স্বজন হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বৃদ্ধ মা-বাবা

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:৪৪ এএম

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচিতে যোগ দিতে বন্ধুদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় এসেছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আবুল হাসান স্বজন। ঘাতকদের বুলেট কেড়ে নিয়েছে স্বজনের প্রাণ। পরিবারের উপার্জনক্ষম ছেলের মৃত্যুতে প্রাণবন্ত পরিবারটি এখন যেন অচল। চোখের সামনে আদরের ছোট ছেলের মৃত্যুর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহত স্বজনের মা ও বাবা। তাই মৃত্যুর আগে সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বৃদ্ধ মা-বাবা ।

জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রাজধানী ঢাকার মতো বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জ শহরও উত্তাল ছিল। আগস্টের ৫ তারিখে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-জনতার বেশিরভাগ আগেই চলে গিয়েছিল রাজধানী ঢাকায়। যে কারণে ওইদিন সকাল থেকে অল্পসংখ্যক ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়েছিল শহরের চাষাঢ়ায়। এরই মধ্যে একটি অংশ মিছিল নিয়ে শহরের মিশনপাড়ার দিকে গেলে সুযোগ বুঝে ছাত্রলীগের ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা শহরের উত্তর চাষাঢ়া এলাকায় জড়ো হয়ে ধারালো অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ছাত্র-জনতার ওপর। দুপুরে চাষাঢ়া ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হন স্বজন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হলে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টার অপারেশন শেষে পেট থেকে বের করা হয় গুলি। পরদিন ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আইসিইউতে মারা যান স্বজন। এরপর দাফনের প্রায় দুই মাস ১৬ দিন পর গত ২৩ অক্টোবর ময়না তদন্তের জন্য লাশ উত্তোলন করা হয়।

নিহতের বড় ভাই অনিক বলেন, ‘আমার ভাইসহ আমি ও আমাদের এলাকার আরও কয়েক যুবক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় যাই। তখন সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা চালালে স্বজন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে, এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন স্বজন মারা যায়। আমার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১৮ আগস্ট রাতে সদর মডেল থানায় মামলা করি।’

নিহত স্বজনের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমরা একসঙ্গে নাস্তা খেয়েছিলাম। দুপুরে খবর পাই চাষাঢ়া এলাকায় স্বজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরদিন ঢাকা মেডিকেলে মারা যায় স্বজন। আমি মৃত্যুর আগে আমার সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। শেখ হাসিনাসহ খুনিদের বিচার দেখে যেতে চাই।’

নিহত স্বজনের মা আছিয়া বেগম বলেন, ‘স্বজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যাই। মৃত্যুর আগে স্বজন আমাকে বলছিল, ‘মা আমি আর বাঁচব না। আমাকে মাফ কইরা দিও।’ তিনি বলেন, ‘আমার এই ছোট ছেলেটাই পরিবারের হাল ধরেছিল। সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। দুই বছর আগে লেখাপড়া ছেড়ে সে পরিবারের হাল ধরতে কাজে যোগ দেয়। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পেত। স্বজনের হাত ধরে আমাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সহায় সম্পদ তেমন কিছু নেই। কোনোরকমে আমরা জীবনযাপন করি। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। পাশাপাশি বড় ছেলেরও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি ফারহানা মানিক মুনা বলেন, ‘আবুল হাসান স্বজনসহ নারায়ণগঞ্জের যত শহীদ হয়েছেন এই আন্দোলনে, আমরা তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি চিহ্নিত হত্যাকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা এখন আমাদের অন্যতম লড়াই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত