে জ¦ালানি হিসেবে প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে ২৫০ থেকে ৪০০ মণ বনের কাঠ।
চরসাদিপুর ইউনিয়ন ভাটা মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. শহীদ বলেন, ‘১৩ বছর আগে প্রথম ভাটা করেছিলাম। দিন দিন ভাটার সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে এলাকায় ৩৩টি ইটভাটা চলছে। এর মধ্যে ১৯টিই ড্রাম চিমনির।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠ ঘিরে গড়ে উঠেছে ইটভাটাগুলো। ১৫-২০ বিঘা কৃষিজমি নিয়ে প্রতিটি ভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ভাটায় পুড়ছে কয়লার বদলে কাঠ। ট্রলিসহ বিভিন্ন অবৈধযানে পদ্মা নদী তীরের মাটি কেটে আনা হচ্ছে ইটভাটায়।
ভৈরবপাড়া গ্রামের কৃষক রজব আলী বলেন, ‘আমার সাড়ে চার বিঘা ফসলি জমি জোর করে দখলে নিয়ে অবৈধ ইটভাটা চালাচ্ছেন প্রভাবশালী মো. শহীদ ও তার তিন ভাই। নিজের জমি উদ্ধার ও অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তর, থানা, আদালতে মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
সাদিপুর এলাকার ড্রাম চিমনি দ্বারা চালিত এবিএস ভাটার মালিক সেলিম সরদার বলেন, ‘ফিট চিমনি ব্যবহারে খরচ বেশি। সেজন্য কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও ড্রাম চিমনি চালাচ্ছি।’
চরসাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মেছের আলী খাঁ জানান, ‘বছর বছর ভাটা বাড়ছে। অতিরিক্ত ভাটা ও অবৈধযান চলাচলে মানুষের খুবই ভোগান্তি হচ্ছে। বারবার প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। তবুও কোনো কাজ হচ্ছে না।’ কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হাবিবুল বাশার বলেন, ‘নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাটাগুলোকে জরিমানা করা হচ্ছে। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে চরসাদিপুরে যন্ত্র দিয়ে ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে অবৈধ ভাটা বন্ধের জন্য মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।’
উপজেলায় মোট ৯টি বৈধ ভাটা আছে জানিয়ে ইউএনও এসএম মিকাইল ইসলাম বলেন, ‘বৈধ কাগজপত্রাদি না থাকলে ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি খুব দ্রুত ড্রাম চিমনির ভাটাগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
