দুবাইয়ের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন জনা পনের তরুণ। যুব এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতকে ৫৯ রানে হারানোর পর সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জানাতেই মাটিতে কপাল ছুঁইয়েছেন তারা। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে হারানো তো স্রেফ একটা ক্রিকেট ম্যাচ জেতা বা ফাইনাল জেতা নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন অবিশ্বাসের এক সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। গুজব, সাম্প্রদায়িক উসকানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মূলধারার গণমাধ্যমেও। পারস্পরিক অবিশ্বাসের এই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারত যখন ফাইনালে মুখোমুখি, তখন মাঠের ভেতরের বিষয়গুলোর বাইরেও কিছু ‘এক্স- ফ্যাক্টর’ও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। ম্যাচ জয়ের পর জাতীয় পতাকাকে সুপারম্যানের মতো পিঠে বেঁধে পুরস্কার নিতে এলেন আজিজুল হাকিম তামিম, জুলাই বিপ্লবে এভাবেই তো রাজপথে নেমে এসেছিলেন তার বয়সী তরুণরা! স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিতেছিল তারা, সেই একই দ্রোহের মন্ত্রে দীক্ষিতরা ক্রিকেট মাঠেই বা হারবে কেন!
পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে এসে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতকে পায় বাংলাদেশ। টসে হেরে দুবাইতে আগে ব্যাট করতে নামা। শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের, দ্রুত পড়ে যায় ৩ উইকেট। চতুর্থ উইকেটে শিহাব জেমস আর রিজান হাসান মিলে ৬২ রান যোগ করলে স্কোরকার্ডটা ভদ্রস্থ চেহারা পেতে শুরু করে। কিন্তু এরপর আবারও ব্যাটিং ধস। নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ, হচ্ছিল না কোনো জুটি। একেবারে নবম উইকেট জুটিতে গিয়ে মারুফ মৃধা আর ফরিদ হাসানের ৩০টা রান বাংলাদেশকে ২০০’র কাছাকাছি নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৪৯.১ ওভারে ১৯৮ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ, সর্বোচ্চ ৪৭ রান রিজান হাসানের আর ৪০ রান আসে শিহাব জেমসের ব্যাট থেকে।
মাঝের বিরতিতে অনেকেই ভেবেছেন ১৯৯ রান ভারতের কাছে ফুলকো লুচির মতো উড়ে যাবে। আইপিএলে কোটি টাকায় দল পাওয়া বৈভব সূর্যবংশী কিংবা ১৫০’র ওপর স্ট্রাইক-রেটে ব্যাট করা আয়ুশ মাত্রের মতো ক্রিকেটার দলে থাকলে এই রান স্কোরবোর্ডে জমা পড়তে কতক্ষণ? কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা যে অন্য পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। সেমিফাইনালে পাকিস্তানকে মাত্র ১০৬ রানে আটকে দিয়েছিলেন মারুফ মৃধা ও ইকবাল হোসেন ইমনরা। যে পাকিস্তান ভারতকে গ্রুপ পর্বে হারিয়েছিল ৪৩ রানে। অধিনায়ক হাকিম পরে বলেছেন, ভারতের ব্যাটসম্যানদের অফস্টাম্পের বাইরে চতুর্থ-পঞ্চম স্টাম্প বরাবর দুর্বল মনে হয়েছে তার কাছে। পেসারদের তাই সেই লাইনেই বল করে যেতে বলেছিলেন। কথা শুনেছেন সতীর্থরা। দ্বিতীয় ওভারেই আয়ুশকে বোল্ড করেন আল ফাহাদ, মারুফের বলে কাট করতে গিয়ে স্কয়ার লেগে ক্যাচ তুলে দেন ৯ রান করা বৈভব। এরপর আন্দ্রে সিদ্ধার্থ আর কেপি কার্তিকেয় লম্বা সময় উইকেটে থেকে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও রিজান বোল্ড করেন সিদ্ধার্থকে, তাতেই প্রতিরোধের সমাপ্তি। মোহাম্মদ আমান এবং কার্তিকেয় মিলেও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ইকবাল হোসেন ইমনের পেসে সেই প্রতিরোধ ভেসে যায়। এক ওভারে জোড়া আঘাতে ইমন যখন ভারতের ব্যাটিং কার্ডটাকে ৭৩-৫ বানিয়ে দেন, তখন ম্যাচের লাগাম বাংলাদেশের হাতে। ভারতের হার কেবল সময়ের অপেক্ষায়। সেই অবধারিত হয়ে ওঠা হারকেই দীর্ঘায়িত করছিলেন অধিনায়ক মোহাম্মদ আমান, ৬৫ বল খেলে ২৬ রান করা আমানকে বোল্ড করে পথের কাঁটা উপড়ে ফেলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক হাকিম। অফস্পিনে মাত্র ২.২ ওভারে ৩ উইকেট নিয়ে ভারতের ইনিংসের লেজটা মুড়ে দিয়েছেন তিনি, আর মিডল অর্ডার ধসিয়ে দিয়েছেন ৩ উইকেট নেওয়া ইকবাল। ৩৫.২ ওভারে মাত্র ১৩৯ রানেই অলআউট ভারত, দুই একটা ক্যাচ না পড়লে আরও আগেই অলআউট হয়ে যেতে পারত তারা। সর্বোচ্চ ২৬ রান আমানের আর শেষদিকে এলোপাতাড়ি মেরে ২৪ রান করেছেন হার্দিক রাজ। ৫৯ রানে ফাইনাল জিতে ১৫ হাজার ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফাইনালের ম্যাচসেরা ২৪ রানে ৩ উইকেট নেওয়া পেসার ইকবাল, টুর্নামেন্টে ১২ উইকেট নিয়ে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও তার।
২০২৪ সালে মাহফিজুর রহমান রাব্বির নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো যুব এশিয়া কাপ জিতেছিল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল। এবার আজিজুল হাকিমের নেতৃত্বে সেই শিরোপা ধরে রাখল বাংলাদেশের যুবারা। তবে এবারের অর্জনের মাহাত্ম্য আরও বেশি কারণ জয়ের পথে বাংলাদেশ পরপর দুটো ম্যাচে হারিয়েছে আঞ্চলিক পরাশক্তি পাকিস্তান ও ভারতকে। দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে বাংলাদেশ হয়ে গেছে যুব এশিয়া কাপের দ্বিতীয় সফলতম দল। ৮ বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত, বাংলাদেশ ২ বারের চ্যাম্পিয়ন। ১ বার করে জিতেছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
ফাইনাল জয়ী যুবাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, মুশফিকুর রহিমসহ অনেক ক্রিকেটার। মাশরাফী তার অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে লিখেছেন, ‘অভিনন্দন যুবারা...তোমাদের হাত ধরে টানা দ্বিতীয়বার এশিয়া কাপ এলো দেশে। উড়তে থাকো, যেতে হবে বহুদূর...।’ মুশফিক লিখেছেন, ‘যুব দলকে এশিয়া কাপ জয়ের অভিনন্দন। অসাধারণ সাফল্য, মাশাআল্লাহ।’ তামিম ইকবালও জানিয়েছেন অভিনন্দন। তবে হাকিম জানালেন, এই অভিনন্দনের স্রোতে ভেসে না গিয়ে নিজেদের আসল লক্ষ্যে স্থির থাকার কথা, ‘আমাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপ। এখান থেকে গিয়ে আমাদের আরও তৈরি হতে হবে বিশ্বকাপের জন্য।’
এমন উৎসবের দিনেও উঁকি মারে একটা প্রশ্ন। বাংলাদেশের সাফল্য কি শুধু আটকে থাকবে বয়সভিত্তিক পর্যায়েই? অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ সবই তো জিতেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই ক্রিকেটাররাই কেন পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হারিয়ে যান? তাদের হারিয়ে যাওয়ার দায়টা কার, নিজেদের নাকি বিসিবির?
