দুর্নীতি রুখলেই অর্থনৈতিক মুক্তি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:১৩ এএম

অন্যের দিকে একটি  আঙুল তুললে বাকি চারটি আঙুল নিজের দিকেই তাক করা থাকে। এ কারণে নির্দিষ্ট কারও দিকে আঙুল তোলাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে এই প্রতীতি বেশ শক্তভাবেই জন্মেছে যে, আমাদের সমাজে ধোয়া তুলসী পাতা খুবই নগণ্য। কেউ কেউ হয়তো নিজেই দুর্নীতি করি, নয়তো নির্বাক থেকে অন্যকে দুর্নীতি করতে সহায়তা করি। এদেশে ন্যায়বিচার যেখানে মানদন্ড সেখানে অবিচারের আশঙ্কা আছে। নিরপেক্ষতা যেখানে মানদন্ড সেখানে পক্ষপাতদুষ্টতার শঙ্কা। যেখানে গুণগত মানের প্রশ্ন জড়িত সেখানে ভেজালের ছড়াছড়ি। যেখানে মানদন্ড ওজন কিংবা পরিমাণ সেখানে কম পাওয়ার শঙ্কা। যেখানে মানদন্ড মূল্য সেখানে অতিশয় মূল্য হাঁকার প্রবণতা। যেখানে মানদন্ড সমতা সেখানে বৈষম্যের আশঙ্কা। যেখানে মানদ- সময়নিষ্ঠতা, একাগ্রতা ও সততা সেখানেও বৈপরীত্য। কোনো মানদন্ডেরই পরম মান পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই এদেশে কোনো সেক্টরে। সবাই টাকার পেছনে ছুটছে। বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম, হক-বাতিল কোনোকিছ্রু বাছবিচার নেই। টাকার প্রতি এই মোহ দেশটাকে খাদের কিনারায় এনেছে। বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত জাতির তকমা পেয়েছি কয়েকবার। কিন্তু আমরা লজ্জিত নই। টাকার গন্ধে সবাই যেন নিদ্রাচ্ছন্ন। ভোগ, বিলাসিতায় সবাই মোহগ্রস্ত। পরিবার কিংবা সমাজ নিশ্চুপ। কে কাকে ফেরাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে?

পৃথিবী থেকে একদিন প্রস্থান করতে হবে। যথাসময়ে মৃত্যুদূত দরজায় এসে কড়া নাড়বে। মৃত্যূর হাত থেকে কারও নিস্তার নেই। জন্ম নিলে মরতেই হবে। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি, কখনো ঘটবে না। পৃথিবীতে মানুষের আয়ুষ্কালের তারতম্য আছে, এটা মহান আল্লাহপাক কর্র্তৃক নির্ধারিত। মৃত্যূর পর কয়েক টুকরা সাদা কাপড়েই বিদায় দেওয়া হবে। শূন্য ও রিক্ত হাতে অন্ধকার কবরে হবে ঠাঁই। মৃত্যুর পরে মহান আল্লাহর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, দিতে হবে কৃতকর্মের হিসাব। পাপপুণ্যের এই হিসাবে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যেই জীবনের চরম ও পরম সফলতা। কিন্তু বিপরীতটা হলেই জীবন ষোলআনাই ব্যর্থ। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্য। ইসলামে মৌলিক ইবাদতগুলো কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল রুজি। ইবাদত করা যেমন ফরজ, ঠিক তেমনি হালাল উপার্জন বা হালাল রুজি অন্বেষণ করাও ফরজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, হালাল রুজি অন্বেষণ করা ফরজের পরও একটি ফরজ। অবৈধপথে উপার্জনকারী বা হারাম ভক্ষণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এমন শরীর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম দ্বারা বর্ধিত। জাহান্নামই তার উপযুক্ত স্থান। জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন, ‘তবে যারা কুফরি করে তাদের জন্য আগুনের পোশাক প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের মাথার ওপর থেকে ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি। যার দ্বারা তাদের পেটের অভ্যন্তরে যা কিছু রয়েছে তা ও তাদের চামড়াসমূহ বিগলিত করা হবে। আর তাদের জন্য থাকবে লোহার হাতুড়ি। যখনই তারা যন্ত্রণাকাতর হয়ে তা থেকে বের হয়ে আসতে চাইবে, তখনই তাদের তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং বলা হবে, দহন-যন্ত্রণা আস্বাদন করো।’ (সুরা আল-হজ, আয়াত: ১৯-২২)

জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তি থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ‘হাওজ’ (কাওসারে) আমার কাছে অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না।’ (হাকেম ৩১৯)

ইহকালীন ও পারকালীন মুক্তির জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এই বাণী সর্বদা মেনে চলতে হবে। মহান আল্লাহর আদেশ-নির্দেশাদি পালন করতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হবে। সব ধরনের পাপাচার থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহর ও বান্দার হক যথাযথরূপে আদায় করতে হবে। অন্যের ক্ষতিসাধন ও হক নষ্টের চেষ্টাকারীদের আল্লাহ ছাড় দেবেন না। তাদের জন্য শাস্তি অবধারিত। অসততা, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারি, অতিরিক্ত মুনাফাখোর, ভেজাল কারবারি এরূপ শরিয়ত পরিপন্থি পথে টাকা কামানো নিতান্তই বোকামি। এরূপ উপায়ে টাকা উপার্জন জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ারই নামান্তর। অবৈধপথে কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ সঞ্চয় করা কোনো সুবিবেচক মানুষের কাজ হতে পারে না। এটা নিকৃষ্ট, জঘন্যতম ও নিখাদ পাপ। কারও পাপের ভাগ কেউই নেবে না। সেদিন সবাই নিতান্তই একা ও অসহায়। ইহলোকের সামান্য সময়টুকু সততার সঙ্গে পার করতে পারলেই পরলোকের অনন্ত সময় সুখ ও শান্তিতে কাটবে। পারলৌকিক জীবনের ব্যাপারে উদাসীন মানুষটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্বোধ মানুষ। লোভ-লালসা, দুঃখ-কষ্ট কিংবা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করা যাবে না। কোনো পরিস্থিতিতেই পরকালকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। পরকালের পরিণতির ভাবনাই মানুষকে দুর্নীতির মতো পাপকাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। অধিকন্তু সমাজের সর্বস্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্নীতির ক্ষেত্রসমূহ বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের খোঁজখবর রাখতে হবে। পরিবারের কারও আয়-ব্যয়ের অসংলগ্নতা দেখলেই দুর্নীতির প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবারের পথভ্রষ্ট স্বজনকে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। কুরআন ও হাদিসের বিধান সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি, নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে।

দুর্নীতির কারণেই পুরো জাতি আজ খাদের কিনারায় পৌঁছেছে। সব সেক্টরে লাগামহীন দুর্নীতির কারণেই আমাদের ত্রাহি অবস্থা। জনজীবনে চরম অস্বস্তি ও দুর্ভোগ। এখান থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ, দুর্নীতি রুখে দেওয়া। শুরু হতে হবে নিজেকে দিয়েই। অন্য কোনো ব্যক্তিকে পরিবর্তন করার চেয়ে নিজে পরিবর্তিত হওয়াই দুর্নীতি প্রতিরোধের সহজ উপায়।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত